দ্য গলের বিশ্বাস, ইংরেজ তার সর্বস্ব বেচে দিয়েছে মার্কিনের কাছে। তাই মার্কিন ইংরেজের কাঁধে ভর করে ইয়োরোপে নেবে সেখানে সর্দারি করতে চায়। পক্ষান্তরে ফ্রান্স, লা ফ্রাস, তুজুর লা ফ্ৰাস। বাঙলা কথায়, সভ্যতা-ঐতিহ্য-বৈদগ্ধ্যের মক্কামদিনা ট্রুস। ইয়োরোপ তথা তাবৎ দুনিয়ার কেউ যদি সর্দারি করার হক্ক ধরে তবে সে ফ্রস।
তাই তিনি করতে চাইলেন জর্মনির সঙ্গে দোস্তি। তা তিনি করুন। খুব ভালো কথা। দোস্তি ভালো জিনিস।
তার পর তিনি হাত বাড়ালেন খুফের দিকে। সে-ও ভালো কথা। আমরা অন্তত আমি– রাশার শত্রু নই।
ইংরেজ চাইল, চতুর্দিকে এতসব দেদার দোস্তি হচ্ছে, সেই-বা বাদ যায় কেন? বারোয়ারি বাজারে সেই-বা ঢুকবে না কেন?
দ্য গল মারলেন ইংরেজের গালে চড়।
এখন কী হবে?
আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, ফ্রান্স যে সর্দারি করতে চাইছে তার মতো কোমরে জোর তার নেই। জর্মনির সঙ্গে তার দোস্তিও বেশিদিন টিকবে না। কারণ জর্মনি চায়, পূর্ব-পশ্চিম জর্মনির সম্মিলন। রাশা তার প্রতিবন্ধক। দ্য গলকে একদিন তার বোঝাপড়া করতে হবে। তখন হয় জর্মনি না হয় রাশাকে হারাতে হবে! তখন কোথায় রইল ইয়োরোপের ওপর সর্দারি?
———–
১. হিটলার এঁদের নিয়ে বড় মস্করা করতেন। তিনি বলেছেন, আমি যখন দেশের ভার কাঁধে নিয়ে বেকার-সমস্যা সমাধান করার জন্য কাজ আরম্ভ করলুম তখন দাড়িওলা অর্থবিদ অধ্যাপকরা ভল্যুম ভলমফ কেতাব লিখে সপ্রমাণ করলেন, দেশের সর্বনাশ হবে। যখন সমাধান করে ফেললুম, তখন ফের ভল্যুম ভল্যুম কেতাব বেরোলো যাদের মূল বক্তব্য, বলেছিলুম, তখনই বলেছিলুম, এই সমস্যার এই সমাধানই বটে। কেইনস, শাখট, শুমপেটার কজন?
২. ৩. ৪. বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলি ষড়বিংশ খঞ্জে ১৩১ পৃ. থেকে আমি উদ্ধৃত করছি। কেউ বলতে পারেন রবীন্দ্রনাথ স, সঙ্গে সঙ্গে হুশিয়ার এবং বেহুশ লিখলেন কেন? খনে স খনে শ? স্পষ্টত একই মূল থেকে তিনটি শব্দ তো এসেছে।
৫. ম্যাট্রিকের বাঙলা পরীক্ষায় একটি ছেলে লিখেছেন,
নৃপতি বিম্বিসার
নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইলা
পদ নাক কান তার
ধর্ম
প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে, আজকের দিনে ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় কে, ওটার কীই-বা প্রয়োজন? প্রশ্নটির ভিতরে অনেকখানি সত্য লুকানো আছে।
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ধর্ম তাঁর রাজত্ব ভাগ-বাঁটোয়ারা করে প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন। রাজপুত্রকে বিলিয়ে দিচ্ছেন। একদা গঙ্গাস্নান পুণ্যকর্ম বলে বিবেচিত হত বলে সেটি ধর্মের আদেশরূপে মেনে নেওয়া হত, কিংবা বলা যায়, ধর্মের আদেশ বলে সেটি পুণ্য বলে বিবেচিত হত। এখন সেটা ডাক্তারই স্ট্রংলি রেকমেন্ড করেন, এবং অধুনা বিজ্ঞানও নাকি সপ্রমাণ করেছে, গঙ্গাজলে কতকগুলি বিশেষ গুণ আছে যেগুলো অন্য জলে নেই। ধর্ম এখানে বৈদ্যের হাতে এ পুণ্যকর্ম করার আদেশ ছেড়ে দিয়েছেন, কিংবা বলা যায়, বৈদ্য