(এর সঙ্গে আজকের দিনের একটি তুলনা দিতে পারি। খবরের কাগজে মাঝে মাঝে দেখি, কোনও পশ্চিমবঙ্গবাসী ঢাকার কোনও উটকো খবরের কাগজ থেকে আরবি-ফারসি মিশ্রিত বাঙলা উদ্ধৃত করে আতাঁরব ছাড়ছেন, এত বেশি আরবি-ফারসি শব্দ যদি ঢাকার লেখকরা ব্যবহার করেন তবে এক নতুন ভাষার উদ্ভব হবে এবং বঙ্কিম-রবির বাঙলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। এঁরা যদি অনুগ্রহ করে ঢাকার নিত্যকার খবরের কাগজ পড়েন, লেখকদের সাহিত্য রচনা পড়েন তবে দেখতে পাবেন ঢাকা সেই বাঙলাই লিখেছেন কলকাতা যে বাঙলা লেখে–দু-চারটি আব্বা, আম্মা, ফজরের নামাজের কথা হচ্ছে না, তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি আরবি-ফারসি শব্দ আলাল হুতোমে আছে এবং তার কারণ দৌলত কাজী, আলাওলের বেলায় যা হয়েছিল তা-ই। ঢাকার উত্তম ফারসি জাননেওয়ালা লেখকও বোঝেন যে তিনি ফারসি জানলে কী, তাঁর পাঠকের অধিকাংশই যে ফারসি জানেন না। এস্থলে অবশ্য মডার্ন কবিদের মতো যারা মনে করেন, যত দুর্বোধ্য লেখা যায় ততই সুবোধ পাঠক প্রশংসা করবে বেশি, তাঁদের কথা হচ্ছে না।)।
আকবরের আমলেই প্রথম অবস্থার পরিবর্তন আরম্ভ হয়। কিন্তু তার আগে আমার আরেকটি প্রশ্ন আছে।
ইংরেজি শব্দ যখন প্রথম বাঙলাতে ঢুকতে আরম্ভ করে তখন লেখা হয়েছিল লভ, কালেজ ইত্যাদি; আজ আমরা লিখি লাভ কলেজ। আজ আবার দেখতে পাই, স্যুটিং শুটিং, হাসপাতাল, হাসপাতাল একই শব্দ দুই বা তিন রকম লেখা হচ্ছে। তার ওপর জুটেছে এসে আরেক আপদ। ছেলে-ছোকরারা ফরাসি, জর্মন, ভাষাতে ওকিব-হাল হয়ে উঠেছে, পারি পারী এমনকি দু-আঁসলা প্যারি পর্যন্ত দেখা দিচ্ছে, প্যাসনে, পশনে আরও কত কী?
দৌলত কাজী ইত্যাদি লেখকগণ মাত্রাধিক আরবি-ফারসি শব্দ বে-এক্তেয়ারভাবে গ্রহণ করেননি সত্য কিন্তু কিছু পরিমাণে তো করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তারা আমাদেরই মতো এলোপাতাড়ি যার যা খুশি করেছিলেন, না কতকগুলো সুস্পষ্ট আইন বেঁধে নিয়ে সেগুলো যতদূর সম্ভব মানাবার চেষ্টা করেছিলেন?
যেমন মনে করুন এ যুগের মরমিয়া কবি হাসন রাজা গাইলেন–
মম আঁখি হৈতে পয়দা আসমান জমিন,
কানেতে করিল পয়দা মুসলমানী দিন।
এখানে দিন-কে যদি বাঙলা দিবস অর্থে নেওয়া হয় তবে ছত্রটির কোনও ব্যাখ্যা করা যায় না। আসলে শব্দটি আরবি দীন অর্থাৎ ধর্ম! অর্থ দাঁড়াল আমার কানে এসে মুসলমানি ধর্মের খবর পৌঁছিল বলে সে ধর্ম তার অস্তিত্ব পেল, যেরকম আমি যখন আঁখি মেলে চাইলুম তখনই দ্যুলোক ভূলোকের সৃষ্টি হল। কট্টর আদর্শবাদীর (আইডিয়ালিস্ট স্কুল) মতো হাসান রাজা বলেছেন, ত্রিলোকের চিন্ময় মৃন্ময় জগৎ তাদের অস্তিত্বের জন্য আমার চিত্ত ও পঞ্চেন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভর করছে। আমি না থাকলে এসবের অস্তিত্ব নেই।
পুনরায় বলেছেন–
আমা হইতে আসমান জমিন, আমা হইতে সব
আমা হইতে ত্রিজগৎ, আমা হইতে রব।
এখানে রব আওয়াজ এই অর্থে নিলে সদর্থ হয় না। আরবি রব শব্দের অর্থ ভগবান। হাসন রাজা বলতে চান, আমার চৈতন্য যদি ভগবানের অস্তিত্বের কল্পনা না করত তবে তার স্বয়ম্ভু অস্তিত্বই হত না।
.
