কিন্তু এ তো একটা দিক। আমার মূল প্রশ্ন এখনও পাঠকের কাছে রইল, অতি ঘরোয়া ভাষায় শুধাই, এই যে আমাদের সোসাইটি লেডি, আজ মুখুয্যেকে জিট করে কাল সেনকে, পরশু সেনকে জিটু করে ঘোষকে– তাঁর প্রত্যেক প্রেমের জয়ধ্বনি গাইবেন টলস্টয়?
সর্বশেষে পুনরায় বিস্ময় মানি চেখফের এই গল্পটির সামনে। বিস্ময় মানি টলস্টয়ের টীকার সম্মুখে। আমাদের মতো জড় পাষাণ-হৃদয়কে বিগলিত করে বইয়ে দিল শত শত প্রশ্নধারায়।
৩ জুলাই, ১৯৬৩
[আন্তন চেখফ : The Darling and other short stories, রুশ কনস্ট্যান্স গার্নেটের তরজমা, London, Chatto & Windus, 1918]
দ্য গল
০১.
একপাল কাকের মধ্যিখানে ডাণ্ডা ছুঁড়ে মারলে যা হয়, কয়েকদিন পূর্বে ইউরোপোমেরিকায় তাই হয়ে গেল। বারোয়ারি বাজার, বারোর হাট, যুক্তহট্ট– যা খুশি বলুন– তারই দিকে তাগ করে জেনারেল শার্ল দ্য গল্ ইংরেজকে জল-চল করার বিরুদ্ধে যে ডাণ্ডাখানি হালে ছুড়লেন, তারই ফলে ইউরোপোমেরিকায় তো কা-কা রব উঠেছেই, এদেশেও কা-কা রব ছাড়িয়ে উঠছে স্বস্তির প্রশ্বাস। এ অধম অর্থনীতির খবর রাখে যতখানি নিতান্ত না রাখলেই নয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একথাও সবিনয়ে বলব, যত দিন যাচ্ছে ততই অর্থবিদ পানডিট-দের প্রতি ভক্তি আমার কমছে।(১) মূল বক্তব্য থেকে সরে যাচ্ছি, তবু এই সুবাদে নিবেদন, এদেশের কর্তারা যে ভয়ে আঁতকে উঠেছিলেন, ব্রিট বারোর বাজারে ঢুকে পড়লে ভারতীয় মাল অনায়াসে ব্রিটেনে ঢুকতে পারবে না, আমার হৃদয় সে ভয়ে কম্পিত নয়। বস্তুত আমি কাফেরের মতো বলব, এই বিলিতি তথাকথিত সুখ-সুবিধেই আমাদের সর্বনাশ করছে। দুনিয়ার সর্বত্র আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজের মাল চালাবার চেষ্টা করছিনে। আমাদের লক্ষ্মীছাড়া ক্যাপিটালিস্টরা ইংরেজের হাতে সর্বস্ব সঁপে দিয়ে লক্ষ্মীলাভ করছেন। কিন্তু ওঁদেরই-বা দোষ দিই কেন? স্বামীজির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বার বার এ নির্জন প্রান্তরে আমি চিন্তা করছিলুম, তার সবকিছুই তো অল্পস্বল্প বুঝি, তাঁর রাজযোগ আমার নিত্যপথপ্রদর্শক, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় কথা, বড় কাজ কী ছিল? যে সিদ্ধান্তে পৌঁছলুম সেটি জড়ত্বনাশ। চিন্তায়, অনুভূতিতে এবং কর্মে আমরা জড় হয়ে গিয়েছি। বিশেষ করে কর্মে। গীতায় আছে, কর্মেই আমাদের অধিকার, ফলে নেই। আমরা গীতার ওপর আরেক কাঠি সরেস হয়ে গেলুম। বললুম, কর্মেও আমাদের অধিকার নেই।
