আমার লজ্জাটুকু পর্যন্ত পুলিশ-কর্তা রাখলেন না। আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলুম তিনি যেন প্রকাশ না করেন যে, আমার কাছ থেকে সবকিছু জানতে পেরে তিনি তার সন্ধান পেয়েছেন। আমি যে খানসামার ভাই সেই খানসামার ভাই-ই থেকে যাই। কিন্তু টুনি মেমের নীরবতার পাঁচিলে মাথা ঠুকে ঠুকে পুলিশ-কর্তা ঘায়েল হয়ে গিয়ে সে কথাটাও প্রকাশ করে দিলেন। এমনকি তিনি আমাকে ভিতরে ডেকে পাঠালেন। যেতে হল– বস যে।
টুনি একবার আমার দিকে এক লহমার তরে তাকিয়েছিল।
কী বলব, মিতুয়া, সে দৃষ্টিতে ঘৃণা তাচ্ছিল্য কী ছিল, কিছুই বলতে পারব না। শুধু মনে হয়েছিল রহস্যময় সে দৃষ্টি।
খান বলল, তার পরদিন প্রসবের সময় টুনি মেম এই দুঃখের সংসার ত্যাগ করল।
এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। আমি অবাক হয়ে বললুম, সে কী!
হুঁ।
আমি শুধালুম, তা হলে ওই যে লোকটা খুন হয়েছিল তার কোনও হিল্যে হল না?
খান অনেকক্ষণ কোনও উত্তরই দিল না। শেষটায় বলল, সে যাক গে। এর পরও আমি বহু রহস্যের সমাধান করতে পারিনি– সে নিয়ে আমার শোক নেই। আমি শুধু এখনও টুনি মেমের শেষ চাউনির কথা ভাবি। সে চাউনিতে কী ছিল?
দুর্দশার চরমে বাচ্চাদুটো যখন ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে তখন আমি এসে তাদের চোখের জল মুছে দিলুম, টুনি তখন নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তাকে তার সর্ব দেহমন নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছিল– তিনি যে তার ডুবুডুবু ভাঙা নৌকোখানিকে পাড়ে এনে ভিড়ালেন। আমাকে সে দেখেছিল তারই দূতরূপে, তাঁরই ফিরিশতারূপে। তার পর হঠাৎ দেখে, আমি দেবদূত নই, আমি শয়তান। তার দুর্দিনে যেসব চাকর-বাকর তাকে লাঞ্ছিত-অপমানিত করেছিল আমি তাদের চেয়েও অধম। আমার মতলব ছিল তার বাচ্চাদুটোকে খাইয়ে-দাইয়ে তাকে খুশি করে, তার জীবনের চরমধন তার স্বামীকে ঝোলাবার জন্য প্রমাণ সংগ্রহ করা।
.
এর পর আর কোনও কথা হয়নি। গাড়ি বোলপুরে এসে থামল।
চেল্লাচেল্লিতে ম্যানেজার গোসাঁই স্বয়ং এসে খানকে ডবল খানা দিল। গাড়ি যখন চলতে আরম্ভ করেছে তখন আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল টুনি মেমের বাচ্চাদুটোর কথা। চেঁচিয়ে খানকে শুধালুম, ওদের কী হল? খান শুনতে পেল না। হাসিমুখে শুধু হাত নাড়ল।
ঢেউ ওঠে পড়ে কাঁদার সম্মুখে ঘন আঁধার
খাচ্ছে, দাচ্ছে, বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে, কখনও হতাশ হয়, কখনও-বা খুশি, বউ বাপের বাড়ি গেল তো মুখে ব্যাজার ভাব, এমন সময়ে চ্যারিটি ম্যাচের একখানা টিকিট ফোকটে পাওয়াতে সে বেদনা না-পাত্তা ঘুচে গেল– এই নিয়ে আমরা পাঁচজন আছি। সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এই আমরাই পৃথিবীতে ম্যাজরিটি। আমাদের বেদনা সামান্য, সেটা ঘুচতেও বেশিক্ষণ লাগে না।
অথচ মুনিঋষি পীর-প্যাকম্বর বলেন, তোমরা অমৃতের সন্তান, অমৃতের সন্ধান কর। একফোঁটা একটি মেয়েও নাকি বিস্তর ধনদৌলত পাবার পর বলেছিল, যা দিয়ে আমি অমৃত হব না, তাতে আমার কী প্রয়োজন!
