সবে ঘুম থেকে উঠেছেন তিনি। ভাইঝি বীথি এসে হাজির। সেই খুব সকালে ওঠে, কারণ তাকে বাস-ট্রেন ঠেঙিয়ে সকালে কলেজ করতে হয়। বছর দুই ধরে সেখানে সে পার্টটাইম করছে। দুষ্ঠবারের বার বীথি স্লেট ও পেয়ে গেছে। শিগগিরই ফুল টাইম চাকরি হয়ে যাবে। খুবই মেধাবী এবং পরিশ্রমী, আর ঠিক তখনই তিনি কেন যে সেই কিশোরী মেয়েটির মুখ সামনে ভেসে উঠতে দেখলেন–কাজলের হাত ধরে শিল্পা জঙ্গলের দিকে ছুটছে। হাতে সেই লম্বা প্লাস্টিকের পাইপ, তারা জল খুঁজে বেড়াচ্ছে।
জল নেই কেন? তারকবাবু যেন ভারি বিড়ম্বনায় পড়ে গেছেন।
বীথি বলল, যা বাড়ি, কে কোথায় কল খুলে রেখেছে। চাবিটা শিগগির দাও, আমার লেট হয়ে যাবে।
তা হতে পারে, রান্নাঘর, বাথরুম, ডাইনিং স্পেস, বারান্দায় সর্বত্র বেসিনের ছড়াছড়ি। কার গোয়াল, কে বা দেয় ধোঁয়া। এজমালি সংসারে যে রকমটা হয় আর কি!
কেউ কল খুলে রাখতেই পারে। সারা রাত ধরে জল পড়লে রিজার্ভারে আর জল থাকে কী করে?
বীথিকে চাবিটা দিয়ে তিনি সব বেসিনের কল ঘুরিয়ে দেখলেন, না সবই ঠিক আছে, কোনও কলই খোলা নেই—সব কলই বন্ধ। বিকালে রোজই ফুলট্যাংকি করে রাখেন, কালও রেখেছিলেন, ছাদে ইটের গাঁথনি দিয়ে বিশাল রিজার্ভার, একবার সকালে ভরে রাখলে যত লোকই থাকুক সারাদিন অপর্যাপ্ত জল। অধিকন্তু দোষায় বলেই বিকেলে জল তোলেন ফের। যা জলের হাহাকার চলছে, কখন কী ঘটবে, জল নেই, মাটির নীচেও জল নেই—জল না থাকলে যে কী অপরিসীম কষ্ট, বস্তির মেয়ে দুটোকে দেখে টের পেয়েছেন।
সবই ঠিক আছে, তবু এত জল গেল কোথায়। কোনও কলেরই মুখ খোলা নেই। নীচের রিজার্ভারও খালি। বাড়ির পেছনের দিকেও একটা জলের কল আছে, অবসর সময়ে তিনি একটি ফুলের বাগানও তৈরি করেছেন, নানা জাতের ফুল, পাইপ লাগিয়ে সরজু বাগানে জল দেয়। ঠিকা কাজের মেয়েটিও বাইরের কলটি কাঁড়ি কাঁড়ি বাসন ধোওয়ার জন্য ব্যবহার করে ছাদ থেকে সোজা একটি পাইপ নামানো আছে–ট্যাংক থেকে জল নিলে পাইপের মুখে জলের চাপ বাড়ে, তারপর বাড়ির নালা-নর্দমা সাফ রাখার জন্য প্রচুর জলের দরকার হয়।
জল না থাকলে কী অশান্তি সৃষ্টি হয় তাও তিনি জানেন। এত জলের সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও জল নিয়ে ব্রাসে আছেন বলেই বাধ্য হয়ে ডাবল সিলিন্ডারের দুশো ফুটের একটি নতুন কল আট-দশ বছর আগে করে রেখেছেন। একশ ফুটের কলটি তুলে দুশো ফুটের নতুন কল বসিয়ে নিশ্চিন্তই ছিলেন। তবে যা অবস্থা যে ভাবে চারপাশে হাইরাইজ ফ্ল্যাটবাড়ি হচ্ছে, তাতে করে শেষ পর্যন্ত দুশো ফুটের জলের লেয়ারটিও যে ঠিকঠাক থাকবে বলা যাচ্ছে না। গভীরতম গভীর নলকূপ বসিয়ে যদি জল না মেলে কী যে হবে—আসলে তারকবাবু এই সব দুশ্চিন্তায় প্রায়শই ভোগেন। চৈত্র-বৈশাখে জলের আকাল এমনিতেই থাকে, কিন্তু এবারে যেন হাহাকার একটু বেশি মাত্রায়। ভালোয় ভালোয় বর্ষা নামলে ভাববেন, দুশো ফুটের কলটিকে চারশো ফুটের লেয়ারে ঢুকিয়ে দেবেন।
তারপর!
