অধর্মেণৈধতে তাবৎ ততো দ্রাণি পশ্যতি।
ততঃ সপত্নান্ জয়তি সমূলস্তু বিনশ্যতি।
অধর্ম দ্বারা বুদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া যায়, মঙ্গল দেখা যায়, শত্রু (সপত্ন = প্রতিদ্বন্দ্বী, সপত্নী এরই স্ত্রীলিঙ্গ এবং বাঙলায় চলিত) পরাজিত হয়, কিন্তু সমূলে বিনাশ পেতে হয়।
এই তত্ত্বকথাটি অভিজ্ঞতাপ্রসূত– আ পস্তেরিয়োরি এবং অভিজ্ঞতা থেকে নীতিসূত্র বের করা ইতিহাসের কর্ম, অথবা ইতিহাসের দর্শন (ফিলজফি অব হিস্ট্রি) এটি করে।
হিটলার ফ্রান্স, হল্যান্ড ইত্যাদি এমনকি রুশের বহুলাংশ জয় করতে ন্দ্র, মঙ্গল দেখেছিলেন, সপত্নগণকে পরাভূত করেছিলেন, কিন্তু বিনাশ যখন এল তখন সেটা সর্বস্ব সমূলে উৎপাটন করল।
এর আরেকটি গৌণ অর্থ আছে। আমরা যে ছোটখাটো পাপ-অবিচার করে থাকি তার জন্য এই পৃথিবীতেই অল্পস্বল্প সাজা পাই– কারণ আমরা হিটলার কিংবা লাই সায়েবের মতো ডাঙর প্রাণী নই। আমাদের বিনাশ সমূলে হয় না। কিন্তু ওদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা।
ভারতবর্ষের ইতিহাস আদ্যন্ত গৌরবময় না-ও হতে পারে, কিন্তু আমরা ক্ষুধার তাড়নায় বা অন্য কোনও কারণেই স্বাধিকারপ্রমত্ত হয়ে পররাজ্য আক্রমণ করিনি।
বড় হিটলার, ছোট হিটলারের ডরাবার কারণ নেই।
কিন্তু বারুদ শুকনো রাখতে হবে।
নানাপ্রশ্ন
যতই বয়স বাড়ছে, কোথায় না মনের ভিতর যেসব প্রশ্ন জাগে তার সংখ্যা কমবে, উল্টো তার সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এই তো কয়েকদিন পূর্বে বাঙলায় লেখা কয়েকখানি মুসলমানি কেতাব বা পুঁথি হাতে পড়ল। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর কাব্য। বিষয়বস্তু ফারসি, যদিও নায়ক-নায়িকা কোনও কোনও মূল কাব্যে আরবদেশের– ফারসির মাধ্যমে বাঙলা দেশে এসে পৌঁছেছেন। সঙ্গে এনেছেন ইরানি মেজাজ। সেটা মধুর,– আরবি কাব্যের মূল সুর দার্চ।
বেশ পরিষ্কার বোঝা যায়, যেসব কবি বাঙলায় এসব কাব্য স্বাধীন অনুবাদ করেছেন এঁদের অনেকেই উত্তম ফারসি জানতেন। কেউ কেউ ভালো আরবি ও সংস্কৃত জানতেন, এবং প্রায় সকলেই তখনকার দিনের প্রচলিত বাঙলা কাব্যের ভাষা জানতেন। ছন্দও হয় পয়ার নয় ত্রিপদী। এমনকি কবিদের একজন পয়ার লিখতে লিখতে এমনই আনন্দে নিমগ্ন হয়ে গেছেন। যে, একঘেয়েমি কাটাবার জন্য যে মাঝে মাঝে ত্রিপদী ভি আমদানি করতে হয় সে বাৎ বেবাক ভুলে গেছেন এবং কাব্য সমাপ্তির পর যখন কানে জল গেল তখন কুছ কুছু ত্রিপদী-ভি* [*ইনি অবশ্য অনেক পরের কবি।– সুকুমার সেন, ইসলামি বাংলা সাহিত্য, পৃ. ১১০, ১১১ পশ্য।]-বগৃহার দিয়ে কবিধর্মের ইমান দুরস্ত রাখলেন।
তাই প্রশ্ন, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে যারা বাঙলা কাব্যে বিদেশি সুর আনলেন, তারা উত্তম ফারসি এবং আরবি শব্দ বাঙলাতে আমদানি করলেন না কেন?
