শীতের মৌসুমেও ওদের গেল ভালোই। মিউনিসিপ্যালিটির থিয়েটারখানা ওরা ভাড়া নিল, নিয়ে অল্পদিনের মেয়াদে ভাড়া দিল উক্রাইন-দেশি একটা দলকে, এক জাদুকরকে, স্থানীয় একটি নাটুকে সঙ্কে।
ওলেঙ্কা হয়ে উঠল আরও গোলগাল, মুখে ফুটল কায়েম একটা খুশির জৌলুস, কুকিন হয়ে গেল আরও রোগা, মুখ হল আরও হলুদে। ভয়ানক লোকসানের বুলি তার মুখে লেগেই রইল, যদিও শীতের বাজারে ব্যবসা তার মোটেই খারাপ চলেনি।
কুকি রাত্রে কাশে। ওলেঙ্কা ফলের রসের সঙ্গে ফুল মেড়ে তাকে খাওয়ায়, বুকে তেলমালিশ করে, নিজের নরম নরম শালগুলো দিয়ে তার গা ঢাকে।
বলে, কী মিষ্টি তুমি মণি। চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, অন্তর থেকেই, আমার সুন্দর, আমার বুকের ধন।
শীতের শেষে কুকিন গেল মস্কো, নতুন একটা দল নিয়ে আসতে। ওলেঙ্কা কুকিবিহনে ঘুমোতে পারে না। সারারাত জানালার ধারে বসে তারার দিকে চেয়ে থাকে। ঘরে মোরগ না থাকলে মুরগি যেমন সারারাত অস্বস্তিতে কাটায়, জেগে থাকে; ওলেঙ্কারও তেমনি হয়।
মস্কোয় কুকি আটকা পড়ে গেল। চিঠি দিল ও-মাসে ইস্টারের আগেই সে ফিরবে। তিভলির কাজকর্ম বুঝিয়ে লিখল।
যে সময় কুকিনের ফেরার কথা সেই সময়েই একদিন, দিনটা সোমবার, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, হঠাৎ দরজায় অলুক্ষণে রকমের একখানা ঘা পড়ল। সে কী আওয়াজ! যেন কেউ ঢাক পিটছে। দড়াম দড়াম দমাদ্দাম। রাধুনী মেয়েটা ঘুম-চোখে খালি পায়ে থৈ থৈ জল ভেঙে ছুটল বেড়ার দরজা খুলতে।
দরজার ওধার থেকে হেঁড়েগলায় কে বলল, দরজাটা খোলো তো, তোমার নামে তার এসেছে।
ওলেঙ্কা আগেও পেয়েছে টেলিগ্রাম তার স্বামীর কাছ থেকে, কিন্তু এবারে কেমন যেন সে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। থর থর কাঁপা হাতে টেলিগ্রাম খুলে সে পড়ল :
ইভান পেত্রোভিচ আজ হঠাৎ মারা গেল আগরা নির্দেশ সাপেক্ষ মঙ্গলবার শেষকৃত্য।
ঠিক এই ছিল টেলিগ্রামে, শেষকৃত্য আর অবোধ্য কথাটা আগরা। টেলিগ্রামে সই নাটুকে দলের বড়কর্তার।
ওলেঙ্কা কুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, আমার মণি, ভানিকা, মণি আমার, প্রিয়তম। কেন দেখা হল আমাদের? কেন তোমায় জানলাম, ভালোবাসলাম? তুমি তো ছেড়ে গেলে আমাকে, এখন তোমার দুঃখিনী ওলেঙ্কা কার পানে চাইবে?
