এই পরিস্থিতি হতে পারে বলেই ধর্ম প্রাচীন দিনে তার একটা ব্যবস্থা করেছিল।
দোল-দুর্গোৎসবে দান। এতে মহাপুণ্য।
বহুকাল পূর্বে আমি বাচ্চাদের মাসিকে একটি অনুপম প্রবন্ধ পড়ি। অসাধারণ এক পণ্ডিত সেই প্রবন্ধ লিখেছিলেন। দুর্গোৎসবের সময় প্রতিমা নির্মাণ থেকে আরম্ভ করে জমিদারকে অন্ন, বস্ত্র, ছত্র, তৈজসাদি, পাদুকা, খটু, অলঙ্কার দুনিয়ার কুল্লে জিনিস দান করতে হত। এতে করে চাষা, জোলা, ছাতাবানানেওলা, কাঁসারি, কামার, মুচি, মিস্ত্রি বস্তৃত গ্রামের যাবতীয় কুটিরশিল্প এক ধাক্কায় বহু-বিস্তর বিক্রি করে রীতিমতো সচ্ছল হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, কাঁসারি দু পয়সা পেত বলে সে ছাতা কিনত, ছাতাওয়ালার চার পয়সা হল বলে সে শাখা কিনত–ইত্যাদি ইত্যাদি, আদ ইনফিনিতুম। এবারে আর নষ্টচক্র বা ভিশাস সারক্ল নয়– এখন যাকে বলে স্পায়ারেল মুভমেন্ট— চক্রাকারে স্বর্গ-বাগে!
তার পর লেখক দুঃখ করেছিলেন, আজ যদি-বা জমিদার পুণ্য সঞ্চয়ার্থে পূর্ববর্ণিত সর্বদানই যথারীতি করেন তবু মূল উদ্দেশ্য সফল হয় না। বস্ত্র এসেছে বিলেত থেকে (তখনকার দিনে দিশি কাপড় অল্পই পাওয়া যেত), ছত্র রেলি ব্রাদার্সের, বাসনকোসন অ্যালুমিনিয়মের এবং অন্যান্য আর সব জিনিসের পনেরো আনা এসেছে হয় বিদেশ থেকে, নয় দেশেরই বড় বড় শহর থেকে (শাখা জাতীয় মাত্র দু-একটি জিনিস আপন গ্রামের কিংবা গ্রামের বাইরের কুটিরশিল্প থেকে)। মোদ্দা মারাত্মক কথা– জমিদারের গ্রাম এবং কিংবা আর পাঁচখানা গ্রাম নিয়ে যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাগোষ্ঠী (ইউনিট) সে কোনও সাহায্যই পেল না। আখেরে দেখা যাবে কোনও কুটিরশিল্পই ফায়দাদার হল না, হল শিল্পপতিরা দিশি এবং বিদেশি।
এবং লাওৎসে বলেছেন- অবশ্য বর্তমান চীনা সরকার সেটা মানে না–যখনই দেখতে পাবে বড় শহরে বড় বড় ইমারত তখনই বুঝতে হবে, এগুলো গ্রামকে শুষে রক্তসঞ্চয় করেছে। পতন অনিবার্য।
ধর্ম এখন পুণ্যের দোহাই দিয়ে দানের কথা জমিদারের সামনে তোলে না– আর জমিদারকে সে পাবেই-বা কোথায়? হয়তো তিনি শহরে থাকেন কিংবা সরকারের নতুন নীতির ফলে লোপ পেয়েছেন। তা সে যাই হোক, এ কথা তো ভুললে চলবে না, দান মাত্রই দান, পেরসে, পুণ্য নয়। গ্রাম পোড়াবার জন্য কেউ যদি দেশলাই চায় তবে আমি তো তাকে দেশলাই দান করে পুণ্যসঞ্চয় করিনে!
