তার পর যা হওয়ার কথা ছিল তাই হল। ওঝা আগা আহমদ ঘরে ঢোকামাত্রই সেই কাল-নাগ কোথা দিয়ে যে বেরিয়ে গেল কেউ টেরটি পর্যন্ত পেল না। কোতয়াল-নন্দিনী উঠে বসেছেন, তাঁর মুখে হাসি ফুটেছে। ভীষণ-দৰ্শন কোতয়াল সাহেবের চেহারা প্রসন্ন বদান্যতায় মোলায়েম হয়ে গিয়েছে। আগাকে লক্ষ টাকা তো দিলেনই, সঙ্গে সঙ্গে তাকে করে দিলেন তাঁর বাড়ির পাশের বনের ফরেস্ট অফিসার। এইবার আগা দু বেলা প্রাণভরে বাচ্চা হরিণের মাংস খেতে পারবে।
আগা সুখে আছে। সোনাদানা পরে মালিকা খানমও অন্য ভুবনে চরছেন– ক্যাটক্যাট করে কে? তা ছাড়া এখন তার বিস্তর দাসীবাদী। ওদের তম্বি-তম্বা করতে করতেই দিন কেটে যায়। কর্তাও বৈঠকখানায় ইয়ার-বক্সি নিয়ে।
ও মা! এক মাস যেতে না যেতে খবর রটল, উজির সাহেবের মেয়ের গলা জড়িয়ে ধরেছে একটা সাপ। কোন্ সাপ?– সেই সাপটাই হবে, আর কোনটা?
এবারে দশ লাখ টাকার এনাম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাইক-বরকন্দাজ, পেয়াদা-নফর ছুটেছে আগা আহমদের বাড়ির দিকে,
হাতের কাছে ওঝা,
সহজ হল খোঁজা।
কিন্তু আগা আহমদের বিলক্ষণ স্মরণে ছিল, কাল-নাগ খবরদার করে দিয়েছে অতি লোভ ভালো না, সাপ সরাতে একবারের বেশি না যায়। সে যতই অমত জানায়, ইয়ার-বক্সি ততই বলে, হুজুরের কী কপাল! বাপ-মার আশীর্বাদ না থাকলে এমন ধারা কখনও হয়!
আগাকে জোর করে পাল্কিতে তুলে দেওয়া হল।
এবারে সাপ জুলজুল করে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার খাই বড় বেড়েছেনা? তোমাকে না পই পই করে বারণ করেছিলুম, একবারের বেশি আসবে না। তবু যে এসেছ? তা সে যাকগে– তুমি আমার উপকার করেছ বলে তোমাকে এবারের মতো ছেড়ে দিলুম। কিন্তু এই শেষবার। আর যদি আস, তবে তোমাকে মারব ছোবল। তিন সত্যি।
দশ লাখ টাকা এবং তার সঙ্গে পাঁচশো ঘোড়ার মনসব পেয়েও নওয়াব আগা আহমদের দিল-জান সাহারার মতো শুকিয়ে গিয়েছে। মুখ দিয়ে জল নামে না, পেটে রুটি সয় না। কাল-নাগ আবার কখন কোথায় কী করে বসে আর সে ছোবল খেয়ে মরে! স্থির করল, ভিন দেশে পালাবে।
ঠিক সেই দিনই স্বয়ং কোতয়াল সাহেব এসে উপস্থিত। বিস্তর আদর-আপ্যায়ন, হস্তচুম্বন-কালিঙ্গন। কোতয়াল সাহেব গদগদ কণ্ঠে বললেন, ভাই নওয়াব সাহেব, তোমার কী কপাল! তামাম দেশের চোখের মণি, দিলের রোশনি, রাজকুমারীর প্রাণ উদ্ধার করে তুমি হয়ে যাবে দেশের মাথার মুকুট। চলো শিগগির! সেই হারামজাদা কাল-নাগ এবার জড়িয়ে ধরেছে শাহজাদীর গলা।
নওয়াব আগা আহমদ জড়িয়ে ধরল কোতয়ালের পা। হাউহাউ করে কেঁদে নিবেদন করল সে কোন্ ফাটা বাঁশের মধ্যিখানে পড়েছে।
কোতয়ালদের হৃদয় মাখন দিয়ে গড়া থাকে না। ব্যাপারটা বুঝে নিতেই শহরদারোগাকে হুকুম দিলেন, চিড়িয়া বন্ধ করো পিঞ্জরামে।
