আমি বললুম, রাজরাজড়া ধনী ছিলেন নিশ্চয়ই আজ যে-রকম সউদি আরব, কুয়েত, বাহরেনে শেখরা জলের মতো টাকা ওড়ায়– কিন্তু আর পাঁচজনের সচ্ছলতা কীরকম ছিল অতখানি আমি জানিনে।
আমাদের কথায় বাধা পড়ল। দেখি এক বৃদ্ধ আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে বিয়ারের গেলাস, পরনে মোটামুটি ভালো স্যুটই, তবে ফিটফাট বলা চলে না। ফিসফিস করে যেভাবে কথা আরম্ভ করল তাতে মনে হল, এখনও বুঝি নাৎসি যুগের গেস্তাপো গোয়েন্দার বিভীষিকা সম্পূর্ণ লোপ পায়নি। নাহ্, আমারই ভুল। হামবুর্গে যখন বেধড়ক বোমা ফেলে তখন কী জানি কী করে তার গলার সুর বদলে যায়। এ তত্ত্বটা জানা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তার ফিসফিসানিতে বলা কথাগুলো কেমন যেন উচাটন মন্ত্রে উচ্চারিত নিদারুণ ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে হচ্ছিল।
ডান হাত তুলে ধরে গেলাস দিয়ে জানালার দিকে নির্দেশ করে শুধাল, কী দেখছ?
আমি বললুম, এন্তের মোটরগাড়ি।
আবার সেই ফিসফিস। বলল, এদের কজন সত্যি সত্যি মোটর পুষতে পারে জানো? শতেকে গোটেক। তোমার দেশের কথা বলছিলে না, রাজরাজড়ারা ধনী ছিল, বাদবাকিদের কথা বলতে পারছ না। এখানেও তাই। এই যে মোটর দাবড়ে বেড়াচ্ছেন বাবুরা, এঁদের ক-জন মোটরের পুরো দাম শোধ করেছেন কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু আমি জানি, সব ইস্টমেন্টের ব্যাপার। জি লেবেন য়ুবার ঈরে ফেরহেল্টনিসে– দে আর লিভিং বিঅন্ড দেয়ার মিনস্– আনে সিকি, ওড়ায় টাকা।
আমি বললুম, সেকথা বললে চলবে কেন? কট্টর অবজেকটিভ বিচারেও বলা যায়, তোমাদের ধনদৌলত বিস্তর বেড়েছে।
বুড়ো অসহিষ্ণু হয়ে বলল, কে বলেছে ধনদৌলত বাড়েনি। বেড়েছে নিশ্চয়ই। আলবৎ বেড়েছে। কিন্তু প্রথম কথা, যা বেড়েছে তার তুলনায় খরচ করছে অনেক বেশি। এবং দ্বিতীয় কথা, এ ধনদৌলতের পাকা ভিত নেই। ১৯১২-১৯১৪-এ আমাদের যে ধনদৌলত ছিল তার ছিল পাকা বুনিয়াদ।
আমি বললুম, তাতেই-বা কী ফায়দা হল? ইনফ্লেশন এসে সে পাকা বুনিয়াদও তো ঝুরঝুরে করে দিয়ে চলে গেল।
বুড়ো শুধু মাথা নাড়ে আর বার বার বলে, জি লেবেন যুবার ঈরে ফেরহেল্টনিসে, জি লেবেন য়ুবার ঈরে ফেরহেল্টনিসে– কামায় সিকি, ওড়ায় টাকা।
বুড়ো আমাদের ছেড়ে বারের দিকে এগোলো খালি গেলাস পূর্ণ করার জন্য।
আমি যার সঙ্গে প্রথম কথা আরম্ভ করেছিলুম, সে এতক্ষণ হা-না কিছুই বলেনি। এবারে নিজের গেলাসের দিকে তাকিয়ে বলল, বুড়োর কথা একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। তবে তুমি যে এই ইনফ্লেশনের কথা তুললে না, সেইটেই হচ্ছে আসল ভয়। ইনফ্লেশনের বন্যা এসে একদিন সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায়, তারই ভয়ে সবাই টাকা খরচ করছে দু হাতে। এমনকি যে কড়ি এখনও কামানো হয়নি সেটাও ওড়াচ্ছে।
আমি বললুম, যে কড়ি এখনও কামানো হয়নি, সেটা ওড়াবে কী করে? তার পর বললুম, ওহ! বুঝেছি! ধার করে?