এতকাল উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের বুলবুলি এসে বেবাক ধান খেয়ে গেল, কারও হুস(২) ছিল না। জগতে যারা হুশিয়ার(৩) এরা তাদের কাছে ঘেঁষতে চায় না, পাছে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। কিন্তু তারা অকস্মাৎ এদের অত্যন্ত কাছে ঘেঁষে, এবং প্রায়শ্চিত্তও করে না। শিরোমণি-চূড়ামণির দল পুঁথি খুলে বলেন, বেহুশ যারা তারাই পবিত্র, হুঁশিয়ার যারা তারাই অশুচি, হুশিয়ারদের প্রতি উদাসীন থেকো, প্রবুদ্ধমিব সুপ্তঃ।
সুপ্তি তবু ভালো। তার থেকে জাগৃতি আছে। কিন্তু জড়ত্বের কোনও ম্যাদ নেই।
এই জড়ত্বেরই অন্য শব্দ ক্লৈব্য।
গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ।
পণ্ডিতজিও তাই উদ্বিগ্ন হয়ে বার বার বলছেন– আমরা যেন কমপ্লেসেসের স্রোতে গা ঢেলে না দিই– ক্ষণতরে চীন এদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে বলে। কমপ্লেস জড়ত্বেরই ভদ্র নাম।
আমাদের ছাত্রেরা গাইডবুক মুখস্থ করে পাস করে, আমরা–অধ্যাপকেরা ত্রিশ বছর পূর্বে কলেজে যা শিখেছিলুম তাই পড়িয়ে কর্তব্য সমাধান করি, আমাদের ধার্মিকজন কোনও এক গুরুতে আত্মসমর্পণ করে ধর্মজীবন পালন হল বলে আশ্বস্ত হন, যে-বই লিখে আমাদের সাহিত্যিক বিখ্যাত হন তিনি বার বার সেইটেরই পুনরাবৃত্তি করেন, আমাদের ফিল্ম-পরিচালকেরা একই প্লট সাতান্নবার দেখান, এবং যে ব্যবসায়ীদের কথা নিয়ে এ অনুচ্ছেদ আরম্ভ করেছিলুম– একই বাজারে বছরের পর বছর মাল পাঠিয়ে পরমানন্দে শয্যায় গা এলিয়ে দেন। নব নব সঙ্কটের অভিযানে পদক্ষেপ করার জন্য যে বিধিদত্ত প্রাণশক্তি আমাদের রয়েছে সেটা জড়ত্বের বলীকে আচ্ছাদিত।
আমাদের জীর্ণ আবেশ সুকঠোর ঘাতে কাটাবার জন্য স্বামীজি এনেছিলেন জড়ত্বনাশা মৃত্যুঞ্জয় আশা। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, স্বামীজির উদ্দাম অফুরন্ত স্বতশ্চল প্রাণশক্তি দেখে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা ভয় পেয়ে বললেন, এ আমি কী গড়লুম! তাই সে ভুল শোধরাবার জন্য তাকে তাড়াতাড়ি নিজের কাছে টেনে নিলেন। শঙ্করাচার্যকে যে-রকম টেনে নিয়েছিলেন, চৈতন্যকে যে-রকম।
***
আশা করি কেউ ভাববেন না দ্য গলকে আমি চৈতন্য-স্বামীজির পর্যায়ে তুলছি : কিংবা আমি দ্য গলে মালা পরাবার জন্য উল্কণ্ঠিত হয়ে উঠেছি। স্বল্পবিস্তর নিবেদন করি।
ইংরেজের যে-রকম রাজকীয় সেন্ডহার্স্ট সামরিক বিদ্যালয়, ফরাসির তেমনি স্যাঁ সির। দ্য গল সেখানে শিক্ষালাভ করেন। ছাব্বিশ বছর বয়সে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি জর্মনদের কাছে বন্দি হন। এই সময় বন্দি অবস্থায় তিনি জর্মন ভাষা শিখে নেন। হালে তিনি জর্মনগণ কর্তৃক নিমন্ত্রিত হয়ে ওই দেশ ভ্রমণের সময় একাধিক শহরে জর্মন ভাষায় বক্তৃতা দেন। ইতিপূর্বে ফ্রান্সের কোনও রাষ্ট্রপতি জৰ্মনিতে যাননি– নেপোলিয়নের কথা বাদ দিন, তিনি গিয়েছিলেন বিজেতারূপে তার ওপর ইনি বলেছেন তাদেরই মাতৃভাষা, জর্মনরাতর। তাদের হর্ষধ্বনি বেতারে শুনেছি।
