অবশ্য তাঁরা কালাম (কলমের জন্য, এবং কালাম বাণীর জন্য) লিখতে পারতেন কিন্তু সেটা করতে গেলে অন্যান্য নানা বিপদের সম্মুখীন হতে হয় এবং সে দীর্ঘ আলোচনার জন্য এ স্থলে স্থানাভাব।
এই আইন তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু বাঙালি কীভাবে অ এবং আ উচ্চারণের ভিতর পার্থক্য করে সে সম্বন্ধেও বিলক্ষণ সচেতন ছিলেন বলে একটি ব্যত্যয় তারা করে দিয়েছিলেন। আরবি-ফারসি শব্দের আদ্যক্ষরে আলিফ, আয়েন, বা হে থাকলে সেখানে আ ব্যবহার করেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। তাই অল্লা অহমদ না লিখে লিখেছেন আল্লা, আহমদ; অব্দুলের বদলে আব্দুল এবং হমিদের হসেনের পরিবর্তে হামিদ হাসেন।
দ্বিতীয় সমস্যা ছিল দীর্ঘ-হ্রস্ব নিয়ে। সংস্কৃত দিন এবং দীন উচ্চারণে, কুল এবং কূল উচ্চারণে আমরা কোনও পার্থক্য করি না, এমনকি সংস্কৃত পড়ার সময়ও না। তাই তাঁরা স্থির করলেন যে, বাঙলাতে আরবি-ফারসি শব্দ লেখার সময় তারা সব শব্দই হ্রস্ববর্ণ দিয়ে লিখবেন। কাজেই আরবি ধর্ম অর্থে দীন শব্দ যদিও দীর্ঘ উচ্চারণে আছে তবু তারা বাঙলাতে দিন-ই লিখলেন, এবং ঠিক সেইমতো নূর রসূল না লিখে নুর রসুল লিখলেন।
তৃতীয় সমস্যা, সংস্কৃতে শ, ষ, স-এর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ। আমরা বাঙলাতে তিনটিকেই এক উচ্চারণ শ অর্থাৎ sh-এর মতো করে থাকি। শুধু সংযুক্তের বেলা এবং অন্যান্য কোনও কোনও স্থলে ইংরেজি s-এর উচ্চারণ, অর্থাৎ খাঁটি সংস্কৃত স-এর উচ্চারণ করে থাকি। মস্তক, পুস্তক, আস্তে, শ্রাবণ, প্রশ্ন ইত্যাদিতে আমরা শ উচ্চারণ না করে স, অর্থাৎ sh না করে s করে থাকি। আরবি-ফারসিতে আছে চার রকমের ওই ধরনের উচ্চারণ। মুসলমান আদি-লেখকেরা বাঙলা উচ্চারণপদ্ধতি মেনে নিয়ে একটি স দিয়েই সব কারবার চালাবার চেষ্টা করেছেন। তবে পুব বাঙলায় ছ অক্ষর স-এর মতো উচ্চারিত হয় বলে মাঝে মাঝে (পরবর্তী যুগে এবং আধুনিককালে আকছারই) ছ এসে স-এর স্থান নিয়েছে।
এ আলোচনার সর্বশেষে কিন্তু নির্ভয়ে একটি কথা বলা যেতে পারে। মুসলমান আদি-লেখকেরা বাঙলা উচ্চারণকে পরিপূর্ণ সম্মান দিয়ে তারই রীতিনীতি মেনে নিয়েছিলেন। উদ্ভট বিদকুটে বানান লিখে নতুন নতুন ধ্বনি আমদানির বন্ধ্যাগমন করেননি। আরবি-ফারসি শব্দের বাঙলা বানানে প্রথম ভূতের নৃত্য আরম্ভ হল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যখন ১৯৩৬ সালে বাঙলা বানান নিয়ন্ত্রণ ও সরল করতে চাইলেন। কিন্তু সে আলোচনা অতিশয় দীর্ঘ হয়ে পড়বে, আমার জ্ঞানও অতিশয় সীমাবদ্ধ এবং তদুপরি আমার বিলক্ষণ জানা আছে, এ আলোচনায় অধিকাংশ পাঠকেরই কোনও উৎসাহ নেই। তবু যে আমি করছি, তার কারণ, বাঙলা বানানের অরাজকতার মাঝখানে একথাও সত্য যে বাঙলার একাধিক তরুণ নানা ভাষার দিকে আকৃষ্ট হওয়ার ফলে নানা শব্দ ও ধ্বনির প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। তাঁরা যদি এসব বিষয়ে গবেষণা করেন তবে আমার নানা প্রশ্নের কিছুটা উত্তর আমি হয়তো পাব।
এটা অবশ্য একেবারে সম্পূর্ণ নতুন নয়। গত শতাব্দীর শেষের দিকে বানানের অরাজকতা দূর করার জন্য সাহিত্য-পরিষদ(?) জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে(?) অনুরোধ করেন, তিনি ওই সম্বন্ধে নির্দেশ দেন। আমার যতদূর জানা আছে, তিনি সে কার্য শেষ করে উঠতে পারেননি। আমার এ মন্তব্যে ভুল থাকতে পারে, কারণ সমস্ত জিনিসটা আমার আবছা-আবছা মনে আছে।
শেষ প্রশ্ন :
বাঙলা বাক্যগঠন, পদবিন্যাস অর্থাৎ সিনটেক এল কার অনুকরণে?
