ককিন হতাশ হয়ে বলল, আবার! আবার এল বষ্টি। রোজ বৃষ্টি, রোজ, যেন আমাকে নাকাল করার জন্যেই নামে। গলায় দড়ি দিই না কেন? সর্বস্ব গেল। দিন দিন লোকসান আর লোকসান।
দু হাত জুড়ে ওলেঙ্কার দিকে ফিরে কুকি আবার বলতে লাগল, এই তো জীবন আমাদের, ওগা সেইয়ন। দু চোখ ফেটে জল আসে। খেটে মরি, যতদূর সাধ্য চেষ্টা করি, সারারাত জেগে ভাবি কী করে জিনিসটাকে উঁচুদরের করে তোলা যায়। হয় কী? এদিকে দেখ, লোকগুলোকে আহাম্মুখ, বর্বর।
আমি ওদের দেখাই সেরার সেরা ছোট ছোট অপেরা, কথা-ছাড়া শুধু ভঙ্গি দিয়ে বোঝানো নাটক, অপূর্ব অপূর্ব ভ্যারাইটি আর্টিস্ট। কিন্তু ওরা কি ও জিনিস চায়? বোঝে তার মর্ম? ওরা শুধু চায় হৈ-হুল্লোড়! ওদের দেখাতে হয় রদ্দি চিজ।
আবার ইদিকে দেখ আবহাওয়াখানা। প্রায় প্রতি সন্ধেয় বৃষ্টি। ১০ মে থেকে শুরু হল, চলছে রোজ, গোটা মে-জুন মাসটাই। দর্শকের দেখা নেই, অথচ বাগান-ভাড়াটা? সেটি ঠিক ধরে দিতে হয়। আর গাইয়ে-বাজিয়েদের মাইনেটা?
পরদিন সন্ধের দিকে আবার দেখা দিল মেঘ। হি হি করে হেসে উঠল কুকি। বলল, এসো, এসো বৃষ্টি। দাও ভাসিয়ে আমার প্রমোদ উদ্যান। সব ডোবাও, তার পর আমাকেও ডোবাও। আমার ইহলোক-পরলোক দুই-ই মজুক। মামলা করুক আমার আর্টিস্টরা আমার নামে, পাঠাক জেলে– সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে ফাঁসিকাঠে! হাহা হাহাঃ।
তার পরদিন আবার ওই।
ওলেঙ্কা চিন্তিত মুখে, নীরবে কুকিনের কথাগুলো শুনত। মাঝে মাঝে তার চোখে জল এসে পড়ত। এত উতলা হয়ে উঠত তার মন কুকিনের দুর্ভাগ্যে যে শেষ অবধি সে ওর প্রেমেই পড়ে গেল।
কুকিন মানুষটি বেঁটে, রোগা। মুখখানা ফ্যাকাসে। চুল আঁচড়ে রগের উপর টেনে নামানো। সরু গলায় কথা কয়, মুখ একপাশে বেঁকিয়ে। চেহারায় চিরকেলে নৈরাশ্যের ছাপ। তবু সে ওলেঙ্কার মনে গভীর এবং অকৃত্রিম একটি ভাব জাগিয়ে তুলল।
ওলেঙ্কা সর্বদাই কারও না কারও প্রেমে অভিভূত হয়ে থাকত। প্রথমে ছিল বাবা। এখন তিনি রুগণ; অন্ধকার একখানা ঘরে সারাদিন আরামকেদারায় বসে তার দিন কাটে। শ্বাসকষ্টে কাতর।
তার পর সে ভালোবাসল তার এক খুড়িমাকে। তিনি থাকতেন ব্রিয়াস্কে, দু বছরে একবার করে আসতেন। তার আগে, যখন সে স্কুলে পড়ত, তখন তার প্রেমপাত্রী ছিল তার ফরাসি শিক্ষিকা।
ওলেঙ্কা মেয়েটি শান্ত, সহৃদয় বড় ভালো স্বভাবের। চোখ দুটি ভীরু, নিরীহ। নিটোল স্বাস্থ্য। তার টলটলে, লালচে গাল দুখানি, ধপধপে সাদা নরম তুলতুলে ঘাড়ের উপর ছোট্ট কালো তিলটি, আর সরল স্নিগ্ধ যে হাসিটি ফুটে উঠত তার মুখে খুশির কোনও কথা শুনলেই, তা দেখে ছেলেরা ভাবত মন্দ নয় তো মেয়েটি। বেশ হাসতও। আর মেয়েরা তার সঙ্গে কথা কইতে কইতে হঠাৎ তার হাতখানি ধরে বলে উঠত, কথার মধ্যিখানে, আনন্দের উচ্ছ্বাসে ও দুলালী!