বলল, ঠিক ধার করে নয়। কারণ ধার করলে সে পয়সা একদিন না একদিন ফেরত দিতে হয় না দিলে পাওনাদার বাড়ি ক্রোক করে। কিন্তু ইনস্টমেন্টের কেনা জিনিসে সে ভয়ও নেই। বড়জোর যে জিনিসটা কিনেছে সেটা ফেরত নিয়ে যাবে।
ইতোমধ্যেই সেই ফিসফিস-গলা বুড়ো ফিরে এসেছে। বলল, টাকা ধার পর্যন্ত নেওয়া যায়। আমি রোক্কা টাকার কথা বলছি, ইনস্টমেন্টের কথা হচ্ছে না। টাকা শোধ না দিলে যদি ক্রোক করতে আসে, তবে লাটে তুলবে কী? বাড়ির তাবৎ জিনিসই তো ইন্সটলমেন্টে কেনা। সেগুলো তো ক্রোক করা যায় না।
আমি বুড়োকে বললুম, আপনি সব-কিছু বড্ড বেশি কালো চশমার ভিতর দিয়ে দেখছেন।
বুড়ো বলল, আমি কি একা? আমাদের প্রধানমন্ত্রী আডেনাওয়ারও তো ওই পরশু দিন দেশের লোককে সাবধান করে দিয়েছেন, এ সুদিন বেশিদিন থাকবে না। হুশিয়ার, সাবধান! পড়োনি কাগজে?
আমি বললুম, অতশত বুঝিনে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সবাই খাসা ফুর্তিতে আছে। ওইটেই হল বড় কথা। তার পর যার সঙ্গে প্রথম কথা বলতে আরম্ভ করেছিলুম, তাকে শুধালুম, তোমাদের শহরের মধ্যিখানে যে হাজারখানেক সেকেন্ডহ্যান্ড কার ফর সেল দেখলুম, সেগুলো কি ইনস্টলমেন্টে কেনা ছিল, আর কিস্তি খেলাপ করেছে বলে বাজেয়াপ্ত হয়ে ওইখানে গিয়ে পৌঁছেছে?
বলল, নিশ্চয়ই তার একটা বড় অংশ। বুড়ো আবার মাথা দোলাতে দোলাতে বলল, তোমাকে বলিনি, জি লেবেন যুবার ঈরে ফেরহেল্টনিসে! কামায় সিকি, ওড়ায় টাকা!
***
সুবুদ্ধিমান পাঠককে সাবধান করে দিচ্ছি, আমি অর্থনীতি জানিনে, এসব মতামতের কতখানি ধাপে টেকে, বলতে পারব না। আমি যা শুনেছি, সেইটেই রিপোর্ট করলুম। এবং আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, এসব পাবে শুমৃপেটার, কেইনস, শাট আসেন না। আসে যেদো-মেদো। কিন্তু ভুললে চলবে না, কথায় বলে, দশের মুখ খুদার তবল।
দুলালী
ওলেঙ্কা অবসরপ্রাপ্ত অ্যাসেসর প্লেইয়ান্নিকভের মেয়ে। সে ভাবনায় ডুবে বসেছিল উঠোনের সামনে ছোট্ট বারান্দাটিতে।
গরম, মাছিগুলো আঠার মতো লেগে আছে, বিরক্ত করছে। একটু বাদেই যে সন্ধে হবে সেকথা ভাবতে ভালোই লাগছে। পুব দিক থেকে ঘন কালো মেঘ এসে জমা হচ্ছে, সেইসঙ্গে থেকে থেকে ভিজে হাওয়ার আমেজ আসছে।
উঠোনের মধ্যিখানে আকাশের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কুকি। লোকটি থিয়েটারের ম্যানেজার, প্রতিদিন সন্ধেবেলায় এক বাগানে একটি আনন্দমেলার আসর জমায় নাম তিভলি প্রমোদ উদ্যান। থাকে ওলেঙ্কাদের বাড়ির একপাশে ভাড়া নিয়ে।