ফারসিতে বলি, চুন (যখন) পাদশা (বাদশা) মরা (আমাকে) দীদ (দেখলেন) উনহা (উনি) গুফত (বললেন) তু (তুই) কুজা (কোথায়) মীরওয়ী (যাচ্ছি)?
হুবহু একই সিনটেকস?
ফারসি থেকে?
এবং সবশেষে প্রশ্ন :
আমরা যে গোটা গোটা বাঙলা লেখার সময় এবং সাইন-বোর্ডে বাঙলা অক্ষরের কোনও জায়গায় মোটা কোনও জায়গায় সরু করি সেটা এল কোথা থেকে? ফারসি লেখার কলমফ (আমাদের প্রাচীন লেখনী বা লোহার স্টিলো না–) ব্যবহার করেছিলুম বলে?
প্রিন্স গ্রাবিয়েলে দা’ন্নুনদজিয়ো
গ্রিকের উত্তরাধিকারী লাতিন। লাতিন তার অনুপ্রেরণা, প্রাণরস, কলাসৃষ্টির আদর্শ ও তাকে মৃন্ময় করার পদ্ধতি সবকিছুই নিয়েছে গ্রিক থেকে। বাঙলা ভাষা এবং সাহিত্যও সংস্কৃতের এতখানি পদাঙ্ক অনুগমন করেনি। বরঞ্চ বলব উর্দুর সঙ্গে ফারসির যে সম্পর্ক, লাতিনের সঙ্গে গ্রিকের তাই। অহমিয়ারা যদি রাগ না করেন তবে বলব, বাঙলা ও অহমিয়ার মধ্যে ওই সম্পর্কই বিদ্যমান, যদিও বাঙলার মৃত্যু হওয়ার পর অহমিয়া তার উত্তরাধিকারী হয়নি বাঙলা তার উৎকর্ষের এক বিশেষ চরম স্তরে পৌঁছনোর পর অহমিয়া তার রস-সৃষ্টিতে বাঙলা সাহিত্যকে তার আদর্শরূপে ধরে নেয় (এখানে বুরুঞ্জী বা দলিলদস্তাবেজের গদ্যের কথা হচ্ছে না)।
বহুশত বছর ধরে লাতিন পাশ্চাত্যভূমির সর্ব চিন্তা সর্ব অনুভূতির মাধ্যম ছিল। এমনকি লাতিনের উত্তরাধিকারী ইতালীয়, ফরাসি, স্প্যানিশ ইত্যাদি ভাষা পূর্ণ সমৃদ্ধি পাওয়ার পরও এমনকি এত শতাব্দীতেও, ইয়োরোপীয় পণ্ডিতেরা, যখনই চেয়েছেন যে তাবৎ ইয়োরোপ তাঁদের রচনার ফললাভ করুক তখনই তারা আপন আপন মাতৃভাষা– জর্মন, ফরাসি ইত্যাদি না লিখে লিখেছেন লাতিনে। ইবন খলদুনের (ইনি মার্কসের বহু পূর্বে ইতিহাসের অর্থনৈতিক কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন) আরবি পুস্তকের অনুবাদক মাতৃভাষা ব্যবহার না করে খলদুনের মোকদ্দমা– প্রলেগমেনন অনুবাদ করেছেন লাতিনে। এ শতাব্দীতেও জলালউদ্দীন রুমির ফারসি থেকে ইংরেজিতে তর্জমা করার সময় ইংরেজ তথাকথিত অশ্লীল অংশগুলো অনুবাদ করেছেন লাতিনে উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে এ বই পড়লে তারা যেন বুঝতে না পারে।