জন্ম থেকে যে বাড়িতে ওলেঙ্কার বাস, তার বাবার উইল অনুযায়ী সেটি তারই প্রাপ্য। বাড়িখানা ছিল শহরের একটু বাইরের দিকে, জিপসি রোডের উপর। প্রমোদ উদ্যান তিভলি থেকে বেশি দূরে নয়। সেখানে যখন সন্ধেবেলায় বা রাত্রে, বাজনা বাজত, বাজি ফুটত, ওলেঙ্কার মনে হত যেন যুদ্ধ বেধেছে কুকিনের সঙ্গে তার নিয়তির। কুকি লড়ছে, তার প্রধান শত্রু নিঃসাড় দর্শকগুলোর সঙ্গে। অমনি ওলেঙ্কার মন গলে যেত। ঘুমোতে ইচ্ছে করত না। ভোররাত্রে কুকি যখন বাড়ি ফিরত, তখন ওলেঙ্কা তার শোবারঘরের জানালায় আস্তে আস্তে টোকা দিত, আর পরদার ফাঁক দিয়ে শুধু তার মুখখানা আর কাঁধের একটুখানি দেখিয়ে তার দিকে চেয়ে হাসত, নরম হাসি।
কুকি বিয়ের প্রস্তাব করল, বিয়ে হয়ে গেল। তার পর দেখল, বেশ ভালো করে, ওলেঙ্কার ঘাড়খানি আর তার সুন্দর মোটাসোটা কাঁধ দুটি। দেখে বলে উঠল, দুলালী!
কুকিন খুশি হল, তবে তার বিয়ের দিন এবং রাত্রেও বৃষ্টি হল, তাই মুখের নিরাশ ভাবটা বদলাল না।
দু জনের বনে গেল বেশ। ওলেঙ্কা টিকিট বিক্রির দিকটা দেখত, হিসাব রাখত, মাইনে-পত্তর দিত। তার ছলাকলাবর্জিত হাসিটিতে কখনও টিকিটঘর, কখনও খাবার দোকানটি, কখনও রঙ্গমঞ্চের দুটি পাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠত।
বন্ধুদের সে বলতে আরম্ভ করল, পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার মধ্যে সর্বপ্রধান সর্বাধিক প্রয়োজনীয় এবং উল্লেখযোগ্য বস্তু হল নাট্যশালা–প্রকৃত আমোদ একমাত্র এরই মধ্য দিয়ে পাওয়া যেতে পারে। এর দ্বারাই মানুষ হয়ে উঠতে পারে দ্র এবং মানবতাবোধসম্পন্ন।
কিন্তু লোকে কি তা বোঝে? বলত ওলেঙ্কা। ওরা চায় হৈ-হুল্লোড়। কাল আমরা দেখালাম উল্টোপাল্টা ফাউস্ট বক্সগুলোর প্রায় সব কটিই খালি রইল। কিন্তু যদি ভানিচকা আর আমি দেখাতাম ওঁচা একটা কিছু, দেখতে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত রঙ্গালয়। কাল ভানিকা আর আমি দেখাচ্ছি নরকে অর্ফেউস্ নিশ্চয়ই এসো কিন্তু।
কুকি থিয়েটার সম্বন্ধে, অভিনেতাদের সম্বন্ধে যাই বলত ওলেঙ্কা তারই পুনরাবৃত্তি করত। কুকিনের মতোই সে-ও দর্শকদের অজ্ঞতা এবং রসবোধের অভাবকে ঘৃণা করত। মহড়ায় আসত ওলেঙ্কা, অভিনেতাদের ভুল শোধরাত– বাজিয়েদের গতিবিধির দিকে চোখ রাখত। খবরের কাগজে যদি খারাপ কিছু মন্তব্য করা হত তবে সে কেঁদে ফেলত, যেত সম্পাদকের কাছে, কৈফিয়ৎ চাইত।
অভিনেতারা তাকে ভালোবাসত, ডাকত ভানিচকা আর আমি, দুলালী বলে। ওলেঙ্কার ওদের জন্য কষ্ট হত, মাঝে মাঝে টাকা ধার দিত অল্প-স্বল্প, ঠকালে গোপনে চোখ মুছত, স্বামীর কাছে নালিশ করত না।
