ধর্মের সমুখে উপস্থিত হলুম এই তিনটি মাত্র দৃষ্টান্ত নিয়ে। কেউ বলেন, এসব মায়া। তুমিও নেই, আমিও নেই, এই পৃথিবীও নেই, তথাপি কেন শোকাতুর হও। কেউ বলেন, লীলা। ঈশ্বরে সর্বস্ব সমর্পণ কর। সান্ত্বনা পাবে। কেউ বলেন, মনই সর্ব দুঃখের উৎপত্তিস্থল। সেই চিত্তের বৃত্তি নিরোধ কর। তাতেই শান্তি। আরও অনেক মত আছে।
আমি নতমস্তকে সব কটাই মেনে নিচ্ছি। মা-ঠাকুরমারা এসবে বিশ্বাস করতেন, কিংবা আরও ভালো হয় যদি বলি, ধর্ম তখন সজীব ছিল, সে তখন সে-বিশ্বাস জাগাতে পারত তাই তারা শান্তি পেয়েছেন।
কিন্তু ধর্ম কেন আমার সেই ভাগ্নেকে চিত্তবল দিল না আত্মহত্যা না করার জন্য, প্রেসের পাগলকে রুখল না সেই দারুণ দুর্দৈব থেকে, প্রতিবেশীর মেয়েকে দিল না শক্তি সইবার ফের স্বাভাবিক সুস্থ সবল হওয়ার? শুধু তাদেরই দোষ? ধর্মের আত্মশক্তি কমে যায়নি কি? কিংবা দোষ উভয়ের?
কম্যুনিজম তাই বুঝি। সে বলে রাষ্ট্রই সব। তোমার ব্যক্তিগত শোক কিছুই না। তুমি বেশি গম ফলাও, বেশি কামান বানাও রাষ্ট্ররক্ষার জন্য। সব ভুলে যাবে। কম্যুনিস্টরা এ ধর্মে বিশ্বাস করেন কি না তা জানিনে কিন্তু এ কথা জানি, রাষ্ট্র এ বিশ্বাস তাদের হৃদয়-মনে দৃঢ় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। অন্য ধর্মেরা করে?
***
আমরা কয়েকজন মিলে চা খাচ্ছিলুম। নানারকম দুঃখ-সুখের কথা হচ্ছিল। আমাদের মধ্যে একজন অল্পবয়সী বড়ই স্পর্শকাতর ডাক্তার। হঠাৎ বলল, জানেন, আলী সাহেব, আমাদের হাসপাতালে একটি চার বছরের ছেলে বড় ভুগে খানিকটা সেরে বাড়ি গিয়েছিল, আজ আবার ফিরে এসেছে। ও সারবে না। আমি যখন ইনজেকশন তৈরি করছিলুম তখন আমার গা ঘেঁষে যেন করুণা জাগাবার জন্য বলল, দাত্তার, দিয়ো না, বন্দো লাগে।
হে ধর্মরাজগণ, এ শিশুকে কী দিয়ে কে বোঝাবে?
দুপুররাতে যখন তার ঘুম ভেঙে যায়, ইনজেকশনের ভয়ে শিউরে উঠে চেয়ে দেখে, এই বিশাল পুরীতে কেউ নেই, তার কেউ নেই- তখন?
হয়তো-বা বিজ্ঞান পারবে। বিজ্ঞান একদিন তাকে সারিয়ে দেবে। না পারলেও হয়তো তাকে কোনও প্রদোষ-ন্দ্রিায় (আমি এসব জিনিস জানি না, তবে twilight sleep না কী যেন একটা আছে এবং আশা, সেটা আরও উন্নতি করবে) ঘুম পাড়িয়ে দেবে। হাসপাতালে গিয়ে দেখব, সে ঘুমিয়ে আছে, পুতুলটি বুকে চেপে ঘুমিয়ে আছে, নন্দনকাননের অপ্সরীদের আদর পেয়ে তার মুখে মিঠে হাসি।
জয় বিজ্ঞানের!
কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে তো জীবনের কোনও comprehensive philosophy নেই, যা ভাগ্নেকে রাখবে, প্রতিবেশীর মেয়েকে নর্মাল করে তুলবে।
হে ধর্মরাজগণ, বিজ্ঞানের সঙ্গে একটা ব্যবস্থা করে, তাকে আশীর্বাদ দিয়ে এবং আপন আত্মশক্তি দৃঢ়তর করে আমাদের বাঁচাও।
আমি জানি, আমার জীবনে সে দিন আমি দেখে যেতে পারব না।
এই নির্জন প্রান্তরে এ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থেকে থেকে নিশির ডাকের মতো শুনতে পাব, দাত্তার, দিয়ো না, বন্দো লাগে, দেখতে পাব সেই প্রদীপহীন চীনা ফানুস ॥
———–
১. ইদানীং রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ নিয়ে তুলনাত্মক আলোচনা হচ্ছে। অন্য কেউ দেখিয়ে না দিয়ে থাকলে আমি একটি মিল দেখাই। দুজনেই প্রথমেই আমেরিকা গিয়েছিলেন ভারত-সেবার জন্য অর্থ আনতে। দুজনাই নিরাশ হয়েছিলেন।
তলস্তয়
কবিগুরু, তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই। রবীন্দ্রজীবনের সপ্ততি বছর পূর্ণ হলে শরৎচন্দ্র এ কথাটি বলেছিলেন। সমস্ত বাঙলা দেশ তখন জয়ধ্বনি করে এই বিস্ময়ে আপন বিস্ময় প্রকাশ করেছিল।
কবিগুরু তলস্তয়ের(১) মৃত্যু-সংবাদ যখন রুশ সাহিত্যের তখনকার দিনের শরৎচন্দ্র গর্কির কাছে পৌঁছল, তখন তিনি তাঁর শোকলিপি শেষ করার সময় লিখেছিলেন, তার দিকে তাকিয়ে যে আমি ঈশ্বর বিশ্বাস করিনে– মনে মনে বলেছিলুম, এই লোকটি ঈশ্বরের মতো (গড লাইক)।
প্রতি ধর্মেই একটি প্রশ্ন বার বার উঠেছে। ভগবান যখন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনা করতে চান, তখন তা করেন কোন পদ্ধতিতে? ভারতীয় আর্যরা উত্তরে বলেছেন, স্বয়ং ভগবান তখন মানুষের মূর্তি ধরে অবতাররূপে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। বুদ্ধ এবং মহাবীর হয়তো নিজেরা এই মতবাদকে স্বীকৃতি দিতেন না, কিন্তু বহু বৌদ্ধ এবং জৈন ওঁদের পূজা করেন অবতাররূপে এবং হিন্দুরাও বুদ্ধকে অবতারের আসনে বসাতে কুণ্ঠিত হননি।
সেমিতি জগতে বিশ্বাস, ভগবান তখন মানুষের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়ে তাঁকে তাঁর প্রফেট, পয়গম্বর, রসুল, প্রেরিত পুরুষ নাম দিয়ে নবধর্ম প্রচার করতে আদেশ দেন। ইহুদি এবং মুসলমানদের বিশ্বাস, এঁরা কখনও কখনও অলৌকিক দৈবশক্তির আধার হন, কখনও হন না।
খ্রিস্টের আসন মাঝখানে। তিনি কখনও-বা ঈশ্বরের পুত্ররূপে, কখনও ঈশ্বররূপে, কখনও-বা সুদ্ধমাত্র প্রেরিত পুরুষ রূপে অর্ঘ্য পেয়ে থাকেন। ইসলাম তাকে অলৌকিক শক্তিধারী (মুআজিজা বা মিরাকল করার অধিকারী) পয়গম্বররূপে স্বীকার করে। খ্রিস্ট যে অবতাররূপে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তার পিছনে হয়তো প্রাচীন ভারতীয় আর্যধর্মের প্রভাব আছে।
এ তথ্য প্রমাণ করা সহজ নয়, কিন্তু হিটাইটদের আমল থেকেই পূর্ব ভূমধ্যসাগর তটাঞ্চলে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত ছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