দর্শনের অনুশাসনে, যে প্রশ্নের উত্তর সম্বন্ধে তোমার কণামাত্র ধারণা নেই, যে উত্তর কোন দিক দিয়ে আসতে পারে না আসতে পারে সে সম্বন্ধে তুমি কণামাত্র কল্পনা করতে পার না, সে প্রশ্ন প্রশ্নই নয়, সে প্রশ্ন বাতিল, ইনভ্যালিড। তাই আমার মনে যে কাল্পনিক উত্তর এসেছে সে দুটির ইঙ্গিত দিই।
প্রবন্ধান্তরে বলেছি, বাঙলা দেশ চিরকালই বিদ্রোহী। এ দেশ মুসলমান আগমনের পর থেকে সুভাষ বসু পর্যন্ত একমাত্র জাহাঙ্গীর থেকে আওরঙ্গজেবের আমলে কেন্দ্রের অর্থাৎ দিল্লি-আগ্রার হুকুম তামিল করেছে। বস্তৃত পাঠান-মোগল প্রায় সব বাদশাকেই এ দেশে আসতে হয়েছে বিদ্রোহ দমন করতে আমরা অবশ্য বলব, আমাদের স্বাধীনতা হরণ করতে। বিশেষত বাঙলার স্বাধীন পাঠান রাজাদের আমলের তো কথাই নেই। তখন বাঙলা দেশ চীনের সঙ্গে রাজদূত বিনিময় করছে, প্রতিবেশী জৌনপুরি রাজাদের সঙ্গে কখনও লড়াই করছে, কখনও আশ্রয় দিচ্ছে, এবং জনশ্রুতি যে, বাঙলা দেশে স্বাধীন রাজা ইরানের কবি হাফিজকে বিস্তর সওগাত পাঠিয়ে দাওয়াত করেছেন এদেশে। অবশ্য নৌপথে।
এখানেই হয়তো রহস্যদ্বারের গুপ্ত কুঞ্চিকা।
স্থলপথে ইরান যাবার কথাই ওঠে না। মাঝখানে জৌনপুর, দিল্লি, লাহোর, কান্দাহার, হিরাত কত না স্বাধীন রাজত্ব! একে অন্যের সঙ্গে লড়ছে হরবকৎ। নিরীহ কবি, চিত্রকর, গায়কের তো কথাই ওঠে না, ইরান-তুরানের ভাগ্যান্বেষী যোদ্ধারা পর্যন্ত মেরে কেটে হয়তো দিল্লি অবধি দু-একজন এসে পৌঁছেছে, দিল্লি দূর অস্তৃ বরঞ্চ দিল্লি নজ্বদিক্ মিশওদ (দিল্লি কাছে এল), কিন্তু বাঙলা দূর অস্তৃ শুধুই নয় দূরান্তর অন্ত।
এদিকে বাঙলার স্বাধীন সুলতানদের মাতৃভাষা ফারসি নয়, ফারসি তাদের কোর্ট লেনগুইজ মাত্র এমনকি স্টেট লেনগুইজও নয়– যত দিন যাচ্ছে ততই তারা সে ভাষা ভুলে যাচ্ছেন, ওদিকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডার থেকে বিদেশাগত নতুন কবি নতুন লেখক সে ভাণ্ডারের মাল নিয়ে আসছেন না, রাজদরবারেই যখন ফারসি দিনের পর দিন শুকিয়ে আসছে তখন জনসাধারণে সে ভাষা প্রচলিত ও প্রসারিত হবে কী করে?
দু-চারজন পণ্ডিতদের কথা সবসময়ই আলাদা। রামমোহন হিব্রু জানতেন, হরিনাথ দে না জানি কটা বিদেশি ভাষা সেসব দেশে না গিয়ে এমনকি সেসব ভাষার পণ্ডিতদের সংস্পর্শে না এসেও শিখতে পেরেছিলেন। অবশ্য স্বাধীন বাঙলায় তার চেয়ে অনেক বেশি আলিম-ফাজিল ছিলেন কিন্তু এদের প্রায় সকলেরই ছিল কাফিরদের ভাষা বাঙলার প্রতি গভীর অশ্রদ্ধা (ওই যুগের সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদেরও বাঙলার প্রতি বিশেষ কোনও শ্রদ্ধা ছিল না)। এঁরা বাঙলায় কাব্য এমনকি ধর্মালোচনা করতেও কড়া বারণ করতেন। কিন্তু যেখানে স্টেটের খানিকটা উৎসাহ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে ওটাকে কিছুটা উপেক্ষা করা যায়। তাই দৌলত কাজী, আলাওল, সৈয়দ সুলতান ইত্যাদি কবিদের আবির্ভাব*। [সৈয়দরা নিজেদের মহাপুরুষ মুহম্মদের বংশধর বলে দাবি করেন। মুসলমান ধর্মে যদিও সৈয়দদের বিশেষ কোনও সম্মান দেখাবার নির্দেশ নেই তবু কার্যত এঁরা অনেকটা ব্রাহ্মণদের সম্মান পান। তার কারণ অবশ্য অংশত এই যে, এদের ভিতরই ইসলামি শাস্ত্রচর্চার প্রচলন ছিল বেশি। এবং ঠিক যেরকম ব্রাহ্মণরাই শাস্ত্র বানায়, এবং শাস্ত্র ভাঙে তারাই রামমোহন বিদ্যাসাগরের কথা স্মরণ করুন– ঠিক সেই রকম ধর্ম, সমাজসংস্কার, সাহিত্য-সৃষ্টিতেও সৈয়দের ভাঙা-গড়ার সাহস বেশি। হিন্দুর বৈষ্ণব পদাবলি রচনায় যে মুসলমান কবি সম্মানের সর্বোচ্চ আসন পেয়েছেন তাঁর নাম সৈয়দ মোর্তুজা।] পূর্বেই বলেছি এঁরা ফারসি জানতেন উত্তম কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ তত্ত্বটিও বিলক্ষণ অবগত ছিলেন যে তাদের পাঠকমণ্ডলী, কি মুসলমান কি হিন্দু কেউই বিদেশি আরবি-ফারসির সঙ্গে সুপরিচিত নন। কাজেই আসল উদ্দেশ্য সমাধান হবে না আদপেই।
