কিন্তু পুরনো কথায় ফিরে যাই।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে তিন ফরাসি বীর দেশের সম্মান পেতেন। ফক, জফর এবং পেতা। প্রথম দুজন মারা যাবার পর পেতাই ফ্রান্সের রক্ষণ বিভাগে সর্বদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার বিশ্বাস ছিল, উত্তম অস্ত্রশস্ত্র সুসজ্জিত প্রকার নির্মাণই ফ্রান্স সংরক্ষণের জন্য প্রশস্ততম– ফলে কোটি টাকা খরচা করে তৈরি হল মাজিনো লাইন–বহুশত বছর পূর্বে চীনারা যে রকম দেওয়াল গড়েছিল।
দ্য গল ছিলেন পেতাঁর সহকর্মী। কিন্তু পদে পদে তিনি পেতাঁর সঙ্গে দ্বিমত। তিনি বার বার বলেছেন, এ রকম পাঁচিল তুলে জড়ভরতের মতো পিছনে বসে থাকলে আত্মরক্ষা হয় না। পেত তাঁর কথায় কান দেননি।
তার পর যখন ১৯৪০-এ ফ্রান্স নির্মমভাবে পরাজিত হল তখন সবাই বুঝল প্রাচীন যুগের দেওয়াল বাঁধার জড়ত্ব সত্য সংরক্ষণ নয়।
এইখানেই দ্য গলের মাহাত্ম্য!
.
০২.
ফরাসি বিদ্রোহ শেষ হলে পর এক ফরাসি নাগরিক জনৈক নামজাদা জঁদরেলকে শুধায়, মসিয়ো ল্য জেনারেল, এই যুগান্তকারী বিদ্রোহে আপনার কত্ৰিবিউসিয়ে– অবদান–কী ছিল? মসিয়ো ল্য জেনারেল গোঁফ মোচড়াতে মোচড়াতে সপ্রতিভ মৃদু হাস্য হেসে বলেছিলেন, পৈতৃক প্রাণটি বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি।
বাস্তবিকই তখন ঘড়ি ঘড়ি কর্ণধার বদল, এবং এক এক কর্ণধার প্রাক্তন অন্য কর্ণধারের কর্ণকর্তন করেই সন্তুষ্ট নন, কানের সঙ্গে মাথাও চান।(৫) হালে ইরাকে যা।
১৯১৮ এবং ১৯৪০-এর মাঝখানের সময়টাতে একই ধুন্ধুমার। তবে মাথা কাটাকাটি আর হত না। শুধু মন্ত্রিসভার পতন নিয়েই উভয় পক্ষ সন্তষ্ট হতেন। এবং এসব পতন সর্বক্ষণ লেগে থাকত বলে ১৯৩৮-এ এক ফরাসি কাফেতে চুকুশ চুকুশ করতে করতে বলেছিল, এই প্যারিসেই অন্তত হাজারখানেক প্রাক্তন মন্ত্রী আছেন। একটু কান পাতলেই শুনতে পাবে, পাশের টেবিলে কেউ বলেছে, কৎ জেতে ল্য মিনিন্ত্র –আমি যখন মন্ত্রী ছিলুম ইত্যাদি। তার পর সেই ফরাসি আমাকে সাবধান করে দেয়, আমি যেন বেশিদিন ফ্রান্সে না থাকি; বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ হয়তো একদিন ক্যাক করে পাকড়ে নিয়ে মন্ত্রী বানিয়ে দেবে। তার উপদেশ আমি পুরোপুরি নিইনি। তবে কাফেতে বসে প্রায়ই অজানা জনকে বলতুম, কৎ জেতে ল্য মিনিত্ত্ব– আমি যখন মন্ত্রী ছিলুম ইত্যাদি। আশ্চর্য! কারও চোখে অবিশ্বাসের আমেজ দেখিনি। ফরাসি কলোনি আলজেরিয়া থেকে কালা আদমি ভি মসিয়য়া ল্য মিনিসত্র হতে আপত্তি কী?
