আরও একটা ঘটনা ঘটল। ডাকঘরে ওলেঙ্কার একটি চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হল। তাকে সে বলল, আমাদের এই শহরে গরু-ঘোড়ার কী হয় না হয় দেখবার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই, তাই এত ব্যামো। প্রায়ই শোনা যায় দুধ খেয়ে মানুষের অসুখ করে, গরু-ঘোড়ার ছোঁয়াচ লেগে এটা হয়, সেটা হয়। গৃহপালিত পশুর স্বাস্থ্যরক্ষার দিকে, যেমন মানুষের জন্য, ঠিক তেমনি নজর রাখা উচিত।
পশুর ডাক্তারটির মনে যা ধারণা ওলেঙ্কার বক্তব্যও তাই। সকল বিষয়েই ডাক্তারের যা মত তারও আজকাল সেই মত। স্পষ্টই দেখা গেল, কোনও একটা আকর্ষণ বিনা ওলেঙ্কার একটি বছরও কাটে না। আর, এবারে সে নতুন করে খুঁজে পেয়েছে আনন্দ, একেবারে তার নিজের বাড়িরই একপাশে।
মেয়েটি আর কেউ হলে তার নিন্দে হত, কিন্তু ওলেঙ্কার সম্বন্ধে কেউ কুকথা ভাবতে পারত না– সবটাই তার এত সহজ স্বাভাবিক। কি ডাক্তার কি সে– কেউই খুলে বলেনি যে আগে তাদের মধ্যে যে সম্পর্কটা ছিল তা বদলেছে। বরং ওটা ওরা ঢেকে রাখতেই চেষ্টা করত, কিন্তু পারত না, কারণ ওলেঙ্কার কথা গোপন রাখার ক্ষমতা ছিল না।
যখন ডাক্তারের সহকর্মীরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসত, ওলেঙ্কা তাদের চা ঢেলে দিতে দিতে বা যাবার সময় তুলত জীবজন্তুর মড়কের কথা। কিংবা বলত পশুদের কোনও ব্যায়রাম অথবা সরকারি কসাইখানার বিষয়। ডাক্তার বেজায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ত। বন্ধুরা চলে যেতেই সে ওলেঙ্কার হাত চেপে ধরে ফোঁস করে উঠত, বার বার তোমাকে মানা করেছি, যা তুমি বোঝ না তা নিয়ে কথা না বলতে। আমরা পশু-চিকিৎসকেরা যখন আলাপ-আলোচনা করি, দয়া করে তুমি তার মধ্যে এসে পড়ো না। সত্যি ভারি রাগ হয়।
ওলেঙ্কা স্তম্ভিত হয়ে তার দিকে তাকাত, চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করত, তা হলে কী বিষয়ে কথা বলব, ভলকা? তার পর জলভরা চোখে সে ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরত, ডাক্তারকে দিব্যি দিত রাগ না করতে। তার পর দু জনেরই খোশমেজাজ ফিরে আসত।
এ আনন্দ বেশিদিন রইল না। ডাক্তার তার সৈন্যদলের সঙ্গে কোথায় গেল, একেবারের মতো। গোটা দলটাই বদলি হয়ে গেল দূরদেশে হয়তো-বা সাইবেরিয়াতেই। ওলেঙ্কা একা পড়ে গেল।
এবারে সে একেবারেই একলা পড়ে গেল। তার বাবা অনেকদিন আগেই মারা গেছেন; তার সেই আরামকেদারাটা পড়ে আছে চিলেকোঠার গুদোমে। ধুলোয় ভর্তি, একটা পায়া ভাঙা। ওলেঙ্কা রোগা হয়ে গেল, তার চেহারায়ও আর সে শ্ৰী রইল না। রাস্তায় দেখা হলে আর তার দিকে কেউ আগের মতো চাইত না, হাসত না। বোঝা গেল তার জীবনের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো চলে গেল। সেদিন রইল পিছনে পড়ে, এখন যে জীবন শুরু হল তা আলাদা, অনিশ্চিত, তার কথা ভাবতেও বুক কেঁপে ওঠে।
