ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে ওঠে ওলেঙ্কা। পুস্তভালভ আদর করে বলে, ওলেঙ্কা, কী হল দুলালী? মাথায় কাঁধে বুকে ক্রুশচিহ্ন ছোঁয়াও।
যে ধারণাই তার স্বামীর হত ওলেঙ্কারও তাই হত। পুস্তভালভ যেই বলত ঘরে বড় গরম, অথবা ব্যবসায়ে মন্দা পড়েছে, ওলেঙ্কারও মনে হত তাই। আমোদ-প্রমোদ পুস্তভালভের ভালো লাগত না, ছুটির দিন কাটাত বাড়ি বসে। ওলেঙ্কাও তাই করত।
বন্ধুবান্ধবেরা বলত, তুমি সবটা সময় কাটাও বাড়িতে বা আপিসে। থিয়েটারে সার্কাসে যাওয়াও তো উচিত।
মুরুব্বিয়ানার সুরে ওলেঙ্কা বলে, ভাসিচুকা আর আমি থিয়েটারের ধার মাড়াই না। আমরা খাঁটিয়ে লোক, ওসব ছ্যাবলামির দিকে আমাদের মন নেই। কী হয় ওসব থিয়েটার দিয়ে?
প্রতি শনিবার সন্ধ্যাবেলায় আর ছুটির দিনের সকাল সকাল তারা গির্জায় যেত, পাশাপাশি হেঁটে ফিরত, দু জনেরই মুখে ফুটে থাকত উপাসনার আবেগ। দু জনেরই অঙ্গে লেগে থাকত মনোরম সুবাস। ওলেঙ্কার রেশমি পোশাক থেকে বেরোত একটা খুশি-খুশি খখস্ শব্দ।
বাড়িতে তাদের খাদ্য ছিল চা, মিষ্টি রুটি, আর রকম রকম জ্যাম। তার পর কিমার পাই। রোজ দুপুরবেলা তাদের বাড়ির সামনের উঠোনে, গেটের বাইরে, রাস্তায়, সুরুয়ার ভুরভুরে গন্ধ ছড়াত, ভেড়ার বা হাঁসের ঝলসানো মাংসের কিংবা উপবাসের দিনে মাছের। যে-ই যেত ওবাড়ির পাশ দিয়ে, তারই খিদে পেয়ে যেত।
আপিসে, সামোভারে চায়ের জল সর্বদাই চড়ানো থাকত– খদ্দের এলে দেওয়া হত চায়ের সঙ্গে কড়াপাকের পিঠে।
সপ্তাহে একদিন করে তারা যেত স্নানাগারে, ফিরত একসঙ্গে টকটকে রাঙাবরণ হয়ে।
ওলেঙ্কা বলত বন্ধুদের, সত্যি ঈশ্বরের কৃপায় আমরা সবদিক থেকে বেশ ভালোই আছি। যেমন সুখে-স্বচ্ছন্দে আছি ভাসিচকা আর আমি, তেমনি যদি সবাই থাকত তত বেশ হত।
পুস্তভালভ যখন কাঠ কিনতে মগিলেভে যেত, ওলেঙ্কার ভীষণ মন-কেমন করত। সারারাত সে জেগে কাটাত, কাদত।
মাঝে মাঝে স্মিরনিন তার সঙ্গে দেখা করতে আসত। স্মিরনিন ছিল সৈন্যদলের পশু-চিকিৎসক। সে ওলেঙ্কাদেরই বাড়ির একপাশটা ভাড়া নিয়ে থাকত। তার অল্প বয়স। সে এসে গল্প-সল্প করত, তাস খেলত, ওলেঙ্কার মনটা ভুলে থাকত।
স্মিরনিননের নানা কথার মধ্যে ওলেঙ্কার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত তার ঘরের খবর। স্মিরনিন বিবাহিত, আর একটি ছেলে আছে। তবে স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক চুকে গেছে, কারণ পরপুরুষের সঙ্গে প্রেম। বউকে সে দু চক্ষে দেখতে পারে না, তবু মাস মাস টাকা পাঠায় চল্লিশ রুল, তার ছেলের খোরপোশ বাবদ। এসব শুনে ওলেঙ্কা মাথা নাড়ে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওর জন্য বড় দুঃখ হয় তার মনে।