মঙ্গলবার কুকিনকে ভাগানকোভো গোরস্তানে কবর দেওয়া হল। ওলেঙ্কা বাড়ি ফিরে এল বুধবার, এসেই বিছানায় আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল, এমন চেঁচিয়ে যে রাস্তা আর আশেপাশের বাড়ির উঠোন থেকে সে কান্না শোনা গেল।
পাড়াপড়শিরা ক্রুশের চিহ্ন এঁকে বুকে মাথায় কাঁধে আঙুল ছোঁয়াল আর বলল, বেচারি দুলালী, ওল্গা সেমূইয়ান। আহা, দুঃখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে বাছার।
তিন মাস বাদে একদিন গির্জা থেকে ফিরছে ওলেঙ্কা। শোকে-দুঃখে জর্জর। ঘটনাচক্রে বাবাকায়ে কাঠগোলার গোমস্তা ভাসিলি আন্দ্রেয়ি পুস্তভালভ, সে-ও ফিরছিল গির্জা থেকে, তারই সঙ্গে হেঁটে এল। পুস্তভালভের মাথায় কেতাদুরস্ত সাদা টুপি, পরনে সাদা ওয়েস্টকোট তার উপর ঝুলছে সোনার ঘড়ি-চেন। লোকটিকে দেখে মনে হয় না ব্যবসায়ী, দেখায় জমিদারের মতো।
সে বলল গম্ভীর সুরে, যা কিছু ঘটে ওলগা সেমইয়নভনা, সেসব ঘটে তারই আদেশে। স্বরে সমবেদনার রেশ। প্রিয়জনদের কেউ যদি চলে যায়, তবে তার কারণ ঈশ্বরের ইচ্ছা। বুক বেঁধে মাথা নত করে তা আমাদের মেনে নিতে হবে।
ওলেঙ্কাকে বাড়ির দরজা অবধি পৌঁছে দিয়ে পুস্তভালভ বিদায় নিল। ওলেঙ্কা সারাদিন ধরে শুনল তার গম্ভীর গলার আওয়াজ। চোখ যখন জুড়ে এল, স্বপ্নে দেখল তার কালো দাড়ি। বড় ভালো লাগল তাকে ওলেঙ্কার।
পুস্তভালভের মনে বোধহয় ওলেঙ্কা একটা দাগ ধরিয়ে দিল, কারণ দু দিন না যেতেই একটি আধবয়সী মহিলা, যাকে ওলেঙ্কা প্রায় চেনেই না, এল তার সঙ্গে কফি খেতে, আর খেতে বসেই পুস্তভালভের গল্প জুড়ে দিল। বলল, অতি চমৎকার শক্তপোক্ত লোকটি, বিয়ের বয়সী যে কোনও মেয়ে ওকে বিয়ে করে সুখী হবে। তিন দিন বাদে পুস্তভালভ নিজেই এল। রইল বেশিক্ষণ নয়, মিনিট দশেক হবে, কথা বলল অল্পই, কিন্তু ওলেঙ্কা তার প্রেমে পড়ে গেল– এতদূর যে সারারাত তার ঘুম হল না, জ্বরের মতো জ্বালায় জ্বলল, এবং সকাল হতে সেই আধবয়সী মহিলাকে ডেকে পাঠাল। কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল, তাড়াতাড়ি বিয়েও হয়ে গেল।
বিয়ের পর দু জনের বনিবনা খুব ভালো হল। নিয়মিত পুস্তভালভ কাঠগোলায় বসত দুপুরের খাওয়া অবধি, তার পর যেত কাজে বেরিয়ে, ওলেঙ্কা এসে বসত তার জায়গায়, আপিসে বসে সন্ধে অবধি বিল তৈরি করত, আর অর্ডারমাফিক মাল চালান দিত।
খদ্দেরদের এবং পরিচিত লোকদের ওলেঙ্কা শোনাত কাঠের দর ফি বচ্ছর শতকরা কুড়ি টাকা হিসাবে বাড়ে। আগে আমরা কাঠ নিতাম এখান থেকেই, কিন্তু এখন ভাসিকাকে প্রতি বছর যেতে হয় মগিলেভ অঞ্চলে, কাঠের বন্দোবস্ত করতে। আর ভাড়া কী! তাজ্জব হয়ে গালে হাত দিয়ে ওলেঙ্কা বলত, কী খরচা গাড়িভাড়ার!
তার মনে হত সে কাঠের ব্যবসায় আছে যুগ যুগ ধরে; কাঠ জীবনের সর্বপ্রধান এবং সার বস্তু। গার্ডার, কড়ি, বরগা, তক্তা, বাটাম, বাক্সের কাঠ, ল্যাথ, পিস্, স্ল্যাব কথাগুলো তার কাছে বড় আদরের মনে হত, শুনে মন-কেমন করত। রাত্রে সে স্বপ্ন দেখত পাহাড়প্রমাণ বোর্ড আর তক্তা, অসংখ্য গাড়িভর্তি কাঠের গুঁড়ি সার বেঁধে কোন্ দূর দেশে যাত্রা করেছে, ৮ ইঞ্চি চওড়া ২৮ ফুট লম্বা কড়িকাঠের একটা দল খাড়া দাঁড়িয়ে ধেয়ে চলেছে কাঠগোলার দিকে, কড়িতে কড়িতে, গার্ডারে স্ল্যাবে ঠোকাঠুকি হচ্ছে, শুকনো কাঠে কাঠে খটাখটির ভোতা আওয়াজ হচ্ছে, সবাই পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠছে, এর ওর ঘাড়ে চেপে স্কুপের মতো জমা হচ্ছে ..
