জোর করে মেয়েমানুষের গায়ে হাত দিলে অ্যাটেম্পট টু রেপ হয়ে যায় শিল্পা মণি পিসির টিভি থেকে জেনে ফেলেছে বোধ হয়।
পাড়ায় চায়ের দোকান মণির সঙ্গে যে শিল্পার সবিশেষে ভাব আছে তারকবাবু তা টের পেয়েছেন।
তোর সঙ্গে আলাপ হল কী করে? এইতো সেদিন বস্তিতে উঠে এল। মণিকে কথায় কথায় মেয়ে দুটো সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন।
বা রে, ওর বাবা-মা আমার দোকানে চা খায়—আমার দোকানে জল সাপ্লাই করে। রাতে সুযোগ পেলে দুর্থ বোন গিয়ে আমার ঝুপড়িতে বসে থাকে, টিভি দ্যাখে। আমি তো সব জানি।
ওর বাবা মা কাগজ কুড়ায়?
তা জানিনে। বলে না কিছু। আমার ব্যাটার গায়ে কী সব—
তোর ছেলের জামা খোল। আরে সারা গায়ে ঘা। এত পাঁচড়া! বস, ওষুধ দিচ্ছি।
তা হলে সহদেব মিছে কথা বলেনি। মেয়ে দুটোকে রেখে বাবা-মা বের হয়ে যায়। স্নান মণির বাড়িতেই হয়তো তারা সারে—এই বস্তিতে যখন ঢোকে, কেউ টেরই পায় না, শিল্পার বাবা-মা সারাদিন কাগজ কুড়ায়। এই বস্তিতে উঠে আসায় শিল্পা মনে করে তাদের মান সম্মান বেড়েছে। কেউ জানেই না, তারা কাগজকুড়ানির মেয়ে। উচ্ছেদ হওয়া খালপাড়ের আস্তানায় একরকম, আর বস্তিতে বাসা ভাড়া নিলে তাদের কাগতাড়ুয়া বলে এমন সাহস কার! শিল্পা নিজেও দু-চার টাকা উপার্জনের ধান্দায় আছে। জল বেচে টাকা হয়, ওই বস্তিতে উঠে এসে টের পেয়েছে।
মাঝে মাঝে ট্যাংক সকালে খালি করে দিলে কার না রাগ হয়! এত ইজ্জত তোর, কাগজ কুড়ালে ইজ্জত যায়! জল চুরি করলে ইজ্জত যায় না, না! দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি। কারণ তারকবাবু রাতে পাহারা দিয়েও ধরতে পারছেন না। কলেরই মুখ বন্ধ করে দিতে পারেন, কিন্তু জমাদার এসে জল পাবে কোথায়, বাগানেই বা সরজু জল দেবে কী করে!
তিনি তবু সরজুকে বললেন, প্লাম্বার মিস্ত্রি ডেকে কলটা খুলে ফেল। দেখি জল চুরি যায় কী করে!
সরজু আমতা আমতা করে বলল, বাবু, খুলে ফেললে বাসনকোসন ধোওয়ার জল পাবে কোথায়, জমাদার জল পাবে কোথায়?
লাইনের জলে যেটুকু হয় হবে। তুই খুলে দে। ট্যাংকের পাইপের মুখ সিল করে দে। দেখি হারামজাদি মেয়ে দুটো জল পায় কোথায়।
হলও তাই। সরজু মিস্ত্রি এসে কলপাড়ের ট্যাংকের পাইপ সিল করে দিয়ে গেল। জল চুরির আতঙ্কে তারকবাবুর অনিহা রোগ—কলের মুখ খুলে ফেলায়, পাইপের মুখ সিল করে দেওয়ায় এখন তিনি মনে মনে ফুরফুরে জ্যোৎস্নায় বিচরণ করেন, বোঝ এবার-হলে কী হবে বিকালবেলায় হাঁটতে বের হলে বোঝেন সত্যি জলের আকাল কত—লাইন দিয়ে সারি সারি পেতলের কলসি, প্লাস্টিকের বালতি, মেটে হাঁড়ি, পলিথিনের জেরিকান মানুষজন, ভিড় বচসা মারামারি—চুল ধরে টানাটানি—তার উপর চারদিন হয়ে গেল ডিপটিউবেলের মোটর খারাপ হয়ে গেছে বলে লাইনেও জল নেই–মেরামতির কাজে এসে বড়ো মিস্ত্রির জবান, জল নেই, সার। লাও ইবারে ঠ্যালা বোঝো!
