শুয়ে শুয়ে সমস্ত রাত ধরে আগা আহমদ প্ল্যান করল, খুন করা যায় কী প্রকারে।
সকালবেলা বনে গিয়ে খুঁড়ল গভীর একটা গর্ত। তার উপর কঞ্চি কাঠ ফেলে উপরটা সাজিয়ে দিল লতাপাতা দিয়ে।
বিকেলের ঝেকে বউকে বলল, গা-টা ম্যাজম্যাজ করছে। একটু বেড়াতে যাবে?
বউ তো খলখল করে হাসল চোচা দশটি মিনিট। তার পর চেঁচিয়ে উঠল, কোজ্জাবো মা–মিনষের পেরাণে আবার সোয়াগ জেগেছে!
আগা আহমদ নাছোড়বান্দা। বহু মেহনত করে গা-গতর পানি করে গর্তটা তৈরি করেছে।
বউ রাজি হল। বেড়াতে নিয়ে গেল বনে। কৌশলে বউকে স্টিয়ার করে করে গর্তের কাছে নিয়ে গিয়ে দিল এক মোক্ষম ধাক্কা। তার পর ফের বাঁশ-কঞ্চি লতাপাতা সহযোগে গর্তটি উত্তমরূপে ঢেকে দিয়ে আগা আহমদ তার পীর-মুরশিদকে শুকরিয়া জানাতে জানাতে বাড়ি ফিরল।
রান্না করতে গিয়ে বাড়িতে অনেক কিছুই আবিষ্কৃত হল। হালুয়া, মোরব্বা, তিন রকমের আচার, ইস্তেক উত্তম হরিণের মাংসের শুঁটকি। পরমানন্দে অনেকক্ষণ ধরে আমাদের আগা রান্নাবান্না সেরে আহারাদি সমাপন করল। ক্যাটক্যাটানি না শুনে না শুনে আজ তার চোখে নিদ্রা আসবে– এ কথাটা যতবার ভাবে ততই তার চিত্তাকাশে পুলকের হিল্লোল জেগে ওঠে।
পরদিন কিন্তু আগা আহমদের শান্ত মনের এককোণে কালো মেঘ দেখা দিল। হাজার হোক– তার বউ তো বটে। তাকে ওরকম মেরে ফেলাটা–? বিয়ের সময় হজরত মুহম্মদের নামে সে কি শপথ নেয়নি যে তাকে আজীবন রক্ষণাবেক্ষণ করবে? কিন্তু ওদিকে আবার সেই দুশমনটাকে ফের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসতে তো মন চায় না।
এ অবস্থায় আর পাঁচজন যা করে আগা আহমদও তাই করল। যাক গে ছাই, গিয়ে দেখেই আসি না, বেটী গর্তের ভিতর আছে কী রকম। সেই দেখে মনস্থির করা যাবে।
গর্তের মুখের পাতা সরাতেই ভিতর থেকে পরিত্রাহি চিৎকার! আল্লার ওয়াস্তে, রসুলের ওয়াস্তে আমাকে বাঁচাও। কিন্তু কী আশ্চর্য! এ তো মালিকা খানমের গলা নয়। আরও পাতা সরিয়ে ভালো করে তাকিয়ে আগা আহমদ দেখে— বাপ রে বাপ, এ্যাব্বড়া কালো-নাগ, কুলোপানা-চক্কর গোখরো সাপ! সে তখনও চেঁচাচ্ছে, বাঁচাও বাঁচাও, আমি তোমাকে হাজার টাকা দেব, লক্ষ টাকা দেব, আমি গুপ্তধনের সন্ধান জানি, আমি তোমাকে রাজা করে দেব।
সম্বিতে ফিরে আগা আহমদের হাসিও পেল। সাপকে বলল, তা তুমি তো কত লোকের প্রাণ নির্ভয়ে হরণ কর– নিজের প্রাণটা দিতে এত ভয় কিসের?