তা সে কথা থাক।
আসল কথা হচ্ছে, দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে ইংরেজি, ফরাসি, জর্মন, ইতালিয়ানে বিস্তর বই বেরোয়, ইয়োরোপের ভবিষ্যৎ কী তাই নিয়ে। এতদিন পর আমার আর ঠিক মনে নেই, তবে বোধহয় মাদাম তাবুই লিখিত একখানা বই বাজারে বেশ নাম কেনে।
ইংরেজি অনুবাদে তার নাম ছিল, পেরফিডিয়াস আলবিয়েন অর আঁতাকর্দিয়াল? বিশ্বাসঘাতক ইংরেজ কিংবা তার সঙ্গে দোস্তি?
বৈঠে মেরেছি সমস্ত রাত; ভোরবেলা দেখি, বাড়ির ঘাটেই নৌকা বাঁধা। ব্যাপার কী? যে-দড়িতে নৌকা বাঁধা ছিল সেটা খুলিনি।
এ-ও তাই। দ্য গল আবার ফিরে এসেছেন যেখানে মাদাম তাবুই আপন সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। এই লক্ষ্মীছাড়া ইংরেজকে বিশ্বাস করে তার সঙ্গে পাকাপাকি কোনও দোস্তি করা যায় কি না? পূর্বেই বলেছি, দুই যুদ্ধের মাঝখানে ফ্রান্সে এতই ঘন ঘন মন্ত্রিসভার পরিবর্তন হত যে, ভেবেচিন্তে ইংরেজের সঙ্গে কোনও একটা চুক্তি– আঁতাত করা, কিংবা আরও মনস্থির করে না-করা, কোনওটাই করা যেত না। মাদাম তাবুইয়ের বিশ্লেষণ– যতদূর মনে পড়ছে- একটু অন্য ধরনের ছিল। তিনি বলেছিলেন, উভয় দেশেরই দুর্ভাগ্য যে, আমরা কোনও পাকাপাকি সমঝওতায় আসতে পারছি না। তার কারণ, আমাদের এখানে যখন গরমপন্থীরা (কনজারভেটিভ) মন্ত্রিসভা গড়ছেন, তখন বিলেতে নরমপন্থীরা (লিবারেল অথবা লেবার), এবং আমরা যখন নরম তখন ওরা গরম।
তা সে যে-কোনও কারণেই হোক, দুই যুদ্ধের মাঝখানে কোথায় না ফরাসি-ইংরেজ একজোট হয়ে বিশ্বশান্তির জন্য লিগ অব নেশনস হোক কিংবা অন্যত্রই হোক, পাকা বুনিয়াদ গড়ে তুলবে, না আরম্ভ হল দু-জনাতে খ্যাচা-খেউ। এর উদাহরণ তো মাদাম তাবুই প্রচুর দিয়েছেন। তাঁর বই বেরোনোর পরের শেষ উদাহরণ আমরা দিই। হের হিটলার যখন সগর্বে সদম্ভে রাইনল্যান্ডকে সমরসজ্জায় সাজাতে আরম্ভ করলেন তখন ফ্রান্স আর্তকণ্ঠে সেদিকে ইংরেজের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ভের্সাইয়ের চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল, জর্মন এ কর্মটি করতে পারবে না, এবং সে চুক্তির বরাত ফরাসি-ইংরেজ দু জনের ওপর ছিল। ইংরেজ সে আৰ্তরব শুনে সাড়া তো দিলই না, উল্টো দেখা গেল, সে গোপনে গোপনে হিটলারের সঙ্গে একটা নৌচুক্তি করে বসে আছে। ইংরেজের দৃষ্টিভঙ্গি এস্থলে বোঝা কঠিন নয়– তা আপনারা সেটাকে বিশ্বাসঘাতকতা পারফিডি বলুন আর না-ই বলুন। তার শক্তি জলে। হিটলার যদি তাকে কথা দেয়, সে সেখানে লড়ালড়ি করবে না, তবে চুলোয় যাক রাইনল্যান্ডের সমরসজ্জা।
তার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এল। ফ্রান্স গেল। ব্রিটেন যায়-যায়। প্রথমবারের মতো এবারও মুশকিল-আসান মার্কিন সবাইকে বাঁচাল।
কোথায় না এখন এ-দুজাত শিখবে একজোটে কাজ করতে, যাতে করে ফের না। একটা লড়াই লাগে, উল্টো দ্য গল্ লেগে গেলেন ইংরেজকে বাদ দিয়ে ইয়োররাপের ওপর সর্দারি করতে!
