হিটলার এস্থলে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন, কেন ইংল্যান্ড আক্রমণ না করে তিনি রুশ আক্রমণ করলেন।
এ যুক্তিগুলো কতখানি বাস্তব তার বিচার রণ-পণ্ডিতেরা করবেন। ঈষৎ অবান্তর হলেও অন্য একটি যুক্তির কথা এস্থলে উল্লেখ করি, কারণ সেটি জানা থাকলে ইতিহাস বুঝতে অনেকখানি সুবিধা হয়।
একাধিক রণ-পণ্ডিত বলেছেন, হিটলার এমন দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যার সঙ্গে সমুদ্রাভিযানের যোগসূত্র বা ঐতিহ্য ছিল না। অস্ট্রিয়াকে ইংরেজ, স্প্যানীয় বা আরবের মতো ম্যারিটিম নেশন বলা চলে না। তাই ইংল্যান্ড অভিযানের সবকিছু তৈরি করেও* [*যারা হিটলার-সখা ফটোগ্রাফার হমানের বই হিটলার উয়োজ মাই ফ্রেন্ড পড়েছেন তাঁরাই জানেন, ইংল্যান্ড অভিযানে প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার পর কথা ছিল, এক বিশেষ সন্ধ্যায় রাত দশটায় হিটলার অভিযান আরম্ভের ফাইনাল অর্ডার দেবেন। হিটলার, হফমান ও অন্যান্য সাঙ্গোপাঙ্গের সঙ্গে রাত বারোটা অবধি গাল-গল্প করে শুতে গেলেন। কোনও অর্ডারই দিলেন না। অভিযান নাকচ হল।] হিটলার শেষ মুহূর্তে কিন্তু কিন্তু করে থেমে গেলেন।
অর্থাৎ জলাতঙ্ক না থাকলেও হিটলারের সমুদ্ৰাতঙ্ক ছিল– অন্তত সমুদ্রপ্রীতি যে ছিল না সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অবশ্য মানতে হবে এইটেই সর্বপ্রধান কারণ নয়।
পাঠান-মোগল বংশের রাজাদেরও হিটলারের অবস্থা ছিল। এরা এসেছিলেন ল্যান্ড-লকড় দেশ থেকে। সমুদ্রের সঙ্গে তাদের কণামাত্র সম্পর্ক ছিল না। আমার যতদূর জানা আছে, মোগলদের ভেতর প্রথম আকবরই গুজরাত জয় করে চাক্ষুষ সমুদ্রদর্শন করেন। আকবরনামার ইংরেজি অনুবাদক সেই সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, সমুদ্র আকবরের মনে কোনও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারেনি। তা-ও আকবর প্রভৃতি বাদশারা যদি সমুদ্রপারে কিংবা অদূরে রাজধানী করতেন তা হলেও না হয় কিছুটা হত। তারা থাকতেন আগ্রা-দিল্লিতে যেখানে সমুদ্রের লোনা হাওয়া পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ফলে এঁদের বিপুল ঐশ্বর্য জনবল থাকা সত্ত্বেও আমাদের নৌবহর তৈরি হল না।
হোয়াট এ ট্র্যাজেডি! এঁরা যদি নৌবহর তৈরি করতেন, তবে পর্তুগিজ-ইংরেজ এদেশে যে একরত্তি পাত্তা পেত না তাই নয়, আমাদের পণ্যসম্ভার আমাদের জাহাজে করে দুনিয়ার বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়াত। আজ আমরা মার্কিন-ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিতুম। এবং পরম পরিতাপের বিষয়, আজও আমাদের মন সমুদ্র-সচেতন নয়– রাজধানী সেই দিল্লিতে যে।
অথচ আমরা সবাই জানি, সমুদ্রযাত্রায় ভারতের খ্যাতি একদা ছিল।
সে দীর্ঘ কাহিনী তুলব না। মহাভারতের মাত্র সামান্য একটি কথার উল্লেখ করি। শান্তিপর্বে ভীষ্ম রাজ্যচর্চা সম্বন্ধে যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দেবার জন্য প্রজাপতিকৃত লক্ষ অধ্যায়যুক্ত এক বিরাট শাস্ত্রের উল্লেখ করে বলেছেন, ওই বিরাট শাস্ত্রে… নৌকা নিমজ্জনাদি দ্বারা নৌকার পথরোধ… সবিশেষ কীর্তিত হইয়াছে (শান্তিপর্ব)। অর্থাৎ কয়েক বছর পরে অ্যান্টনি ইডন সুয়েজ ক্যানালের মধ্যে জাহাজ ডুবিয়ে যেভাবে খালের মুখ বন্ধ করলেন। এ সংসারে নতুন কিছুই নয়।
