মেয়ে ডাক্তার, টেলিগ্রাফের কেরানি, নারী-বৈজ্ঞানিক, মেয়ে-উকিল, লেখিকা– এ সব না থাকলেও আমাদের চলত, কিন্তু যারা মানুষের মধ্যে যা সর্বোত্তম তাকে ভালোবাসে এবং সেইটিকে অগোচরে তার মধ্যে সঞ্চালিত, উদ্বুদ্ধ করে তার সহায় হয়, সেই মা, সহায়িকা, সান্ত্বনাদাত্রী– তারা না থাকলে জীবনটা বিপরীত একটা ব্যবহার হয়ে উঠত। যিশুখ্রিস্টের কাছে কোনও মগদলিনি আসত না, সাধু ফ্রান্সিসের সঙ্গে ক্লারা থাকত না, ডিসেম্বরের বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের পত্নীরা সাইবেরিয়ায় যেত না, দুখবরদের স্ত্রীরা যে তাদের স্বামীদের সত্যের জন্য আত্মদানের পথ থেকে না সরিয়ে দিয়ে বরং সেই পথেই তাদের প্রবৃত্ত করেছিল, তা-ও হত না। থাকত না সেই হাজার হাজার অজানা মেয়েরা নারীকুলশ্রেষ্ঠা এরা– অজ্ঞাতেরা চিরকালই যা হয়– যারা সান্তনা দেয় মদ্যপ, দুর্বল, উচ্ছল জনকে, প্রেমস্নিগ্ধ সান্ত্বনার প্রয়োজন যাদের সবার চেয়ে বেশি। এ প্রেম যাতেই প্রযুক্ত হোক, কুকিনে বা খ্রিস্টে, এইটেই নারীর প্রধান, মহীয়সী, অনন্যলভ্যা শক্তি।
কী প্রচণ্ড বোঝার ভুল, এইসব তথাকথিত নারীসমস্যা– যার কবলে পড়েছে শুধু মেয়ে নয়, পুরুষদেরও বেশিরভাগ। অর্বাচীন যে কোনও ধারণার কবলে এরা পড়বেই।
মেয়েদের মন চায় নিজেদের উন্নতি। এর চেয়ে ন্যায় যুক্তিসঙ্গত কথা আর কী হতে পারে?
কিন্তু স্বভাবগুণে মেয়েদের কাজ পুরুষদের কাজ থেকে ভিন্ন। অতএব মেয়েদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের আদর্শ এবং পুরুষদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের আদর্শ এক হতে পারে না। মেনে নেওয়া যাক যে, মেয়েদের আদর্শ কী তা আমরা জানি না। যাই হোক সেটা, এটা নিশ্চিত যে সেটা পুরুষের চরম উল্কর্ষের আদর্শ নয়। অথচ, নারীজাতির পথকণ্টক এক শৌখিন নারী আন্দোলনের সমস্ত উদ্ভট কার্যকলাপের লক্ষ্য হচ্ছে ওই পুরুষালি আদর্শে পৌঁছানো।
আমার মনে হয়, এই ভুল বোঝার প্রভাব চেখফের ওপর পড়েছিল দুলালী লেখার সময়।
বালআমের মতো তিনি চেয়েছিলেন অভিশাপ দিতে, কিন্তু কাব্যদেবতা তাঁকে নিষেধ করলেন, আদেশ দিলেন আশীর্বাদ করতে। আশীর্বাদই তিনি করলেন এবং অজ্ঞাতে এমন অপূর্ব প্রভামণ্ডিত করলেন এই মাধুরীময়ী প্রাণীটিকে যে সে চিরকালের মতো একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল– যে নিজে আনন্দ চায় এবং নিয়তি যাকেই তার সান্নিধ্যে আনে তাকেই আনন্দ দিতে চায়, এমন একটি নারী যে কী হতে পারে তার।
গল্পটি যে এত অপরূপ তার কারণ, এই পরিণতি পূর্বকল্পিত নয়।
.
আমি বাইসিকেল চালাতে শিখেছিলাম একটা হলঘরে। সেটা এত বড় যে তার মধ্যে একটি সৈন্যবাহিনী কুচকাওয়াজ করতে পারে। অপর প্রান্তে একটি মহিলা শিখছিলেন বাইসিকেল চড়া। আমি ভাবলাম, হুশিয়ার থাকব, ওঁর ওপর চোখ রাখলাম। চেয়ে থাকতে থাকতে ক্রমেই আমি ওঁর দিকে এগিয়ে পড়তে লাগলাম। উনি বিপদ দেখে তাড়াতাড়ি পিছু হটতে আরম্ভ করলেন। তবু আমি গিয়ে পড়লাম ওঁর ঘাড়ের উপর, ধাক্কা মেরে বাইসিকেল থেকে তাকে ফেলে দিলাম অর্থাৎ যা চেয়েছিলাম তার উল্টোটাই করে বসলাম শুধু এই কারণে যে, আমার দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল মহিলাটির ওপর।
চেখফেরও তাই হল, বিপরীত মুখে। উনি চেয়েছিলেন দুলালীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে, কিন্তু তাঁর কবির দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ থাকায় তিনি দিলেন তাকে তুলে।
.