০২.
টকির কল্যাণে আমরা একটা জিনিস সম্বন্ধে সচেতন হয়েছি, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। টকি আসার পূর্বে আমরা ভাবতুম, আমরা রকে বসে বেহারি মুটের সঙ্গে যে উচ্চারণে হিন্দি কথা বলি, সেইটেই অতি বিশুদ্ধ হিন্দি উচ্চারণ, এবং ক্লাসে মাস্টারমশাই যে ইংরেজি উচ্চারণে টেনিসন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ পড়েন সেই উচ্চারণই অক্সফোর্ড-কেমব্রিজে চালু।
পৃথিবীর সর্ব আর্য ভাষা এমনকি সেমিতি ভাষাতেও একটি ধ্বনি কথায় কথায় আসে, কিন্তু বাঙলায় (এবং ওড়িয়া, আসামিতে) নেই। ইংরেজিতে the-র ই উচ্চারণ; ফরাসিতে le-র e; জর্মনের gegeben-এর তৃতীয় e উচ্চারণ; আরবি, ফারসি, হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠিতে কলমফ শব্দে ক এবং ল-এর মধ্যে ল এবং ম-এর মধ্যে যে উচ্চারণ আছে, সেটি বাঙলাতে নেই।
সোজা কথায় হিন্দির আমি বা আমরা বলতে যে হম শব্দটি আছে তার হ এবং ম-এর মাঝখানে যে ধ্বনিটি আছে সেটা আমাদের কেউ শুনেছেন অ এবং তাই লিখেছেন হ এবং অধিকাংশই শুনেছেন আ এবং তাই লিখেছেন হাম। এ যুগে সচেতন হয়ে আমাদের অনেকেই লিখতে আরম্ভ করেছেন হ্যম। (উপস্থিত আমরা এই ধ্বনিটির নাম দিলুম অস্পষ্ট স্বর)।
দৌলত কাজী, আলাওলের সামনে সর্বপ্রথম এই অস্পষ্ট ধ্বনি নিয়েই এল সমস্যা। কলমফ জবরদস্ত, মক্কা, মদিনা ধরনের অসংখ্য আরবি-ফারসি শব্দে আছে এই অস্পষ্ট ধ্বনিটি: এটাকে প্রকাশ করেন কোন চিহ্ন দিয়ে? কলম, না কালাম, না কল্যম (আজকে পূর্বোল্লিখিত হ্যম-এর মতো)?
আলাওলরা অনেকেই সংস্কৃত জানতেন, এবং এটিও জানতেন যে সংস্কৃতে এ ধ্বনিটি আছে বটে, কিন্তু বাঙালি উচ্চারণ করে অ রূপে। যেমন সংস্কৃতে কমল শব্দের ক এবং ম-এর মাঝখানে আছে সেই অস্পষ্ট স্বর, কিন্তু বাঙালি সেই অস্পষ্ট ধ্বনির পরিবর্তে কমল উচ্চারণ করে অ দিয়ে, অর্থাৎ বাঙলা শব্দ ঘর উচ্চারণ করতে যে অ উচ্চারণ করি সেই অ দিয়ে।
তাই তাঁরা মনে মনে আন্দেশা করলেন, সংস্কৃতের কমল এবং আরবি-ফারসির কলমে যখন একই উচ্চারণ এবং এই ধ্বনি প্রকাশের সময় বাঙলায় কোনও পরিবর্তন না করাই ভালো। অবশ্য তারা কলমফ না লিখে কালাম লিখতে পারতেন (আজকে যে রকম কেউ কেউ হদিস না লিখে হাদিস লেখেন, বরকৎ না লিখে বারাক লেখেন) কিন্তু তা হলে বিপদ হত যে, দীর্ঘ আ-কার-যুক্ত কালাম নামক যে ভিন্ন শব্দ আছে সেটার অর্থ বাণী– (আবুল কালাম আজাদ-এর অর্থ বাণীর পিতা, যিনি স্বাধীন) সেটাতে এবং লেখনীতে (অর্থাৎ কলম-এ) যে পার্থক্য আছে সেটা আর লেখাতে দেখানো যেত না।
