খাস লাতিনের জন্মভূমি ও লীলাস্থল যদিও ইতালিতে এবং ইতালীয় সাহিত্যের অতি শৈশবাবস্থায়ই দান্তের মতো অতুলনীয় মহাকবির আবির্ভাব, তবু কার্যত দেখা গেল লাতিনের অন্য উত্তরাধিকারী ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য যেন তাকে ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। তার অন্যতম কারণ অবশ্য এই হতে পারে যে, ইতালীয়রা তখন শুধু সাহিত্য নয়, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চারুশিল্পেও আপন সৃজনীশক্তির বিকাশ করছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্যারিস ক্রমে ইয়োরোপের কলাকারদের মক্কা হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় রুশের তুর্গেনিয়েফ, জর্মনির হাইনে, পোল্যান্ডের সঁপা, এমনকি ইতালির রসসিনি– এঁরা সকলেই প্যারিসে বসবাস করতেন।
এর পরই ফরাসিতে যাকে বলা হয় ফাঁ দ্য সিয়েক শতাব্দীর সূর্যাস্ত।
দানুনদজিয়ো খ্যাতিলাভ করেন ওই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে–কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকাররূপে এবং কর্মযোগী–ফিউমের রাজারূপে তিনি খ্যাতির চূড়ান্তে ওঠেন ১৯১৯-এ, অর্থাৎ আমাদের শতাব্দীতে। আরবি ভাষায় এঁদের বলা হয় জু অল করনেন–দুই শতাব্দীর অধিপতি।
বহু রাগরঙ্গে রঞ্জিত বৈচিত্র্যপূর্ণ এর জীবন। স্কুলে থাকাকালীন তিনি তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করে রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে রোমে এসে ছোটগল্প, উপন্যাস, নাট্য তিন ক্ষেত্রেই তিনি অতুলনীয় বলে স্বীকৃত হলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি পদাতিক, নৌবাহিনী ও বিমানবহরে সর্বত্রই সমান খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষ করে বিমান পরিচালনায়। আজ যেটাকে স্ট্যান্ট ফ্লাইং বলা হয়, তার প্রধান পথপ্রদর্শক দানুনদজিয়ো। অমর খ্যাতির জন্য তাঁর এমনই অদম্য প্রলোভন ছিল যে, তার জন্য তিনি সর্বদাই প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তার পর মিত্রশক্তি যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিউমে বন্দরকে ইতালি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইলেন, তখন কবি দানুনদজিয়ো তার রুদ্রতম রূপ ধারণ করলেন। ফিউমে বন্দর দখল করে তিনি সেখানে এক রাজ্য স্থাপন করে নিজেকে অধিপতি রূপে ঘোষণা করলেন। কবি, সৈনিক, নেতা তিন রূপেই তিনি স্বপ্রকাশ হলেন। মাত্র ১৫ মাস তিনি সেখানে রাজত্ব করেছিলেন বটে, কিন্তু ইতালির লোক আজও তাকে ফিউমের বীর, জাতির গর্বরূপে স্বীকার করে।