শিল্পের উন্নতির জন্য অর্থব্যয় করলেই যে দান হত তা নয়। জামি মসজিদ নির্মাণ করে শাহ-জাহান নিশ্চয়ই পুণ্যসঞ্চয় করেছিলেন, কিন্তু তাজ বানাতে– অর্থাৎ খাসপেয়ারা বেগম সাহেবার জন্য গোর বানাতে– কোনও পুণ্য আছে বলে ইসলাম ফতোয়া দেয় না। তাই বোধহয় পাশে মসজিদ বানিয়ে দিয়ে একটুখানি পুণ্যের ছোঁয়াচ লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
শুধু যে রাজা-বাদশা-জমিদার এসব পুণ্যকর্ম করতেন তাই নয়। বছর কুড়ি পূর্বে আমি মোটর-বাসে করে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে পাগলা গ্রামের কাছে এসে দেখি এক বিরাট মসজিদ। ড্রাইভার বলল, এক জেলে হাওর-বিলের ইজারা নিয়ে বিস্তর পয়সা জমানোর পর এ মসজিদ গড়িয়েছে*। [*ঈষৎ অবান্তর হলেও এই নিয়ে একটি সমস্যার কথা তুলি। রোজার মাসে অসুস্থ ছিল বলে একজন লোক উপবাস করতে পারেনি। এখন ঈদ পরবের পর সে রোজা রাখতে যাবে, এমন সময় সে মসজিদ (কিংবা কুয়ো, কিংবা পান্থশালা– এ সবকে সবীল-আল্লা ঐশ মার্গ, যে পথ আল্লার দিকে নিয়ে যায় বলা হয়) বানাতে চাইল। তখন প্রশ্ন, সে উপবাস করা মুলতবি রেখে মসজিদ বানাবে কি না? ভারতের মুসলমান যে মানবধর্মশাস্ত্র মানেন তাঁর মতে, রোজা পরে রাখবে। এ অনুশাসন যিনি দিয়েছেন তিনি আসলে ইরানি।]
এই বীরভূমে যে শান্তিনিকেতন গড়ে উঠেছে তার পরোক্ষ কারণে কিছুটা পুণ্য কিছুটা স্বার্থ আছে। মহর্ষিদেব এখানে আশ্রম গড়ার সময় সর্বপ্রথম জলের চিন্তা করেছিলেন। কুয়ো তো খোঁড়াবেন, সে তো পাকা কথা, কিন্তু যদি সেটা শুকিয়ে যায়? শান্তিনিকেতনের অতি কাছে ভুবনডাঙা। রাইপুরের জমিদারবাবু ভুবনমোহন সিংহ সেখানে তাঁদের মাটি খনন করে নিচু জমির উপরে উত্তর-দক্ষিণ লম্বা একটি উঁচু বাঁধ (দিঘি) পূর্বেই তৈরি করে দিয়েছিলেন। (মতান্তরে এটি রাইপুরের ঘোষালদের– এরা সিংহ পরিবারের পুরোহিত– ব্রহ্মত্র ছিল।) এই পুণ্য-স্বার্থে মেশানো বাঁধের ওপর ভরসা রেখে মহর্ষিদেব এখানে আশ্রম গড়েন।* [*অঘোর চট্টোপাধ্যায়, শান্তিনিকেতন আশ্রম, পৃ. ৯ ও পরবর্তী।]
এখন আর কেউ বাঁধের জন্য ধর্মের দোহাই দেয় না। এখন অন্য পন্থা। গত নির্বাচনের সময় এই বীরভূমেরই একটি গ্রাম তিনজন প্রার্থীকে বলে– সরকারের সাহায্যে বা অন্য যে কোনও পন্থায় যে প্রার্থী তাদের গ্রামে ছটি টিউবওয়েল করে দেবে তাকে তারা একজোটে দেবে ভোট!
ভাবি, কোন শ্রাদ্ধের না, কোন বাঁধের জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়! ধর্ম তারই সঙ্গে ভেসে যায়।
ধর্ম ও কম্যুনিজম
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশে প্রলেতারিয়ারাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এক মহতী সভার অনুষ্ঠান হয়। সভার আলোচ্য বিষয়বস্তু কিংবা কর্মসূচি– এজেন্ডাও বলতে পারেন– ছিল মাত্র একটি। ভগবান আছেন কি নেই? বিস্তর তর্কাতর্কির পর স্থির হল, জনমত নেওয়া হোক, প্লেবিসিট করো।
