কালো বেড়ালবাচ্চাটাকে ওলেঙ্কা তার কোল থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলত, যা এখন থেকে, যাহ্। এখানে কী তোর? এখানে কিছু নেই।
এমনিভাবে চলত দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, কোনও মত নেই, অমত নেই, আনন্দের ছিটেফোঁটা নেই। রাধুনী মাত্রা যা বলত ওলেঙ্কা তাই মেনে নিত।
একদিন– জুলাই মাস, গরম পড়েছে, সন্ধের দিকে, গরুগুলো যখন ঘরে ফিরছে সারা উঠোনে ধুলো উড়িয়ে সেই সময় কে যেন আচমকা দরজায় ঘা দিল। ওলেঙ্কা নিজেই গেল ফটক খুলতে, খুলে যা দেখল তাতে সে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল– দরজায় দাঁড়িয়ে পশুর ডাক্তার স্মিরনিন। তার চুলে পাক ধরেছে, পরনে বেসামরিক পোশাক।
এক মুহূর্তে ওলেঙ্কার সব কথা মনে পড়ে গেল। সে নিজেকে সামলাতে পারল না, কেঁদে ফেলল। একটি কথাও না বলে সে স্মিরনিননের বুকে তার মাথা রাখল। এত ওলোট-পালট হয়ে গেল তার মন যে, কখন যে স্মিরনিনকে ঘরে নিয়ে গিয়ে সে তার সঙ্গে চা খেতে লাগল তা সে বুঝতেই পারল না।
আনন্দে সে কেঁপে উঠল, মুখে কথা ফুটল, ওগো ম্লাদিমির প্লাতনি, কী জন্যে এলে এখানে?
স্মিরনিন বলল, আমি এসেছি এখানে থাকব বলে। সৈনিকের চাকরি আমার শেষ হয়েছে। এবারে এখানেই বসবাস করে নিজে রোজগার করবার চেষ্টা দেখব। তা ছাড়া ছেলেটিও বড় হল, তাকে উচ্চশিক্ষা দিতে হবে। আর জানো, স্ত্রীর সঙ্গে মিটমাট করে ফেলেছি।
ওলেঙ্কা বলল, কোথায় সে?
হোটেলে, আমার ছেলের সঙ্গে। আমি বেরিয়েছি একটা আস্তানা খুঁজতে। ভাড়া নেব।
সে কি কথা গো! আমার বাড়িটা নাও। ভাড়া। একটি পয়সা ভাড়া নেব না। এলেঙ্কার মন আবার চঞ্চল হয়ে উঠল, সে কাঁদতে শুরু করল। বলল, তোমরা এখানে থাকো। আমার পক্ষে বাড়ির একটা ধারই যথেষ্ট। ওহ কী আনন্দ যে হচ্ছে আমার!
পরদিনই তারা ছাতে দু-এক পোঁচ রঙ আর দেয়ালে চুনকাম করতে লেগে গেল। ওলেঙ্কা কোমরে হাত দিয়ে উঠোনটার চারদিক ঘুরে কাজের খবরদারি করতে লাগল। সেই পুরনো দিনের হাসি আবার তার মুখে ফুটে উঠল। মনে হল যেন লম্বা একটানা ঘুমের পর তার শরীর তাজা হয়ে প্রাণ ফুটে উঠেছে।
পশুর ডাক্তারের স্ত্রী এল। রোগা মেয়েটি, সাদাসিদে, ছোট করে ছাটা চুল, মুখে একটা খামখেয়ালি ভাব। সঙ্গে তার ছোট ছেলেটি, সাশা, বয়স প্রায় দশ, কিন্তু সে আন্দাজে মাথায় খাটো। ফুলো ফুলো গালে টোল, উজ্জ্বল নীল চোখ। উঠোনে ঢুকেই সে বেড়ালটার পিছনে ছুটতে আরম্ভ করল, সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল খিলখিল হাসি খুশি মনের ফুর্তির।
