সাশা যেই পিছন ফিরে তাকায় এলেঙ্কা তার হাতে গুঁজে দেয় একটি খেজুর বা কারামেলের একটি টুকরো।
স্কুলের গলি এসে পড়ে। সাশেনকার বিশ্রী লাগে, লম্বা মোটাসোটা একটি মহিলা তার পিছু পিছু আসছেন, দেখে তার লজ্জা করে। পিছন ফিরে সে বলে, মাসি, বাড়ি ফিরে যাও। এখন আমি একা যেতে পারব।
ওলেঙ্কা থামে, কিন্তু তার চোখ সরে না। স্কুলে ঢোকার পথটিতে ছেলে পৌঁছে চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত সে তার দিকে তাকিয়েই থাকে। আহ, কী ভালোই বাসে সে ছেলেটিকে। মায়ার ফাঁদে সে আগেও পড়েছে, কিন্তু কেউই তাকে এমন করে বাঁধতে পারেনি। আজ তার মায়ের মন জেগে ওঠে যত আনন্দে, যেমন করে তার আত্মাটাকে একেবারে বিলিয়ে দিয়েছে, তেমন কখনও হয়নি আগে। এই ছোট্ট ছেলেটি তার নিজের নয়, তবু তার গালের টোলটি, মাথার টুপিটার জন্য সে তার জীবন দিতে পারে, আনন্দে, মমতায়, জলভরা চোখে। কেন? কেন তা কে বলতে পারে?
সাশাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ওলেঙ্কা শান্ত মনে বাড়ি ফিরে যায়। মনভরা তার তৃপ্তি, প্রশান্তি, ভালোবাসা। গেল ছ মাসে বয়স যেন তার কমে গেছে, মুখে উজ্জ্বল আনন্দ। লোকে তাকে দেখে খুশি হয়, বলে, সুপ্রভাত গো ওলগা সেমইয়নভুনা, দুলালী, কেমন আছ দুলালী?
সে বলে, স্কুলে আজকাল এত শক্ত পড়া দেয়। বাজারে ঘুরে কেনাকাটার ফাঁকে ফাঁকে সে বলতে থাকে, ঠাট্টা নয়। কাল প্রথম ঘণ্টায় ওকে পড়া দিয়েছে একটা গল্প মুখস্ত, লাতিন থেকে একটা তরজমা আর একটি সমস্যাপূরণ। ওইটুকু একটা ছেলের পক্ষে এটা বড্ড বাড়াবাড়ি, বাস্তবিকই।
তার পর সে আরম্ভ করে মাস্টারদের কথা, পড়ার কথা, পাঠ্যবইগুলোর কথা– সাশা যা বলে ঠিক তাই বলে।
তিনটের সময় ওরা একসঙ্গে খায়। সন্ধেবেলায়, মাস্টাররা যে বাড়ির পড়া দেন তা ওরা পড়ে একসঙ্গে, একই সঙ্গে কাঁদে। সাশাকে বিছানায় শুইয়ে ওলেঙ্কা প্রার্থনায় আর ক্রুশচিহ্ন আঁকায় অনেকক্ষণ লাগিয়ে দেয়। তার পর সে নিজে শুতে যায় আর স্বপ্ন দেখে সেই দূর, অস্পষ্ট ভবিষ্যতের, যখন সাশার পড়া শেষ হয়েছে, সে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার– তার মস্ত একটা বাড়ি, ঘোড়াগাড়ি। বিয়ে হয়েছে, ছেলে-মেয়ে হয়েছে… এই কথাই ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত চোখ দিয়ে তার জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। পাশে কালো বেড়ালটা শুয়ে আওয়াজ করে…ঘড়র… ঘড়র।
হঠাৎ দরজায় জোরে ঘা পড়ে। ওলেঙ্কার ঘুম ভেঙে যায়। ভয়ে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, বুক ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। আধ মিনিট বাদে আবার ঘা।
ওলগার সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে। সে ভাবে, খারক থেকে এসেছে তার। সাশার মা তাকে চেয়ে পাঠিয়েছে। হা ভগবান!
