হয়তো ঠিক অতখানি না। আমার এক অতি দূরসম্পর্কের ভাগ্নে ছিল। ডিগডিগে লম্বা পাতলা, কাঁচা সোনার বর্ণ, ভারি লাজুক। বিধবা মায়ের এক ছেলে। তাঁর মানা না শুনে পড়াশুনো করতে এসেছে শহরে। সে গাঁয়ের আর কোনও ছেলে কখনও বাইরে যায়নি। এর বোধহয় উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ছিল। ছেলেটি কিন্তু তোতলা। হয়তো সেই কারণেই বেশি লাজুক।
এক মাসও যায়নি। ইন্সপেক্টর এসেছেন স্কুল দেখতে। তাকে শুধিয়েছেন একটা প্রশ্ন। উত্তরটা সে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু একে তো তোতলা, তার ওপর উত্তর জানে বলেই হয়ে গেছে বেজায় নার্ভাস্। তোৎ তোৎ করে আরম্ভ করতে না করতেই ইন্সপেক্টর তার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ফেলে চলে গেলেন এগিয়ে।
ব্যাপারটা হয়েছিল বেলা তিনটেয়।
রাত সাতটায় পাওয়া গেল তার লাশ! গাছ থেকে ঝুলছে।
ভাবুন তো, স্কুল থেকে ফিরে যাবার পথে, তার মায়ের স্নেহের আঁচল থেকে দূরে, সেই আপন নির্জন কক্ষে ঘণ্টা তিনেক তার মনের ভিতর কী ঝড় বয়ে গিয়েছিল? অপমানের কালনাগিনীর বিষ যখন তার মস্তিষ্কের স্নায়ুর পর স্নায়ু জর্জর করে করে শেষ স্নায়ু কালো বিষেই রূপান্তরিত করেছে তখনই তো সে দড়িগাছা হাতে তুলে নেয়। সে তখন সহ্য-অসহ্যের সীমার বাইরে চলে গিয়েছে। আচ্ছা, সে কি তখন তার বিধবা মায়ের কথা একবারও ভাবেনি? কিন্তু দয়াময়, আমাকে মাফ কর, আমি বিচারকের আসনে বসবার কে?
অতি গরিব মধ্যবিত্ত ঘরের মৌলিক কায়েত, আমার প্রতিবেশী হাতে যেন স্বর্গ পেল যখন তার সাদামাটা মেয়েকে বিয়ে করল এক মহাবংশের ঘোষ– বিনা পণে। ছেলেটি গরিব এই যা দোষ কিন্তু ভারি বিনয়ী আর বড়ই কর্মঠ। প্রেসের কাজ জানে। আমরা হিন্দু-মুসলমান। সবাই শতহস্ত তুলে তাকে আশীর্বাদ করেছিলুম।
বিয়ের কিছুদিন পরে কী জানি কী করে ধরে নিয়ে এল এক পার্টনার। খুলল ছোট্ট একখানা প্রেস। হ্যান্ডবিল বিয়ে-শ্রাদ্ধের চিঠি ছাপায়, কখনও-বা মুন্সেফি আদালতের ফর্ম ছাপাবারও অর্ডার পায়। জল নেই, ঝড় নেই, দুই দুপুরই বরাবর, সর্বত্রই তাকে দেখা যায় প্রফের বোন্দা বগলে। হেসে বলে, এই হয়ে এল। অর্থাৎ শিগগিরই ব্যবসাটা পাকা ভিতে দড় হয়ে দাঁড়াবে। একটু যাকে দরদি ভাবত তাকে বলত, মাকে নিয়ে আসছি। গরিব মা গায়ে থাকে। হয়তো-বা গতর খাঁটিয়ে দু মুঠো অন্ন জোটায়।
দশ বছর পরে দেশে ফিরেছি। বাড়ি পৌঁছবার পূর্বেই রাস্তায় সেই ছোকরা– না, এখন, বুড়োই বলতে হবে, অকালে দেখি উল্টো দিক থেকে আসছে, পরনে মাত্র শতচ্ছিন্ন গামছা। বগলে ঘেঁড়া খবরের কাগজের বোন্দা। ছন্নের মতো চেহারা। আমার কাছ থেকে সিগারেট চাইল। আমি তো হতভম্ব। তার স্ত্রী আমার ছোট-বোনের ক্লাসফ্রেন্ড। আমি তার মুরুব্বি। সিগারেট দিলুম। সেটা ধরিয়ে আমার দেশলাইটা ফেলে দিল নর্দমায়। একগাল হেসে বলল, মাকে নিয়ে আসছি। মনটা বিকল হয়ে গেল। দশ বছর পর আমার শহর এই দিয়ে আমায় ঘরে তুলছে?