প্রেমের জগতেও দানুনদজিয়ো অভূতপূর্ব কীর্তি রেখে গেছেন। লোকে বলে, তিনি নাকি একসঙ্গে পাঁচটি রমণীর সঙ্গে প্রেম করতে পারতেন। একসঙ্গে পাঁচসেট প্রেমপত্র লিখেছেন (কু-লোকে বলে, সেক্রেটারিকে ডিটেট করতেন এবং প্রত্যেক সেটই একেবারে অরিজিনল, অন্যান্য সেট থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাঁর অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস লে ভেজিনি দেল্লে রক্কে গিরিকুমারীত্রয়-এ। সেখানে উপন্যাসের নায়ক কিছুতেই মনস্থির করতে পারলেন না, তিন নায়িকা, আনাতোলিয়া, ভিয়েলান্তে, মাসসিমিল্লা, কাকে তিনি বরণ করবেন। এ উপন্যাসটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল, তার পক্ষে একই সময়ে এই তিনজনকে তিন ধরনের প্রেমপত্র লেখা মোটেই অসম্ভব নয়। কারণ এই তিন বোনের চরিত্র তিনি এমনই অদ্ভুত কৃতিত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন, দৃঢ় রেখায় অঙ্কন করেছেন যে, প্রত্যেকটি চরিত্র আপন মহিমায় স্বপ্রকাশ। তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তিন ধরনের প্রেমপত্র লেখা চারুশিল্পী দানুনদজিয়োর পক্ষে অসম্ভব তো নয়ই, খুবই সহজ বলতে হবে।
দানুনদজিয়ো চরিত্র বুঝতে ভারতবাসীর খুব অসুবিধা হয় না। কিছুদিন পূর্বেও আমরা পরাধীন ছিলুম। আমরা যদি হটেনটট বা বন্টুর মতো ঐতিহ্য-সভ্যতা-সংস্কৃতিহীন জাত হতুম, তা হলে আমাদের অপমানবোধের বেদনা এতখানি নির্মম হত না। ফ্যা দ্য সিয়েলে ইতালি স্বাধীন বটে, কিন্তু সে তখন তার গৌরবময় নেতার আসন ছেড়ে দিয়েছে ফ্রান্স, জর্মনি, ইংল্যান্ডকে। এমনকি যে অন্নবস্ত্র সমস্যা তাকে তখনও (এখনও) কাতর করে রেখেছে সেটাকে ঐতিহ্যহীন সুইটজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে ততদিনে সমাধান করে ফেলেছে। জাত্যাভিমানী স্পর্শকাতর ইতালীয় মাত্রই যখন দেখত প্রতি বছর হাজার হাজার ইংরেজ, ফরাসি, জর্মন তার প্রাচীন কীর্তিকলা দেখবার জন্য রোম নেপলস্ ভেনিস পরিক্রমা করে, গ্যেটে-বায়রন কেউই বাদ যান না(১) এবং সঙ্গে সঙ্গে দেখে ছিন্নবস্ত্র, নগ্নপদ আপন ইতালীয় ভ্রাতা, এদের কাছে ভিক্ষা চাইছে, তখন ঐতিহ্যচেতন ইতালিয়ার মরমে মরাটা কি হৃদয়ঙ্গম করাটা আমাদের পক্ষে খুবই কঠিন? দানুনদজিয়ো তার দেশকে ভালোবাসতেন শুধু তার পূর্ব গৌরব, প্রাচীন ঐতিহ্যের জন্যই নয়, তার সদাজাগ্রত পঞ্চেন্দ্রিয় অহরহ তাকে সচেতন রাখত দেশের অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য সম্বন্ধে। ভেনিস দেখে বহু দেশের বহু কবি আপন মাতৃভাষায় তার প্রশস্তি গেয়েছেন, কিন্তু দানুনদজিয়োর উপন্যাস ইল ফুয়োকো অগ্নিশিখা, ফ্লেম অব লাইফে– তাঁর যে বর্ণনা এবং দরদবোধের পরিচয় পাওয়া যায়, সে জিনিস ইতালীয় সাহিত্যে অতুলনীয় তো বটেই, অন্য সাহিত্যেও আছে কি না সন্দেহ অন্তত আমার চোখে পড়েনি।
ইয়োরোপে রেনেসাঁস যারা আনয়ন করেন, তাঁদের শেষ প্রতিভূ দানুদৃজিয়ো, মাঝখানে কত শত বছরের ব্যবধান, তবু তাঁর লেখা পড়ে মনে হয় এবং যারা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তারা বলেছেন, তার কথাবার্তা শুনে মনে হত– তিনি কী স্বচ্ছন্দে রেনেসাস সৃষ্টিকর্তা অতিমানবদের মধ্যে বিচরণ করেছেন। ওদিকে তিনি নিজেও মনে করতেন যে, তিনি প্রাচীন গ্রিক ক্লাসিসের পরবর্তী পুরুষমাত্র। একটি ফোয়ারার বর্ণনা দিতে গিয়ে দানুদৃজিয়ো সে ফোয়ারার পাথরে খোদাই কতকগুলো লাতিন প্রবাদ তুলে দিয়েছেন। লাতিন অনেকখানি পড়া না থাকলে এরকম একটি অনবদ্য সঙ্কলন অসম্ভব।
