ফ্রাউ গ্যোবেলস্ হিটলারের সামনে গিয়ে বললেন, মাই ফুরার (প্রভু আমার)! আপনি কি চান যে আপনার জওয়ানরা রণক্ষেত্র থেকে ছুটিতে ফিরে এসে দেখুক কতকগুলো উস্কোখুস্কো চুলওলী খাটাশীদের?
হিটলার আইন নাকচ করে দিলেন।
তাই বলছিলুম রাধে মেয়ে কি চুল বাঁধে না?
***
এখন প্রশ্ন, কোন কোন কর্ম স্থগিত রাখতে হবে, আর কোন কোন কর্ম আরও জোরসে চালাতে হবে। পূর্বেই এ প্রশ্নের আভাস দিয়েছি এবং এখনও বলছি, আমি সমাজপতি নই, কাজেই আমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম। তবে একটা কথা বলতে পারি, বুক ঠুকে বলতে পারি– আমরা যেন হাসতে ভুলে না যাই। অর্বাচীন চীনের আচরণে ব্যথিত হয়ে আমাদের শিবুদা (শিবরাম চক্রবর্তী) যদি মশকরা করতে ভুলে যান তবে আমি হাসতে হাসতে তাঁকেই জবাই করব।
এই হাসতে পারাটা গণতন্ত্রের প্রধান লক্ষণ। পণ্ডিতজি চীনকে বিশ্বাস করে যে ঠকেছেন তাই নিয়ে সুবে বিলেত-মার্কিন পশ্চিম ইয়োরোপ হাসছে। কত না কার্টুন ব্যঙ্গচিত্র বেরোচ্ছে। আমরা প্রাণ খুলে হাসতে পারছিনে সত্য কিন্তু শীতকালে ঠোঁট ফেটে গেলে তোক যেরকম হাসে সে-রকম হাসছি তো সত্য। কারণ একা পণ্ডিতজি তো চীনকে বিশ্বাস করেননি, আপনি-আমি রামা-শ্যামারাও করেছিলুম। এখন সবাই আমাদেরই নিয়ে হাসছে। এ অবস্থায় আমাদের চটে যাওয়াটা অতিশয় অরসিকের কর্ম হবে। আমরাই শুধু দুনিয়ায় পাগলামি, দুষ্টামি দেখে হাসব, আর আমাদের সরলতা আমাদের ভালো-মানষামি দেখে অন্য লোকের হাসি আমরা সইব না, এটা কোনও ভালো কথা নয়।
এই তো সেদিন একটা রসিকতা পড়ছিলুম।
পূর্ব জর্মনির এক কুকুর পশ্চিম জর্মনির মামাতো ভাইয়ের বাড়িতে কয়েকটা দিন কাটাতে এসেছে। অতিথিবৎসল দাদা শুধাল, তোকে কী খেতে দেব বল দিকিনি, ভাইয়া! গুটিকয়েক সরেস, তাজা খাজা হাড্ডি চিবুবি?
পূর্ব জর্মনির কুকুর বলল, না, থ্যাঙ্কু! আমাদের ওদিকে মেলাই খাবার রয়েছে! তোদের চেয়ে অনেক ভালো!
দাদা শুধাল, তবে, তবে কিছু একটা চাটবি? জল? শরবত? দুধ? মদ?
না, ওসবের আমার দরকার নেই। বাড়িতে ঢের রয়েছে।
তা হলে চল, আমার ঘরে একটু জিরিয়ে নে।
কিছু দরকার নেই। আমার দিব্যি সুন্দর ঘর রয়েছে বাড়িতে।
বড়দা তখন চটে গিয়েছে। হুঙ্কার ছেড়ে বলল, তবে এখানে মরতে এসেছিস কেন? তোর যখন সবই রয়েছে?
ও দাদা! এখানে যে প্রাণভরে ঘেউ ঘেউ করা যায়। আমি ঘেউ ঘেউ করব।
***
ওই হল লৌহ-যবনিকার ওপারের দেশের আইন। সেখানে আপন আপত্তি অজুহাত চেঁচিয়ে জানানো বারণ। সেখানে আইনকানুন সর্বনেশে। আমরা এদিকে যত খুশি ঘেউ ঘেউ করতে পারি কিন্তু হাসতে যেন না ভুলি।
রাজহংসের মরণগীতি
০১.