সন্ধেবেলায় বারান্দায় বসে ওলেঙ্কা শুনত তিতোলিতে বাজনা বাজছে, বাজি ফুটছে, কিন্তু তা শুনে তার কোনও কথাই মনে হত না। ফাঁকা উঠোনটার দিকে সে নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে থাকত, কোনও কথা ভাবত না, চাইত না কিছুই। দিন ফুরিয়ে গেলে ওলেঙ্কা শুয়ে পড়ত, স্বপ্নে দেখত ফাঁকা উঠোনটা। খাওয়া-দাওয়া করত, যেন অনিচ্ছায়।
সবচেয়ে বড় আর বিশ্রী ব্যাপার হল যে, তার আর কোনওরকম মতামত রইল না। চোখে পড়ত নানা জিনিস, বুঝত কী হচ্ছে না হচ্ছে, কিন্তু কোনওকিছু সম্বন্ধেই একটা মতামত তার মনে গড়ে উঠত না। কী নিয়ে কথা বলা যায় তা-ও সে বুঝত না।
কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার মতামত না থাকা! ধরো, দেখছ একটি বোতল অথবা বৃষ্টি, কিংবা দেখছ চাষি চলেছে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে, কিন্তু বোতল, বৃষ্টি বা চাষি কী নিমিত্ত, কী তাদের তাৎপর্য কিছুই বলতে পারছ না, হাজার রুপিয়া কবুল করলেও নয়।
যখন তার কুকিন ছিল অথবা পুস্তভালভ কিংবা পরে তার কাছে থাকত পশুর ডাক্তারটি– তখন ওলেঙ্কা সবকিছুই বুঝিয়ে দিতে পারত, চাও তারই সম্বন্ধে একটা মত দিতে পারত। কিন্তু এখন তার মনটা ফাঁকা উঠোনটার মতো। বড় কষ্টমাখা, বড় বিস্বাদ এ জীবন।
শহরটা একটু করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। খোলামেলা রাস্তা জিপৃসি রোড় হয়ে উঠল শহুরে সড়ক। যেখানে ছিল তিভোলির বাগানগুলো আর কাঠের গোলা, সেখানে বাড়ির সারির ফাঁকে ফাঁকে গলিখুঁজি গজিয়ে উঠল। কী তাড়াতাড়ি কেটে যায় সময়।
ওলেঙ্কার বাড়িটা শ্রীহীন হয়ে পড়ল। ছাতে মরচে ধরল, কুঁড়েঘর একপাশে ঝুলে পড়ল, সারা উঠোনটা ভরে গেল লম্বা ঘাস আর বিছুটির ঝোপে। ওলেঙ্কার নিজেরও বয়স হল, চেহারায় সে লাবণ্য আর রইল না।
গ্রীষ্মকালে সে বসত বারান্দাটায়, মন শূন্য, নিরানন্দ, বিরস। শীতে সে বসত জানালার ধারে, তাকিয়ে থাকত বরফের দিকে। কখনও বসন্তের বাতাসে অথবা হাওয়ায় ভেসে আসা গির্জার ঘন্টাধ্বনিতে স্মৃতির বন্যা জেগে উঠত, তখন তার মন গলে যেত, চোখে জল ভরে আসত কিন্তু তা-ও মুহূর্ত-স্থায়ী, সেটা চলে গেলেই আবার ফিরে আসত সেই শূন্যতা, জীবনের উদ্দেশ্যের সেই অনিশ্চয়তা।
কালো বেড়ালের বাচ্চা ব্ৰিস্কা তার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াত, ঘড়র ঘড়র শব্দ করত, কিন্তু ওসব বেড়ালি আদরে ওলেঙ্কার মন সাড়া দিত না। ওর কি ওইটুকুরই দরকার? সে চাইত এমন ভালোবাসা যা তার সমস্ত আত্মা, তার মনকে দখল করবে, মনে জন্ম দেবে ধারণার, জীবনে আনবে গতিমুখ, পড়ন্ত বয়সের রক্তে এনে দেবে উষ্ণতা।