সেটা কেড়ে নিয়েছে। আর কিছুটা কেড়ে নিয়েছে নিসিপ্যালিটি কোনও কোনও দেশে মুনিসিপ্যালিটিই ফরমান জারি করে, বাড়ি বানাবার সময় প্রতি কখানা ঘরপিছু একটি বাথরুম রাখতেই হবে। না হলে প্ল্যান মঞ্জুর হবে না। আহারাদিতেও তাই। ডাক্তারই বলে দেয় কোনটা খাবে, কোনটা খাবে না– অর্থাৎ কোনটাতে পুণ্য আর কোনটাতে পাপ। এবং আকছারই তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে অনুশাসন দেন। যেমন খেতে বলেন চিকেনস্যুপ–হিন্দুধর্মে, অন্তত বাঙলা দেশের হিন্দুধর্মে সেটা পাপ।
দান করা মহাপুণ্য। ধর্মের সনাতন আদেশ। কিন্তু আজকের দিনে আপনি-আমি এ অনুশাসন মেনে চলি আর না-ই চলি, সরকার কান পকড়কে তার ইনকাম এবং অন্যান্য বহুবিধ ট্যাক্স তুলে নেবেই নেবে এবং সভ্যদেশে তার অধিকাংশই ব্যয় হয় দীন-দরিদ্রের জন্য। (আজ যে মুরারজিভাই দিবারাত্র অস্তি নাস্তি ন জানাতি দেহি দেহি পুনঃপুনঃ করছেন তাতে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু তিনি যদি সে পয়সা দু হাতে খরচা করে যুদ্ধের জন্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাড়ান– সঙ্গে সঙ্গে বেকার-সমস্যা অনেকখানি ঘুচবে, বেকার-সমস্যা ঘুচল বলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে তিনি যদি কষি করেন, তবেই হবে আমাদের চরম বিপদ কিন্তু এটা অর্থনীতির একটা উকট সমস্যা এবং হিটলারই সর্বপ্রথম এর সমাধান করেন দু হাতে পয়সা খরচ করে; পক্ষান্তরে অন্যান্য দেশের প্রাচীনপন্থী অর্থমন্ত্রীরা তখন দেশের দুরবস্থা দেখে আকুল হয়ে, পাছে ভবিষ্যতে আরও কোনও নতুন বিপদে পড়তে হয় সেই ভয়ে সরকারের খরচা প্রাণপণ কমিয়ে রিজার্ভ ফান্ড নামক দানবের ভুড়ি মোটার চেয়ে মোটা করতে থাকেন। তাদের দেখাদেখি ব্যাংকার সাহুকাররাও ক্রেডিট দেওয়া বন্ধ করে কিংবা কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও কমতে থাকে এবং সৃষ্ট হয় দুষ্টচক্র ভিশাস্ সারকল। সরকার ব্যাংকার টাকা দেয় না বলে দেশের উৎপাদন শক্তি বাড়ে না, আর দেশের উৎপাদন শক্তি বাড়ে না বলে সরকার খাজনা ট্যাক্সো পায় আরও কম এবং তারস্বরে চিৎকার করে, আরও ছাঁটাই কর, আরও ছাঁটাই কর।)* [*এরকম ক্রাইসিসের সময় আরও একটা মজার ব্যাপার ঘটে। ওই সময় বড় বড় প্রাচীন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান যখন ব্যাংকের কাছে আরও ক্রেডিট চায় তখন ব্যাংক ভাবে, এদের বিস্তর টাকা দিয়েছি আর কত দেব? এতকালের বড় ব্যবসা নিশ্চয়ই টিকে যাবে। ব্যাংকার তখন ছোট ব্যবসাকে টাকা দেয়, পাছে তারা দেউলে হয়ে যায় এবং ব্যাংকের আগের দেওয়া সব টাকা মারা যায়। ফলে বিপদ কাটার পর দেখা যায় অনেক প্রাচীন, খানদানি ব্যবসা দেউলে হয়ে গিয়েছে, আর ছোট ব্যবসাগুলো টিকে গেছে। অবশ্য এর একটা নৈসর্গিক– অতএব দুর্বোধ্য কারণও থাকতে পারে। মহামারীতে বাড়ির রোগা-পটকাটাই যে মরে এমন কোনও কথা নয়। অনেক সময় তাগড়াটাই মরে। হয়তো মা রোগা-পটকাটারই যত্ন বেশি করেছিল বলে! ব্যাংকার বড় ব্যবসাকে যেরকম যত্ন না করে করেছিল ছোটটার!]