চাকরি বজায় রাখার জন্য আমাকে সমস্ত জীবন ধরে দুনিয়ার তাবৎ ধর্মের, (বেশি না, আল্লার দয়ায় মাত্র সাতটি) বিস্তর বই পড়তে হয়েছে। কিন্তু আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি, এই আমরা সাধারণ পাঁচজন তো অমৃত না পেয়েও দিব্যি বেঁচে আছি, ওর পিছনে ছুটোছুটি করার আমাদের কী প্রয়োজন। আর বাঙলা কথা বলতে কি, আমার নিতান্ত ব্যক্তিগত মত, তখন ওই অমৃতটা আমাদের ঘাড়ে চাপানোই অন্যায়। অন্তত একটি মহাপুরুষ– আমাদের মতে– এ খাতায় একটি মুক্তো জমা রেখে গেছেন; তিনি বলেছেন, শুয়োরের সামনে মুক্তো ছড়িয়ো না। তাই সই। গালাগালটা বরদাস্ত করে নিলুম। আর, মহাপুরুষ একথাটা বলার সময় ক্ষণেকের তরে আমার দিকে একবার তাকিয়ে ছিলেন তো? তাতেই হয়ে যাবে। মোক্ষ নামক অমৃত বলে কোনও পদার্থ যদি থাকে তবে ওই একটি চাউনিতেই সকলং হস্ততলং। অবশ্য সে অমৃতের জন্য কোনও অসম্ভব ভবিষ্যতে যদি আমার প্রাণ আদৌ কাঁদে!
রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ এরা দেখতে মানুষের মতো বটে, কিন্তু আসলে এঁরা মানুষ নন। নইলে বলুন দেখি, তুমি কবি, দু পয়সা তোমার আছে, পদ্মায় বোটে ভাসতে তুমি ভালোবাসো, কী দরকার তোমার স্কুল করার আর তার খাই মেটাবার জন্যে বৃদ্ধ বয়সে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দিল্লি, বোম্বাই চষার? কিংবা বিবেকানন্দ। অসাধারণ জিনিয়াস। পঁচিশ হতে না হতেই প্রাচীন অর্বাচীন দিশি-বিদেশি সর্বশাস্ত্র নখদর্পণে! কী দরকার ছিল সেই সুদূর আমেরিকায় গিয়ে শেকস্পিয়ারের ভাষায়– টু টেক্ আর্মস্ এগেন্স এ সি অব ট্রাবলস?(১) কী দরকার ছিল অরবিন্দের নির্জনে ধ্যানে ধ্যানান্তরে উধ্ব হতে ঊর্ধ্বতর লোকে ব্রহ্মের কাছ থেকে অমৃতবারি আহরণ করে নিম্নে, তারও নিম্নে এসে এই ভস্মীভূত ভারতসন্তানকে পুনর্জীবিত করার?
এঁদের কথা বাদ দিলুম। এরা আমাদের মতন নন।
কিন্তু– এখানেই একটা বিরাট কিন্তু।
এই যে আমরা রামাশ্যামা, আমাদের ভিতর বিবেক-রবি নেই, কিন্তু তাই বলে আমাদের সক্কলেরই কি ওঁদের চেয়ে স্পর্শকাতরতা কম? ওঁদের মতো কীর্তি আমরা রেখে যাই না, তাই বলে বেদনাবোধ কি আমাদের সক্কলেরই ওঁদের চেয়ে কম? বরঞ্চ বলব, বিধি-প্রসাদাৎ, কিংবা আপন সাধনবলে তারা চিত্তজয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে বেদনাবোধ তাদের ভেঙে ফেলতে পারেনি। কিন্তু আমাদের কেউ কেউ যে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। যেন জীবন্ত অবস্থায়ই হঠাৎ তাদের জীবন-প্রদীপ নিভে যায় আর চোখের সামনে সে যেন শূন্যে বিলীন হয়ে যায়। যেন বিরাট নবাববাড়ি আধঘণ্টার ভিতর চোখের সামনে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে গেল। আমরা যে কটি অকর্মণ্য গাছ তার চতুর্দিকে ছিলুম– যাবার সময় আমাদের ঝলসে দিয়ে গেল।