যাবার সময় ওলেঙ্কা স্মিরনিনকে মোমবাতি হাতে করে সিঁড়ি অবধি পৌঁছে দেয়। বলে, ভগবান করুন, তোমার যেন কোনও বিপদ-আপদ না হয়। তুমি যে রইলে এতটা সময় আমার সঙ্গে, তার জন্য ধন্যবাদ। স্বর্গের রানি মেরি তোমাকে অটুট স্বাস্থ্যে রাখুন।
তার স্বামীর যেমন চারদিকে বিবেচনা করে গম্ভীরভাবে কথা কইবার ধরন, ওলেঙ্কা তারই অনুকরণ করে। ডাক্তার সিঁড়ির নিচেকার দরজা দিয়ে বেরোচ্ছে, তখন ওলেঙ্কা তাকে ডেকে ফেরায়, আর বলে, দেখ ভাদিমির প্লাতোনি, স্ত্রীর সঙ্গে তোমার মিটমাট করে ফেলাই উচিত; তাকে ক্ষমা কর, ছেলের মুখ চেয়ে। ছেলেটি হয়তো সবই বোঝে।
পুস্তভালভ যখন ফিরে এল, ওলেঙ্কা তাকে ঘোড়ার ডাক্তারের দুঃখময় জীবনের সমস্ত কাহিনী শোনাল গলা খাটো করে। স্বামী-স্ত্রী দু জনেই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, মাথা নাড়ল। দু জনেই বলাবলি করতে লাগল ছেলেটির বিষয়ে। বলল, নিশ্চয়ই ছেলেটির বাবার জন্য মন-কেমন করে। তার পর দু জনেরই মনে যেন কেমন করে এল একই কথা। তারা দাঁড়াল এসে গৃহ-বিগ্রহের সামনে। প্রার্থনা করল মাটি অবধি নুয়ে, ভগবান যেন তাদের সন্তান দেন।
এমনিভাবে পুস্তভালভ পরিবার ছ-টি বছর কাটাল, পরম শান্তিতে, বিনা আড়ম্বরে, ভালোবেসে, পরস্পরের সঙ্গে মিল সম্পূর্ণ বজায় রেখে। তার পর একদিন, শীতকালে ভাসিলি আন্দ্রেয়ি আপিসে বসে গরম চা খাওয়ার পর মাথায় টুপি না এঁটে বেরিয়ে গেল কিছু কাঠ চালান দিতে। তার ঠাণ্ডা লেগে গেল, অসুখ করল। সবচেয়ে বড় বড় ডাক্তার তার চিকিৎসা করলেন, কিন্তু রোগ কিছুতেই সারল না। চার মাস ভোগের পর পুস্তভালভ মারা গেল। ওলেঙ্কা আবার বিধবা হল।
স্বামীর গোর দিয়ে ওলেঙ্কা কুঁপিয়ে কান্না শুরু করল, কার কাছে যাব আমি, ওগো তোমাকে ছেড়ে কী করে থাকব আমি অভাগী দুঃখিনী? ওগো তোমরা সবাই আমাকে দেখসে।
কালো শোকবস্ত্র পরে ওলেঙ্কা চলাফেরা করে। মাথায় টুপি নেই, হাতে দস্তানা পরে না। চোখের জলের ধারার নকশায় তৈরি সাদা ঝালর অঙ্গে ধরে। বাইরে বেরোয় কদাচিৎ যদিও-বা যায় কোথাও তো সে গির্জায় কিংবা স্বামীর কবর দেখতে। বাড়িতে বাস করে যেন সন্ন্যাসিনী।
ছ-টি মাস কেটে যাবার পর সে বিধবার বেশ ছাড়ল। তার ঘরের জানালার খড়খড়ি উঠতে আরম্ভ করল। কখনও-সখনও তাকে বাজারের পথেও দেখা যেতে লাগল, সকালের দিকে রাঁধুনীর সঙ্গে। কী যে সে করে, বাড়িতে কী করে তার দিন কাটে তা নিশ্চয় করে কেউ জানল না, তবে আন্দাজ একটা করে গেল। দেখা যেত, ওলেঙ্কা বাগানে বসে চা খাচ্ছে ঘোড়ার ডাক্তারটির সঙ্গে, ডাক্তার ওলেঙ্কাকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাচ্ছে। এসব দেখে লোকে অনুমান একটা করে নিত।