বোন বলল, প্রেস যখন রীতিমতো পয়সা কামাতে আরম্ভ করেছে তখন তার পার্টনার তাকে দিল ফাঁকি। একটা আদালত পর্যন্ত লড়েছিল। তার পর পয়সা কোথায়? পাগল হয়ে গেছে।
তবু এখনও তার মাকে শহরে এনে পাকা বাড়িতে তুলছে। মা কবে ভূত হয়ে গিয়েছে। গাঁয়ের আর পাঁচটা বিধবা যে-রকম দুঃখ-দুশ্চিন্তায় মরে।
আর মাধবী? আমার বোন শ্বশুরবাড়ি থেকে এলে সে তাকে দেখতে আসে। আমি তখন মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে বৈঠকখানায় আশ্রয় নিই।
আর যে আত্মহত্যা করল না, পাগলও হল না, তার অবস্থা যে আরও খারাপ।
সরকার আমাকে অনর্থক একটা টেলিফোন দিয়েছিল। তবে সেটা কাজে লাগত তেতলার একটি মেয়ের। আমরা যৌবনে যে সুযোগ পেলুম না তা যদি ওই মেয়েটি পেয়ে থাকে তবে, আহা, ভোগ করুক না সে আনন্দ– তার ইয়ংম্যান প্রায়ই তাকে ফোন করে।
তার পর হঠাৎ মাসাধিক কাল কোনও ফোন নেই। ভাবলুম, আমি যখন আপিসে তখন বোধহয় ফোন করে। তার পর একদিন বাথরুমের দরজায় দমাদ্দম ধাক্কা আর আমার চাকরের ভীত কণ্ঠস্বর। তাড়াতাড়ি খুলে দেখি, তেতলার মেয়েটি মেঝেতে পড়ে ভিরমি গেছে– পাশে টেলিফোনের রিসিভার।
সন্ধ্যাবেলা আমার লোকটা বলল, ভিরমি কাটাতে বেশিক্ষণ লাগেনি, তবে কিছু খেলেই সঙ্গে সঙ্গে বমি হয়ে যাচ্ছে।
আমার ঘরে এসে টেলিফোন করত বলে আমি ইচ্ছে করেই কোনও কৌতূহল দেখাইনি। কিন্তু তৎসত্ত্বেও খবরটা কানে এসে পৌঁছল। এসব ব্যাপার পাড়াতে জানাজানি হয়ে যায়। মেয়েটির পরিবারের ডাক্তারও আমার ভালো করে চেনা। ইংরেজিতে বললেন, He walked out on her to another girl!
কেমন যেন চোখের সামনে দেখতে পেলুম, ওই ভিরমি-যাওয়া মেয়েটার উপর পা দিয়ে যেন সেই ছেলেটা পার হয়ে আরেকটা মেয়ের হাত ধরে চলে গেল। Walk on তো তাই মানে হয় না?
আজ আর মনে নেই- কতদিন ধরে মেয়েটা কিছু খেলেই বমি করত।
দু বছর তাকে দেখিনি। তার পর একদিন সিঁড়িতে দেখা। আগেকার মতোই সেই সাজগোজ করেছে। মনে হল চীনে ফানুস দেখছি, কিন্তু প্রদীপটি নিভে গেছে।
ওই বেদনাই তো সবচেয়ে বড় বেদনা।
মা যখন বাচ্চাকে মারে তখন সে বার বার ওই মায়ের কোলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আশ্রয়ের জন্য যেখান থেকে আঘাত আসছে সেখানেই। আশ্চর্য, কিন্তু আশ্চর্য হবার কীই-বা আছে, কারণ মারুক আর যাই করুক, অজানার মাঝেও অবুঝ জানে সে তার মা-ই। কিন্তু যখন দয়িত walk out on her, তখন বেচারি আশ্রয় খুঁজবে কোথায়? সে দয়িত তো এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন লোক, সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা। এতদিন ধরে তার সামান্যতম বেদনা যখনই কোনও জায়গা থেকে এসেছে–বাপ মা সমাজ যেখান থেকেই হোক– তখনই ছুটে গিয়ে বলেছে তার দয়িতকে। ওই বলা-টুকুতেই পেয়েছে গভীর সান্ত্বনা। আর আজ? আজ তার সেই শেষ নির্ভর গেল। বরঞ্চ পাষাণ-প্রাচীরের উপর বল ছুড়লেও সেটা ফিরে আসে। কথা বললেও প্রতিধ্বনি আসে। কিন্তু এখন শূন্যে, মহাশূন্যে সব বিলীন।… (অবশ্য মডার্নরা বলবেন, ওসব রোমান্টিক প্রেম আজ আর নেই। আজ এক মাস যেতে না যেতেই সবাই অন্য লাভার পেয়ে যায়। তাই হোক, আমি তাই কামনা করি। আমার সর্বান্তঃকরণের আশীর্বাদ তাদের ওপর।)।