সমস্ত আশাভরসা তার উবে যায়, মাথা-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে, মনে হয়, তার মতো অভাগিনী জগতে আর কেউ নেই।
কিন্তু আরও এক মুহূর্ত কেটে যাবার পর সে কার যেন গলা শুনতে পায়; কিছু নয়, পশুর ডাক্তার ক্লাব থেকে ঘরে ফিরল।
ওলেঙ্কা মনে মনে বলে, যাক। ধন্য ভগবান! ক্রমে ক্রমে তার বুকের ওপর থেকে ভারটা সরে যায়। আশ্বস্ত হয়ে সে ফিরে যায় বিছানায়, আর সাশার কথা ভাবে। পাশের ঘরে ঘুমোয় সাশা আর মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে ঘুমের ঘোরে, দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা! এই, ওকি, মারামারি নয়!
***
গল্পটি চেখফের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প। কেউ কেউ বলেন, দি বেস্ট শর্ট স্টোরি অব চেখফ। আবার কেউ কেউ বলেন, পৃথিবীর সর্বোত্তম শ্রেষ্ঠ গল্প।
কেন?
তারই টীকা করেছেন স্বয়ং টলস্টয়। এ-রকম একটা ঘটনা এই বাঙলা দেশেই ঘটেছিল। প্রভাত মুখুয্যে একটা ছোটগল্প লিখেছিলেন। তার মূলে বক্তব্য ছিল, হিন্দুর নীচ জাতির একটি ছেলে অপমানিত বোধ করে খ্রিস্টান হবে বলে মনস্থির করল। তখন দেখে, খ্রিস্টানদের ভিতরও জাতিভেদ রয়েছে। নেটিভ খ্রিস্টানদের জন্য আলাদা ক্লাব, এমনকি ধর্মমন্দির– চার্চ সে-ও আলাদা, এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস্য, মৃত্যুর পরও জাতিভেদ যায় না : গোরার জন্য ভিন্ন। গোরস্তান, নেটিভের ভিন্ন গোরস্তান। গল্পটি পড়ে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ, সে যুগের ঋষিপ্রধান দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে একটি সমালোচনা লেখেন– ডাঙায় বাঘ জলে কুমির। হিন্দুর বর্ণাশ্রম সমস্যা নিয়ে এরকম প্রামাণিক প্রবন্ধ এর পূর্বে বা পরে কখনও লিখিত হয়নি। হরিজন আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার বহু বহু পূর্বে।
টলস্টয়ের টীকা পড়ে পাঠক বুঝবেন, আমরা, সাধারণ-পাঠক, কত সহজেই গল্পটির মূল বক্তব্য মিস করে যেতে পারি। অনবদ্য এই টীকাটি।
টীকাটি প্রকাশিত হওয়ার পর চেখফ সর্বসাধারণকে অনুরোধ জানান তাঁর গল্পটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন টীকাটি পড়েন এবং প্রকাশকদের অনুরোধ করেন, তারা যেন সবসময়ই গল্পটির সঙ্গে টীকাটিও ছাপেন। এটিও অনুবাদ করেছেন সখা খাফী খান।
দুলালীর সমালোচনা
টলস্তয়
বাইলের গণনাপুস্তকে একটি গল্প আছে। তার অর্থ অতি গভীর। গল্পটিতে বলা হয়েছে, ইরাএলিরা যখন মোআবের রাজ্যসীমায় এসে উপস্থিত হল, মোআবীয়দের রাজা বালাক তখন নবী বালআমকে ডেকে পাঠালেন ইসরাএলিদের অভিসম্পাত দেবার জন্য; কাজটি সেরে দিলে বালা বালআমকে বহু পুরস্কার দেবেন। তার লোভে বালআম বালাকের কাছে গেলেন এবং তাকে নিয়ে উঠলেন পর্বতে। সেখানে একটি বেদি তৈরি করা হল, গোবৎস ও মেষ উৎসর্গ করা হল অভিশাপের উদ্যোগে। বালা রইল অভিশাপের প্রতীক্ষায়, কিন্তু বালআম ইসরাএলের লোকদের অভিসম্পাত না দিয়ে তাদের আশীর্বাদ করলেন।