নৌবহর বাবদে ভারতের তখনই সর্বশক্তি গেছে যখনই কেন্দ্রীয় সরকার নৌশক্তি সম্বন্ধে অজ্ঞ, কারণ তখন তারা বাঙলা এবং গুজরাত প্রদেশকে নৌবহর তৈরি করার জন্য অর্থ দিতেন না– এর মূল্য জানেন না বলে, সেকথা পূর্বেই বলেছি। অথচ ওই সময়ে, যেমন মনে পড়ে তিমুর অভিযানের পর আকবর-জাহাঙ্গীর পর্যন্ত বাঙলা-গুজরাত স্বাধীন। নৌবহরের মূল্য জানেন বলে গুজরাতের স্বাধীন সুলতান মাহমুদ বেগুড়া থেকে আরম্ভ করে শেষ সুলতান বাহাদুর শাহ্ পর্যন্ত সকলেই নৌবহর রেখেছেন এবং একাধিকবার নৌসংগ্রামে পর্তুগিজদের বেধড়ক মার মেরেছেন। গুজরাতের শেষ স্বাধীন বাদশা বাহাদুর শাহ্ মারা যান, তিনি যখন হুমায়ুন ও শের শা-র ভয়ে পর্তুগিজদের সঙ্গে সন্ধি করতে তাদের জাহাজে যান। পর্তুগিজদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে তিনি সমুদ্রে ঝাঁপ দেন– পর্তুগিজরা বৈঠার ঘায়ে তাঁকে খুন করে।
বাঙলাও যখন স্বাধীন তখন পর্তুগিজদের সঙ্গে লড়েছে। যদিও তারা সুন্দরবন অঞ্চল ছারখার করেছে, তবু বাঙলায় গোয়া দমন দিউ-র মতো রাজ্য স্থাপন করতে পারেনি।
আকবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত বাঙলা-গুজরাত আর্তকণ্ঠে বার বার চিৎকার করে কেন্দ্রের হুজুরদের জানিয়েছে, পর্তুগিজরা সর্বনাশ করছে। আমাদের পণ্যসম্ভার হারমাদদের ভয়ে বিদেশে রপ্তানি হতে পারছে না। বাধ্য হয়ে জলের দরে পর্তুগিজদের বেচে দিতে হচ্ছে। আমরা যখন স্বাধীন ছিলুম তখন আমাদের আপন টাকা দিয়ে আমরা নৌবহর গড়েছি। এখন কুল্লে টাকা চলে যায় কেন্দ্রে। দয়া করে টাকা দিন; নৌবহর গড়ি।
কিন্তু কে-বা শোনে কার কথা! হুজুররা হিটলারের চেয়ে অধম ল্যান্ড ল দেশের লোক, এবং এখন থাকেন দিল্লিতে। নৌবহরের মূল্য কী বুঝবেন?
ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষালাভ করি। আজও যদি কেন্দ্র বাঙলা দেশকে বাণিজ্য-নৌবহর তৈরি করবার জন্য বিশেষ মোটা টাকা না দেয়, তবে বুঝব ইতিহাস বৃথাই পড়ছি।
১৯৪১।
.
০৩.
হিটলার আত্মহত্যা করার একমাস পূর্ব পর্যন্ত বার বার করুণ আর্তনাদ করে বলেছেন, এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমি চাইনি, আমি চাইনি, আমি চাইনি। আমি চেয়েছিলুম জর্মনির জন্য তার বেঁচে থাকার মতো (লেবনুসরাউম) দুই বিঘে জমি। জমিটা আসবে চেকোশ্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড ও উক্রানিয়া থেকে। তাতে ইংল্যান্ডের কী, ফ্রান্সেরই-বা কী? আমি তো ফ্রান্স কিংবা তার উপনিবেশে হাত দিতে চাইনি। ইংরেজকেও শতবার বলেছি, তার বিশ্বজোড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিও কণামাত্র লোভ আমার নেই। রুশরা বর্বর, তারা বিশ্বশান্তির শত্রু। তার পশ্চিমাঞ্চল দখল করে নিতে পারলে তার শক্তিক্ষয় হয়ে যাওয়ায় সে বিশ্বশান্তি নষ্ট করতে পারবে না; জর্মনরাও খেয়ে-পরে বাঁচবে, ফ্রান্সের উপনিবেশ বা ব্রিটেনের বিশ্বরাজ্যের দিকে হ্যাংলার মতো তাকাবে না।