ঘেন্নার সঙ্গে সাপ বলল, ধাত্তর তোর প্রাণ! প্রাণ বাঁচাতে কে কাকে সাধছে! আমাকে বাঁচাও এই দুশমন শয়তানের হাত থেকে। এই রমণীর হাত থেকে। তার পর ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, মা গো মা, সমস্ত রাত কী ক্যাট-ক্যাট, কী বকাটাই না দিয়েছে। আমি ড্যাকরা, আমি মদ্দা মিনষে হয়ে একটা অবলা হ্যাঁ, অবলাই বটে-নারীকে কোনও সাহায্য করছিনে, গর্ত থেকে বেরোবার কোনও পথ খুঁজছিনে, আমি একটা অপদার্থ, ষাঁড়ের গোবর। আমি–
আগা আহমদ বলল, তা ওকে একটা ছোবল দিয়ে খতম করে দিলে না কেন?
চিল-চ্যাঁচানি ছেড়ে সাপ বলল, আমি ছোবল মারব ওকে! ওর গায়ে যা বিষ তা দিয়ে সাত লক্ষ কালনাগিনী তৈরি হতে পারে। ছোবল মারলে সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়তুম না? সারাত কোন্ ওঝা? ওসব পাগলামি রাখো। আমাকে তুমি গর্ত থেকে তোলো। তোমাকে অনেক ধনদৌলত দেব। পশুপক্ষী সাপ-বিচ্ছর বাদশা সুলেমানের কসম।
রূপকথা নয়, সত্য ঘটনা বলে দেখা গেল মালিকা খানমেরও অনেকখানি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে– এক রাত্রি সর্পের সঙ্গে সহবাস করার ফলে। কারণ এতক্ষণ ধরে একটিবারও স্বামীকে কোনও কড়া কথা বলেনি। এটা একটা রেকর্ড, কারণ ফুলশয্যার রাত্রেও নাকি সে মাত্র তিনটি মিনিট চুপ করে থেকেই ক্যাটক্যাটানি আরম্ভ করে দিয়েছিল।
মালিকা খানম মাথা নিচু করে বলল, ওরা গুপ্তধনের সন্ধান জানে।
আমাদের আগা আহমদের টাকার লোভ ছিল মারাত্মক। সাপকে সুলেমানের তিন কসম খাইয়ে গর্ত থেকে তুলে নিল। বউকেও তুলতে হল– সে-ও শুধরে গেছে জানিয়ে অনেক করে কসম কেটেছিল।
সাপ বলল, গুপ্তধন আছে উত্তর মেরুতে বহু দূরের পথ। তার চেয়ে অনেক সহজ পথ তোমাকে বাতলে দিচ্ছি। শহর-কোতয়ালের মেয়ের গলা জড়িয়ে ধরব আমি। কেউ আমাকে ছাড়াবার জন্য কাছে আসতে গেলেই মেয়েকে মারতে যাব ছোবল। তুমি আসামাত্রই আমি সুড়সুড় করে সরে পড়ব- তোমাকে দেবে বিস্তর এনাম, এন্তার ধন-দৌলত। কিন্তু খবরদার, ওই একবার। অতি লোভ করতে যেয়ো না।
ভূতের মুখে রাম নাম?
সাপের দ্বারা ভালো কাম?
শহরে এমনই তুলকালাম কাণ্ড যে তিন দিন যেতে-না-যেতে সেই বনের প্রান্তে আগা আহমদের কানে পর্যন্ত এসে পৌঁছল কোতয়াল-নন্দিনীর জীবন-মরণ সমস্যার কথা। তিন দিন ধরে তিনি অচৈতন্য। গলা জড়িয়ে কাল-নাগ ফোঁস ফোঁস করছে। কোতয়াল লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তবু সাপুড়েরাও নাকি কাছে ঘেঁষছে না, বলছে উনি মা-মনসার বাপ।
প্রথমটা তো আগা আহমদকে কেউ পাত্তাই দেয় না। আরে, ওঝা-বদ্যি হদ্দ হল এখন ফারসি পড়ে আগা! কী বা বেশ, কী বা ছিরি!
কোতয়ালের কানে কিন্তু খবর গেল,
বন থেকে এসেছে ওঝা
পেটে এলেম বোঝ বোঝ।
ছবি-চেহারা দেখে তিনিও বিশেষ ভরসা পেলেন না। কিন্তু তখন তিনি শুশান-চিকিৎসার জন্য তৈরি– সে চিকিৎসা ডোমই করুক, চাঁড়ালও সই।