তারপর আটশ ফুটের লেয়ারে।
তারপর?
কোথাও জল পাওয়া যাচ্ছে না।
তারপর, তারপর কী হবে!
বাড়ির মানুষজন বুঝবে না। জল অপচয় করলে আখেরে আর জলই পাওয়া যাবে না। জল নিয়ে সবাইকে পস্তাতে হবে।
বাড়িটায় তিনি কিছুক্ষণ হম্বিতম্বি করে বেড়ালেন—এক বালতি জলে স্নান সারতে হবে, এমনও ফরমান জারি করলেন, তবু কেন যে দ্বিধায় আছেন, কাল বিকেলে ট্যাংক ভর্তি করে রেখেছেন, অথচ সকালে খালি।
ফের মেয়ে দুটোর মুখ ভেসে উঠল, হাতে জেরিক্যান। হাতে, কলে নল লাগিয়ে জল তোলার পাইপ, যদি তাঁর ট্যাঙ্ক থেকে তারা জল চুরি করে, করতেই পারে— কলতলার দিকে যদি রাতে ট্যাংকের পাইপের মুখে নল ঢুকিয়ে কল ছেড়ে দেয়— তবে হড়হড় করে জল সব নেমে যাবে, তিন-চার মিনিটে বালতি, জেরিক্যান ভরে যাবে, এক বালতি জল যদি বস্তিতে এক টাকায় বিক্রি হয়, তবে মেয়ে দুটোর অনেক পয়সা হয়ে যায়—সারাদিন জলের ধান্ধায় যে কেন ঘোরে, এতক্ষণে যেন সব টের পেলেন।
কলতলার শেষ দিকটায় তাঁর পাঁচিল—পাঁচিলে সারি সারি পেরেক পোঁতা, চোরের উপদ্রব থেকে বাড়িটাকে রক্ষা করার জন্যই এত বেশি সতর্কতা ইতিমধ্যে পাঁচিলের এক জায়গায় কাঠ কিংবা ইট দিয়ে পিটিয়ে পেরেক সব সমান্তরাল করে রেখে গেছে কেউ। এই বাড়িটা এমন যে, ঢুকে গেলে বের হবার রাস্তা থাকে না, চোরেদের বুদ্ধির দৌড় তাঁর চেয়ে বেশি, পাঁচিলের প্লাস্টার খসিয়ে মেরামতেরও দরকার ছিল, হবে হচ্ছে করে বছরখানেক পার হয়ে গেল—সেই জায়গাটা দিয়েই শিল্পা ঢুকছে, কোনও গাছের ডালে কিংবা পেয়ারা গাছও আছে একটা, তার উপর উঠে কলতলায় ঢুকে মধ্যরাতে কল থেকে জল চুরি করা খুবই সহজ। তিনি হেঁটে গিয়ে সব দেখলেন, তারপর পাঁচিলের উপর দুটো আলগা ইট রেখে দিলেন, অন্ধকারে কেউ ঢুকলেই হাতে লেগে ইট পড়ে গেলে জখম হবে, অথবা শানের উপর ইটের শব্দে তিনি জেগে যাবেন—এমনই সব ভাবতে ভাবতে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেলেন—জল চুরি বন্ধ না করলে, সকালে আবার ট্যাংক খালি।
হলও তাই, তবে দু-দিন পরে। ইটের জায়গায় ইট ঠিকই আছে, মেয়ে দুটোর উপর তিনি ক্ষেপে যাচ্ছিলেন। কাগজ কুড়ানির মেয়ে বলায় কী তেজ। সহদেবকে ফাঁসাতে পর্যন্ত চেয়েছিল, মেয়েদের গায়ে হাত দিলে পুরুষমানুষের যে হাজতবাস হয় সে খবরও শিল্পা রাখে বোধ হয়।
