কিন্তু ফরাসি-ইংরেজ চায় না, আমরা খেয়ে-পরে বাঁচি। তারা বোঝে না, রুশ বিশ্বশান্তির কত বড় দুশমন। তাই যুদ্ধ করল তারা। আমি যুদ্ধ করিনি।
এবং এই ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিনের পিছনে রয়েছে বিশ্ব ইহুদিসম্প্রদায়। আমি যেদিন (জানুয়ারি ১৯৩৩) জর্মনির কর্ণধার হলুম সেইদিন থেকেই ইহুদিরা আমার ও জর্মানির বিনাশ চেষ্টায় তৎপর হয়ে উঠল। আমিও তাদের একাধিকবার স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলুম, তারা যদি জর্মনিকে নিধন করার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আহ্বান করে তবে আমি তাদের সমূলে নির্মূল করব। বেদরদ হৃদয়ের মানুষ যে-রকম ছারপোকা মারার সময় দয়া-মৈত্রীর কথা ভাবে না।
(ন্যুরনরবের্গ মকদ্দমায় গ্যোরিঙ, কাইটেল, রিবেট্রপ ও অধুনা আইষম্যান যখন বলেন ইহুদি-নিধন ইত্যাদি ব্যাপারে স্বয়ং হিটলার সম্পূর্ণ স্বাধীন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, তখন তারা কণামাত্র অতিরঞ্জন করেননি)।
যুদ্ধের কারণ সম্বন্ধে হিটলারের এইটেই মোটামুটি বক্তব্য।
দুনিয়ার কুল্লে অশান্তি, বিশ্ব-জোড়া লড়াই এ সবকিছুর জন্য একমাত্র ইহুদি সম্প্রদায়ই দায়ী–একথা একমাত্র অত্যন্ত গোঁড়া নাৎসি ভিন্ন কেউ স্বীকার করবে না, (অবশ্য আরবরা প্যালেস্টাইন হারিয়ে যাওয়ার ফলে করতে পারে, কিন্তু তাদের সরকারও ইহুদিদের আপন ভিন্ন ভিন্ন আরব রাষ্ট্র থেকে ব্যাপকভাবে তাড়াবার চেষ্টা করেনি– নিধন করার তো কথাই ওঠে না) কিন্তু আমাদের মনে তবু প্রশ্ন জাগে, সত্যই ইহুদিরা কতখানি শক্তি ধরে, বিশ্বযুদ্ধের জন্য তারা কতখানি দায়ী? আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এর সদুত্তর কেউ কখনও পাবে না– উপস্থিত শুধু এইটুকু বলতে পারি সুদ্ধমাত্র টাকার জোরে প্যালেস্টাইনের মতো একটা রাজ্যস্থাপনা করা ইহুদি ভিন্ন আর কেউ কখনও করতে পারেনি।
এখানে আরেকটি অপেক্ষাকৃত সামান্য ব্যাপারের উল্লেখ করি।
সকলেরই বিশ্বাস ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুনিকে ফরাসি-ইংরেজ যখন অকাতর চিত্তে চেকোশ্লোভাকিয়ার অংশবিশেষ হিটলারের হাতে দেন, তখন এদের মানমর্যাদা উচ্ছন্ন যায়, এবং হিটলারের পরিপূর্ণ বিজয় ও বিশ্বজোড়া আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ হয়। এই জয়ে গোটা জর্মনির জনসাধারণ তখন এমনি উল্লসিত, হিটলারের জয়গানে এমনি মুখরিত যে জর্মনির ভিতরে যেসব জর্মন হিটলারের পতনের গোপন ষড়যন্ত্র করছিলেন তারা পর্যন্ত নিরাশ হয়ে তাদের চক্রান্ত কিছুদিনের জন্য মুলতবি রাখেন।
এই ম্যুনিক-ব্যাপারে হিটলারের মত কী?