পালকিতে নওয়াব আগা আহমদ। দু পাশের লোক তার জয়ধ্বনি জিন্দাবাদ করছে। এক ঝরোকা থেকে কোতয়াল-নন্দিনী, অন্য ঝরোকা থেকে উজিরজাদী তাঞ্জামের উপর পুষ্পমাল্য বর্ষণ করলেন।
আগা আহমদ মুদ্রিত নয়নে মুর্শিদমৌলার নাম আর ইষ্টমন্ত্র জপছে।
স্বয়ং বাদশা তাকে হাতে ধরে রাজকুমারীর দোরের কাছে নিয়ে এলেন।
আগা আহমদ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
কাল-নাগ হুঙ্কার দিয়ে উঠল, আবার এসেছিস, হতভাগা? এবার আর আমার কথার নড়চড় হবে না। তোর দুই চোখে দুই ছোবল মেরে ঢেলে দেব আমার কুল্লে বিষ।
আগা আহমদ অতি বিনীত কণ্ঠে বলল, আমি টাকার লোভে আসিনি। তুমি আমাকে অগুনতি দৌলত দিয়েছ। তুমি আমার অনেক উপকার করেছ, তাই তোমার একটা উপকার করতে এলুম। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলুম, শুনলুম তুমি এখানে। ওদিকে সকালবেলা বিবি মালিকা খানম আমাকে বলেছিলেন তিনি রাজকন্যাকে সেলাম করতে আসছেন। বোধহয় এক্ষুণি এসে পড়বেন। তুমি তো ওঁকে চেনো,- হেঁ, হেঁ- তাই ভাবলুম, তোমাকে খবরটা দিয়ে উপকারটাই না কেন করি। তুমি আমার
বাপ রে, মা রে চিৎকার শোনা গেল। কোন্ দিক দিয়ে যে কাল-নাগ অদৃশ্য হল আগা আহমদ পর্যন্ত বুঝতে পারল না।
এর পর আগা আহমদ শান্তিতেই জীবনযাপন করেছিল। গল্পটি নানা দেশে, নানা ছলে, নানা রূপে প্রচলিত আছে। আমি শুনেছিলুম এক ইরানি সদাগরের কাছ থেকে, সরাইয়ের চারপাইতে শুয়ে শুয়ে।
কাহিনী শেষ করে সদাগর শুধোলেন, গল্পটার মরাল কী, বলো তো?
আমি বললুম, সে তো সোজা। রমণী যে কীরকম খাণ্ডারনী হতে পারে তারই উদাহরণ। এ দুনিয়ার নানা ঋষি নানা মুনি তো এই কীর্তনই গেয়ে গেছেন।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর সদাগর বললেন, তা তো বটেই। কিন্তু জান, ইরানি গল্পে অনেক সময় দুটো করে মরাল থাকে। এই যে-রকম হাতির দু জোড়া দাঁত থাকে। একটা দেখাবার, একটা চিবোবার। দেখাবার মরাল-টা তুমি ঠিকই দেখেছ। অন্য মরাল-টা গভীর –খল যদি বাধ্য হয়ে, কিংবা যে-কোনও কারণেই হোক তোমার উপকার করে, তবে সে উপকার কদাচ গ্রহণ করবে না। কারণ খল তার পরই চেষ্টায় লেগে যাবে, তোমাকে ধনেপ্রাণে বিনাশ করবার জন্য, যাতে করে তুমি সেই উপকারটি উপভোগ না করতে পার।
অবশ্য তোমার বাড়িতে যদি মালিকা খানমের মতো বিষ থাকে অন্য কথা।
কিন্তু প্রশ্ন, ক জনের আছে ও-রকম বউ?
ভারতীয় সংহতি
ভারতীয় সংহতি তবে কোথায়?
এস্থলে নিবেদন করে রাখি যে, আমার ধারণার সঙ্গে অল্প লোকেরই ধারণা মিলবে ও যাদের সঙ্গে মিলবে তারা এবং আমি এ দুরাশা পোষণ করি না যে, বিংশ শতাব্দীর লোক আজ অথবা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের বক্তব্য কান দিয়ে শুনবে।
