কিন্তু আমাদের মনে তবু কৌতূহল জাগে, স্বয়ং হিটলার কী ভেবেছিলেন? অবশ্য তাঁর উত্তরই যে শুদ্ধ হবে, এমন কোনও কথা নেই। আমাদের বন্ধু-বান্ধব যখন পরীক্ষায় ফেল করবার পর দফে দফে ফেল মারার কারণ দর্শায়, তখন আমাদেরও দু-একজনা তার অনুপস্থিতিতে আমাদের প্রকৃত কারণ দর্শিয়ে দেয়, আর তখন আমরা অনেক স্থলেই এদেরই বিশ্বাস করি বেশি– সর্বস্থলে না হোক, অনেক স্থলেই স্পেকটেটর সিজ মোর অব দি গেম্।
তবু মনে বড়ই কৌতূহল হয়, নেপোলিয়ান কী ভেবেছিলেন, হিটলার কী ভেবেছিলেন?
অধুনা তারই খানিকটে উত্তর মিলেছে।
১৯৪১-৪২-এর শীতে হিটলার গৌরবের মধ্যগগনে। ফ্রান্স পদানত তিনি মস্কো-লেনিনগ্রাদের দরজায় সদম্ভে ধাক্কা দিচ্ছেন। আত্মপ্রসাদে পরিপূর্ণ হিটলার তখন লাঞ্চ ডিনার খাওয়ার পর সমবেত ইয়ারবক্সিদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন– জর্মন মনের ওপর বহিরাগত খ্রিস্টধর্মের প্রভাব, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে নেহেরু না সুভাষ, বর্ণসঙ্করের কুফল, কুকুর মনিবের খাটের নিচে শোবে না অন্য কোথাও, বস্তুত আকাশ-পাতালে হেন বস্তু নেই, যা নিয়ে তিনি তখন আলোচনা করেননি। আলোচনা বলে ভুল করলুম– আসলে ইয়ার-দোস্ত দু-একটি প্রশ্ন জিগ্যেস আরম্ভ করতে না করতেই হিটলারের পঞ্চমুখ পঞ্চতন্ত্রের কাহিনী শোনাতে আরম্ভ করত। এ যেন নবগীতা শুধু আমাদের গীতাতে প্রশ্ন করেন একা অর্জুন, এখানে অর্জুন একাধিক।
হিটলারের সেক্রেটারি মার্টিন বরমান তখন হিটলারের অনুমতি নিয়ে ঘরের এক কোণে স্টেনো রাখতে আরম্ভ করলেন। তার টাইপ করা কাগজের উপর তখন বরমান তাঁর মন্তব্য ও মেরামতি করে দিলে পর শেষ সরকারি কপি তৈরি হত।
হিটলার যুদ্ধে জয়ী হলে পর এগুলো কীভাবে প্রকাশিত হত, আদৌ প্রকাশিত হত কি না, সে কথা বলা কঠিন। যুদ্ধের পর যখন চতুর্দিকে লুটতরাজ, তখন এ হাত সে হাত ঘুরে শেষটায় সে পাণ্ডুলিপি প্রথম জৰ্মনে ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদে হিটলারজ টেবিল ট নামে প্রকাশিত হয়। প্রায় সাতশো পাতার বই।
হিটলার মাইন কামফ কিংবা বক্তৃতায় তাঁর বক্তব্য পেশ করেছেন বিশ্বজনের সম্মুখে সরকারিভাবে, কিন্তু এই টেবিল-ট ঘরোয়া। এতে হিটলার-মনের অন্য একটা দিক দেখতে পাওয়া যায়।
হিটলারের অনুচরবর্গ বলেন, যখন পরাজয় আরম্ভ হল, তখন হিটলার যে-কোনও কারণেই হোক, তার জেনারেল, কর্নেল, ইয়ার-বক্সিদের সঙ্গে খানা-খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে খেতে লাগলেন, নিরামিষ রান্নায় সিদ্ধহস্তা তাঁর পাচিকা এবং তার মহিলা টাইপিস্টদের সঙ্গে। তাই ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত টেবিল-ট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
১৯৪৫-এর ফেব্রুয়ারি মাসেই হিটলারের কাছে না থোক, তার শক্ৰমিত্র বহুজনের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আর জয়াশা নেই। তার সেক্রেটারি বরমান অন্তত সে সম্ভাবনাটার আতঙ্ক ভালোভাবেই অনুভব করেছিলেন। খুব সম্ভব, তাঁরই অনুরোধে হিটলার ফের টেবিল-ট দিলেন। কিন্তু এগুলোকে আর ট বলা চলে না। তার শেষ বাণী, তার শেষ টেস্টামেন্ট বললেই ভালো বলা হয়।
এগুলোও এ-হাত সে-হাত ঘুরে ঘুরে প্রথম প্রকাশিত হয় ফ্রান্সে ১৯৫৯-এ; ইংরেজিতে ১৯৬১-তে। এ-দেশে এসে পৌচেছে দিন কয়েক হল।
চটি বই, কিন্তু তা হলেও এর ভেতর মানব-মনের অদ্ভুত দ্বন্দ্ব, জয়াশা-নিরাশা এবং সর্বশেষে আর্তকণ্ঠে বিশ্বজনের প্রতি অভিসম্পাতসহ ভবিষ্যদ্বাণী– এসবই রয়েছে কর্কশ হতে কর্কশতর ভাষায়।
তবে একথা ঠিক, আর কিছু না হোক, তার ভবিষ্যদ্বাণীগুলো প্রায় অক্ষরে অক্ষরে ফলছে!* [The Testament of Adolf Hitler, (February-April 1945). The Hitler-Borman Documents, Cassell, London, pp. 115.]