ছেলেটি জিগ্যেস করল, মাসি, এটা কি তোমার বেড়াল? ওর যখন বাচ্চা হবে, আমাকে দিও। মা ইঁদুর দেখে ভয়ানক ভয় পায়।
ছেলেটির সঙ্গে ওলেঙ্কার গল্প শুরু হল। চা খাওয়াল সে ছেলেটিকে। হঠাৎ তার বুকটা ভরে উঠল। মধুর একটা ভারে তার বুক কনকন করতে লাগল ছোট্ট ছেলেটি যেন তার নিজের।
সন্ধেবেলায় সে যখন খাবারঘরে তার পড়া তৈরি করতে বসল, এলেঙ্কা তার দিকে চেয়ে রইল। মন মুখ তার স্নেহমমতায় ভরে উঠল। সে বলতে লাগল, নিচু গলায়, আমার দুলাল, আমার মানিক, কত বুদ্ধি তোমার–কী সুন্দর দেখতে তুমি।
ছেলেটি জোরে জোরে পড়তে লাগল, বই দেখে, দ্বীপ একটি ভূখণ্ড, সম্পূর্ণরূপে জলবেষ্টিত।
ওলেঙ্কা পুনরাবৃত্তি করল, দ্বীপ একটি ভূখণ্ড।
বহুদিনের ফাঁকা মন থেকে একটি কথা না বলে সে আজ এই প্রথম একটি মত প্রকাশ করল যাতে তার বিশ্বাস আছে।
এইবারে তার নিজস্ব মতামত গড়ে উঠতে আরম্ভ করল। রাত্রে খাবার সময় সে সাশার বাবা-মাকে শোনাতে লাগল যে, হাইস্কুলে ছেলেপিলেদের যা পড়ানো হয় তা কী রকম শক্ত। অবশ্য শুধু কারিগরির কাজ শেখানোর চেয়ে উচ্চশিক্ষা ভালো, কারণ তার দ্বারা সমস্ত পথই খুলে যায়– চাও তুমি ডাক্তার হতে পার … ইঞ্জিনিয়ার হতে পার…
সাশা হাইস্কুলেই যেতে শুরু করল। তার মা খারকভে তার বোনের বাড়ি গেল, গিয়ে আর ফিরল না। বাবা তার পশুর পাল দেখতে বেরোত, কখনও কখনও একনাগাড়ে বাইরে থাকত। ওলেঙ্কার মনে হত সবাই সাশাকে ছেড়ে চলে গেল, কেউ তাকে চায় না, না খেয়ে ছেলেটি মরে যাচ্ছে। ওকে সে সরিয়ে আনল নিজের পাশটিতে ছোট একটি কামরায়। সেখানেই তার থাকবার বন্দোবস্ত করে দিল।
ছ মাস হয়ে গেল। সাশা থাকে তার পাশেই। রোজ সকালে ওলেঙ্কা যায় সাশার ঘরে। সাশা তখনও শুয়ে, গালের তলায় হাতটি রেখে গভীর ঘুমে অচেতন, নিশ্বাস নিঃশব্দে উঠছে-পড়ছে। ওলেঙ্কার মনে কষ্ট হয় সাশার ঘুম ভাঙাতে। তবু বলে, আস্তে আস্তে, সাশেনকা, উঠে পড়ো সোনা। স্কুলে যাবার সময় হল।
সাশা ওঠে, পোশাক পরে প্রার্থনা সেরে খেতে বসে। খায় তিন গ্লাস চা, দুটো বড় কড়া কেক। মাখন-মাখানো আধখানা ছোট রুটি। ঘুম তখনও তার পুরোপুরি কাটেনি, তাই মেজাজটি তখনও ধাতস্থ হয়নি।
এলেঙ্কা বলে, সাশেনকা, গল্পটা তোমার কিন্তু ভালো তৈরি হয়নি।
এমনভাবে চেয়ে থাকে সে তার দিকে, যেন ছেলেকে সে বিদায় দিচ্ছে দূর যাত্রার পথে।
তোমার জন্য আমি ভেবে মরি। প্রাণপণ চেষ্টা করো সোনামণি, ভালো করে পড়াশুনা করো। মন দিয়ে মাস্টারদের কথা শুনো।
সাশা বলে, আহ, আমাকে ছেড়ে দাও দিকি।
তার পর হেঁটে রওনা হয় স্কুলে।
ছোট মূর্তিটি পথে চলেছে, মাথায় মস্ত একটা টুপি, কাঁধে একটা ঝুলি। ওলেঙ্কা নিঃশব্দে পিছু পিছু যায়। ডাকে, সাশেনকা– আ।