এই টীকাটি পড়ার পর আর কার কী বলবার থাকে?
[চেখফ বলেছিলেন, এর চেয়ে বড় সম্মান আমি আমার জীবনে আর কী আশা করতে পারি?]।
সত্যেন্দ্রনাথ যখন একদিন দেখলেন, কবিগুরু তার একটি বাঙলা কবিতা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন (অর্থাৎ নিজের সৃজনীকর্ম মুলতবি রেখে) তখন তার হৃদয়ে কী শ্লাঘার উদয় হয়েছিল, তার কি কল্পনাও আমরা করতে পারি।
ধন্য দুলালীর প্রেম। তা সে যাকেই বাসুক না, যতবারই বাসুক না কেন। রমণীর এই প্রেমই তো জগৎকে শ্যামল করে রেখেছে।
কিন্তু আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়। সহৃদয় পাঠক আমার দম্ভ ক্ষমা করবেন।
দুলালী যখন ভানিচকাকে ভালোবাসছে তখন যদি হঠাৎ ভাসিলিকে দেখে তার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে হৃদয়হীনার মতো হৃদয় খান খান করে তার প্রেমকে পদদলিত করে (ইংরেজিতে যাকে বলে তাকে জি করে) ভাসিলিকে বরণ করত তখনও দুলালীর সে-প্রেম ধন্য?
ঠাকুর-দেবতার কার্যকলাপ আমাদের সমালোচনার বাইরে। এই যে কেষ্ট-ঠাকুর রাধাকে জিট করে মথুরা গিয়ে একাধিক প্রণয় এবং শুধু তাই নয়, রাধার কানের কাছে ঢাকঢোল বাজিয়ে বিয়ে করলেন, সেগুলোও ধন্য? অথচ আমাদের হৃদয় তো পড়ে রইল শ্রীরাধার রাঙা পায়ে। শত শত বছর ধরে এই বাঙলা দেশে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিরা আপন আপন বিরহবেদনা আপন আপন পদদলিত প্রেমের নিবিড়তম পীড়া তুলে দিলেন রাধার মুখে। তাই দিয়ে মাথুর আর সেই জিনিসই পদাবলীর হৃদয়খণ্ড, –মেরুদণ্ড যে নামেই তাকে ডাকা যাক। পৃথিবীর ইতিহাসে এর তুলনা আমি পাইনিঃ শত শত বছর ধরে হাজার হাজার কবি (এবং সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়, তার ভিতর নাকি প্রায় শ-তিনেক বিধর্মী মুসলমান কবি। ভাবলে আশ্চর্য বোধ হয়, এই অভাগিনী জিলটেড রাধার প্রেমে কী যাদুমন্ত্র লুকানো ছিল যে, শত শত বিধর্মী কবিকেও তার সামনে নতমস্তক হতে হল!) আপন আপন হৃদয়বেদনা– যার মূল্য বিশ্বাসঘাতক, প্রেমগ্ন নিরতিশয় স্বার্থপর, নীচ দয়িত দিল না– নিজের মুখে প্রকাশ না করে সর্ব বৈভব নত নমস্কারে রেখে দিল পাগলিনী শ্রীরাধার অধরোষ্ঠে। তার হয়তো একমাত্র কারণ, উপনিষদ বলেছেন, তাকে ত্যাগ করে ভোগ করবে। শ্রীরাধা প্রেম দিয়ে আনন্দ পেতে চাননি, মাতৃত্বের বিগলিত মধুরিমা, যশোদার মতো বিশ্বজয়ী পুত্রের গৌরবও তিনি কামনা করেননি। তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করে ভোগ করলেন। এ ভোগ দুলালীর ভোগ নয়। এ শচীপতি ইন্দ্রের ভোগ নয়, এ শ্মশানবাসী নীলকণ্ঠের বৈরাগ্য। কিন্তু আশ্চর্য, রবীন্দ্র-সৃষ্টিতে পদদলিত প্রেমের উদাহরণ নেই। যার জন্য তাঁর বিরহবেদনা তাঁর শত শত গানে প্রকাশ পেয়েছে তিনিও কবিকে ভালোবাসেন তার প্রেমের বেদনাতে কবির মূল্য আছে- শুধু তিনি চলে গেছেন দূরে। রবিপ্রেম কখনও লাঞ্ছিত হয়নি। সে অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না।