.
০২.
প্রথম প্রশ্ন ফ্রান্সের পরাজয়ের পর হিটলার সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ড আক্রমণ করলেন না কেন? পূর্বেই বলেছি, এ বিষয়ে নানা মুনি নানা মত দিয়েছেন : এবার হিটলারের মুখে শুনুন :
জুলাইয়ের (১৯৪০) শেষের দিকে, অর্থাৎ ফ্রান্সের পরাজয়ের এক মাস পরে আমি হৃদয়ঙ্গম করলুম, শান্তি আবার আমাদের মুঠোর বাইরে চলে গেল। তার কয়েক সপ্তাহ পরেই আমি বুঝতে পেরেছিলুম যে, শরৎ-হেমন্তের ঝড়-ঝঞ্ঝার পূর্বে আমরা ব্রিটেন অভিযান করতে পারব না, কারণ আকাশ-যুদ্ধে আমরা সম্পূর্ণ বিজয়ী হতে পারিনি। তার সরল অর্থ, আমরা ভবিষ্যতেও আর কখনও ব্রিটেন অভিযানে সক্ষম হব না।
(টীকা : হিটলার এবং গ্যোরিঙের চাল ছিল, ইংল্যান্ডের উপর বেধড়ক বোমাবর্ষণ করলে ইংলিশ জঙ্গিবিমান আকাশে উঠবে জর্মন বোমারু বিমান নিধন করার জন্য। তখন সেগুলোকে বিনাশ করা হবে। ফলে আকাশে ইংল্যান্ডের আর কোনও আধিপত্য থাকবে না বলে তখন সহজেই সমুদ্রপথে ব্রিটেন অভিযান সম্ভবপর হবে। ইংরেজ এই চালটি বুঝতে পারে, বরঞ্চ বেধড়ক বোমার মার খেল, কিন্তু জঙ্গিবিমান আকাশে তুলল অত্যল্পই বাকিগুলো বাঁচিয়ে রাখল হিটলারের সমুদ্র অভিযানের জাহাজগুলোকে ঘায়েল করার জন্য।)
হিটলার পুনরায় অন্যত্র বলেছেন :
ইংল্যান্ড-অভিযান ও ফলে যুদ্ধ শেষ করে শান্তি স্থাপনের আশা ত্যাগ করেছিলুম। কারণ ইংল্যান্ডের মূর্খ নেতারা কিছুতেই ইউরোপে আমাদের একচ্ছত্রাধিপত্য স্বীকার করে নিত না যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে আমাদের সঙ্গে বৈরীভাবাপন্ন শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রও (অর্থাৎ রুশ) বেঁচে থাকত। যুদ্ধের তা হলে শেষই হত না– চলতেই থাকত। এবং ইংরেজের পিছনে মার্কিন এসে জুটে তার কর্মতৎপরতা বাড়িয়ে তুলত। মার্কিনের আবার যুদ্ধ করার জন্য সব বলই প্রচুর, যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে তারাও আমাদেরই মতো প্রচুর এগিয়ে যেত; ইংল্যান্ড থেকে কন্টিনেন্ট দূরে নয় (অর্থাৎ মার্কিন-ইংরেজ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর তারাও কন্টিনেন্টে নেমে আমাদের আক্রমণ করতে পারবে)- এ সমস্ত কারণে আমাদের পক্ষে ইংল্যান্ড অভিযান করে এক সুদীর্ঘকালব্যাপী লড়াইয়ের দয়ে মজে যাওয়া মোটেই সমীচীন হত না। কারণ স্পষ্ট দেখতে পারছ, সময়কাল, ক্রমেই আমাদের বিরুদ্ধপক্ষের সাহায্য করে যেত বেশি। ইংল্যান্ডের শেষ আশা ছিল রুশ– কারণ রুশ আমাদের মতো শক্তিশালী এবং তাকে খাড়া করানো আমাদের বিরুদ্ধে! এই রুশকে ঘায়েল করতে পারলেই ইংরেজ বুঝত যে তার আর আশা নেই, এবার সন্ধি করতেই হবে।