জর্মনির চরম শত্রু ফ্রান্সের একাধিক লেখক সবিস্ময়ে স্বীকার করেছেন যে, এমন দিন আসবে, যেদিন রণবিদ্যার চর্চাশীল ব্যক্তি মাত্রেই যে রকম ফ্রিডরিক দি গ্রেট ও নেপোলিয়নের রণকলা অক্ষরে অক্ষরে অধ্যয়ন করে থাকেন, ঠিক তেমনি হিটলারের রণকলাও অধ্যয়ন করবেন।
আমরা রণচর্চা করি না; তৎসত্ত্বেও আমাদের মনেও এ সম্বন্ধে কতকগুলি প্রশ্নের উদয় হয়। যেমন, যে হিটলার দু বছরের ভেতর ইংলিশ চ্যানেল থেকে প্রায় মস্কো অবধি রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি যখন তিন বছরের ভেতর তার মাটির তলার আশ্রয় (বুঙ্কার) থেকে খবর পেলেন যে, বিজয়ী রুশ-সেনা সে আশ্রয় থেকে পাঁচশো গজ দূরে আর চব্বিশ ঘণ্টার ভেতরই, রক্তলোলুপ কেশরীর মতো তাঁর বুঙ্কারে এসে প্রবেশ করবে, তখন তাঁর মনে কী চিন্তার উদয় হয়েছিল? সঞ্জয় যখন বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে খবর দিলেন যে দুর্যোধনের পরাজয় ঘটেছে, তখন কি তাঁর ব্যালাডের (আমার বিশ্বাস, চারণদের মুখে গীত এই ব্যালাডকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে বিরাট মহাভারত রচিত হয়) ধুয়ো ছিল, যখন অমুকটা ঘটল, তখন আমরা জয়াশা করিনি, যখন অমুকটা ঘটল, তখনও আমরা জয়াশা করিনি, এবং মূল ধুয়ে ছিল, আমরা জয়াশা করিনি তখনও আমরা জয়াশা করিনি। হিটলারের বেলাও কি তাই ঘটেছিল? কারণ তাঁর পরাজয়ও তো একদিনে হয়নি– তিনি কি দিনে দিনে বুঝতে পেরেছিলেন, এখন আর জয়াশা নেই, এখন আর জয়াশা নেই, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুরাশা পোষণ করে কোনও অলৌকিক পরিবর্তনের আশা করেছিলেন– দুর্যোধন যেরকম ঊরুভঙ্গের পরও জয়াশা করে অশ্বত্থামাকে পঞ্চপাণ্ডবের গোপন নিধনের জন্য পাঠিয়েছিলেন?
আরও ছোটখাটো কত প্রশ্নই-না মনে উদয় হয়।
যেমন মনে করুন, হিটলার যখন পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্স, ওদিকে নরওয়ে, ডেনমার্ক, হল্যান্ড, বেলজিয়াম জয় করে ফেলেছেন, বাংলা কথায় একমাত্র রুশ ছাড়া এমন কোনও শক্তি ইউরোপে আর নেই যে, তার মোকাবেলা করতে পারে এবং পরাজিত ইংল্যান্ড আপন দ্বীপে ফিরে গিয়ে এমনি ক্লান্ত যে, জখমগুলো পর্যন্ত চাটতে পারছে না, তখন হিটলার ইংল্যান্ড অভিযানে বেরোলেন না কেন? স্বয়ং চার্চিল স্বীকার করেছেন, তখন হিটলার সে অভিযান করলে ইংল্যান্ড অনায়াসে জয় করতে পারতেন।
এসব প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন বহু ঐতিহাসিক, বহু জঙ্গিলাট, বহু কূটনীতিবিদ, এমনকি, হিটলারের বহু সাঙ্গোপাঙ্গ। তাঁর সেনাপতিরা পর্যন্ত এ সম্বন্ধে হাজার হাজার না হোক, শত শত পুস্তক লিখেছেন।