তিনি খাপ্পা হয়ে বলেছেন :
সেই কট্টর ক্যাপিটালিস্ট বুর্জুয়া চেম্বারলিন যখন তার ভণ্ডামির ছাতাখানা নিয়ে সর্ব তকলিফ বরদাস্ত করে সেই সুদূর বের্গহফে (হিটলারের নিবাস) হিটলারের মতো হঠাৎ-নবাবের (আপস্টার্ট) সঙ্গে পরামর্শ করতে এল, তখন সে বিলক্ষণ জানত যে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বিরুদ্ধে নির্মম যুদ্ধ চালানো। আমার সন্দেহ মোচনের জন্য সে তখন যা খুশি তাই বলবার জন্য তৈরি। বের্গহফে আসার তখন তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, কোনও গতিকে সময় পাওয়া (অর্থাৎ যুদ্ধটা মুলতবি করা)। আমাদের তখন উচিত ছিল ১৯৩৮-এই যুদ্ধ আরম্ভ করে দেওয়া। কিন্তু তারা (চেম্বারলেন সম্প্রদায়)– সেই নিবীর্য কাপুরুষের দল– আমরা তখন যা চাইলুম তাই দিতে লাগল। এ অবস্থায় গায়ে পড়ে যুদ্ধ আরম্ভ করা যায় কী প্রকারে (অর্থাৎ জর্মনির জনসাধারণ বলত ইংরেজ-ফরাসি যখন আমাদের সর্ব খাই-ই মিটিয়ে দিচ্ছে তখন আমরা খামকা লড়াই করতে যাব কেন?)? তাই আমরা মুনিকে অতি সহজ ও দ্রুত লড়াই জেতার সুযোগ হারালুম। যদিও আমরা তখন যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলুম না, তবু শক্রর চেয়ে বেশি প্রতি আমাদের ছিল। ১৯৩৮-এর সেপ্টেম্বরই আমাদের পক্ষে প্রশস্ততম সময় ছিল।
মুসসোলিনির মধ্যস্থতায় যে মনিক পর্ব সমাধান হয়েছিল সে-কথার উল্লেখ হিটলার করেননি। এস্থলে আরেকটি কথা স্মরণ রাখা কর্তব্য–১৯৩৯-এ হিটলার পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধারম্ভের পূর্বে বলেন, আশা করি এবার আবার হঠাৎ কোনও বদমায়েশ (শুয়াইনহু) মুনিকের মতো শেষ মুহূর্তে এসে সবকিছু-না ভণ্ডুল করে দেয়।
এবারে শেষ প্রশ্ন।
যুদ্ধ হারার জন্য তিনি কাকে দায়ী করলেন?
ইতোপূর্বেই আমাদের জানা ছিল, রবের্গের মকদ্দমার সময় যে-সব দলিল-পত্র পেশ করা হয় তাতে হিটলারের উইলটিও ছিল। এ উইলের সত্যতা সম্বন্ধে শত্রু-মিত্র কেউই কোনও প্রকারের সন্দেহ প্রকাশ করেননি। এটি তিনি তৈরি করেন আত্মহত্যা করার কয়েক ঘন্টা পূর্বে। জর্মনির জনসাধারণের উদ্দেশে এটি লিখিত।
এ উইলে হিটলার নৌসেনার প্রশংসা করেছেন (বস্তুত তিনি মৃত্যুর পূর্বে নৌবহরের বড়কর্তাকেই তাঁর পদে বসিয়ে যাবার জন্য অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, এবং সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন নাকি বড়কর্তা স্বয়ং), যে বিমানবহরের অকৃতকার্যতার জন্য অন্তত অংশত তাঁকে পরাজয় মানতে হল তারও প্রশংসা করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা করেছেন তার ব্লিৎসক্রিগ করনেওলা ল্যান্ড-আর্মির জেনারেল ফিল্ড-মার্শালদের। সাধারণ-সৈনিকের উচ্চপ্রশংসা তিনি করেছেন, কিন্তু তাঁর সর্বক্রোধ আর্মি অফিসারদের ওপর।
তারাই তার সর্বনাশ করেছে। তারা তার হুকুম অমান্য করেছে। তারা প্রতিক্ষণে পরাজয় মনোবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে। তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পদে পদে সপ্রমাণ করেছে, তারা যেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়ছে। অর্থাৎ নতুন যুগে নতুন লড়াইয়ে যে নতুন কায়দায় লড়তে হবে সেটা তারা আদপেই বুঝতে পারেনি।