জল নেই। ফেরার সময় দেখেন কাজলের হাত ধরে শিল্পা এই ত্রিসন্ধ্যায় কোথায় রওনা হয়েছে। চুল উসখো খুসকো, ফ্রক ছেড়া কপাল ফোলা, হাতে ব্যান্ডেজ, জলের লাইনে মারামারি করে শেষে এই দুর্দশা—কেমন মায়া হল তাঁর। কী রে হাতে কী হয়েছে।
মেরেছে।
কারা?
বাবুরা।
কেন মারল?
জল চুরি করি বলে।
তোরা জল চুরি করিস।
করব না, দেখুন না বাবু কী হয় আপনাদের। তেষ্টায় আমাদের মরণ, আপনাদেরও মরণ হবে একদিন। কেউ বাদ যাবে না।
তোরা যাবি কোথায়? সাঁজ লেগে গেছে। ওলাওঠা দেবীর কাছে। শীতলা মন্দিরে যাব।
শিল্পা বলল, তিনি আমাদের ঠাকুর-দেবতা। খিদে পেলে খেতে দেয়, জল লাগলে জল দেয়, যা চাই দিয়ে দেয়। দেবীর এক কথা, এত তার খাবে কে! সে একলা খেলে চলবে কেন—সবাইকে দিয়ে থুয়ে, মানুষজন বাঁচিয়ে না রাখলে দেবী যে একা হয়ে যাবে! আমরা দেবীকে পাখি প্রজাপতি ধরে দি! দেবী এতেই খুশি।
কোথাকার কোন দেবী, তার কথায় তারকবাবুর কেমন হুঁশ ফিরে এল। সবাইকে বাঁচিয়ে না রাখলে, মানুষ নিজেও তো বাঁচে না। সবাইকে দিতে না পারলেও এ দুটো মেয়ের জলের তেষ্টা তিনি সহজেই নিবারণ করতে পারেন—
তিনি ডাকলেন, এই শোন।
কে শোনে কার কথা! দৌড় দৌড়। মেয়ে দুটো মুহূর্তে খালপাড়ের জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আজও ফিরতে তারকবাবুর রাত হয়েছে। কেন যে মনে হল শীতলামন্দির ঘুরে যাবেন। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। শত হলেও ওলাওঠার দেবী, দেবদেবীকে মান্য করতে হয়। আর মেয়ে দুটো যদি সেখানে যায়—জীবনের নানা কুহকে ক্ষত বিক্ষত হতে হতে হাঁটছেন, মেয়ে দুটোর কীই বা দোষ। কারা শিল্পার হাত ভেঙে দিয়েছে, ওরা নিমেষে পালালই বা কোথায়! খালের দুধাকে বনজঙ্গলে, তাকে দেখলে শিল্পা কাজল আরও গভীর জঙ্গলে ঢুকে যেতে পারে—যদি মনে করে তিনি তাদেরই খুঁজে বেড়াচ্ছেন। জলচোর তারা। ধরে নিয়ে যদি বেঁধে রাখেন, কিংবা ঠ্যাং ভেঙে দেন।
আর তখনই দেখলেন, বনজঙ্গলের অভ্যন্তরে একটি জরাজীর্ণ টিনের চালার সামনে কাজল হাঁটু গেড়ে বসে। মন্দিরটি ধসে পড়েছে। দেবদেবীর প্রতি মানুষের যথেষ্ট অবহেলা-খালের মাটি তোলা হচ্ছে, মাটির অভ্যন্তর থেকে দেবীর মুখ যেন গজিয়ে উঠছে-খাল সংস্কার হলে এমনই যেন হবার কথা।
মাটির ঢিবিতে দাঁড়িয়ে কাজলকে বলছে শিল্পা—
বলো, মা আমাদের কী দোষ! আমার দিদির হাত ভেঙে দিয়েছে। ওদের তুমি শাস্তি দাও মা।
