খান অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, তিনবারের বারও ঘোড়া জল খেল না। কারণ আমি তখন থাকতে না পেরে টুনিকে শুধালুম, তার স্বামী সম্বন্ধে যখন কোনও খবর নেই তখন তাদের বিয়ে হত কী করে? অবশ্য আমি ভাবখানা করেছিলুম যেন ওটা অমনি একটা কথার কথা, যেন নিছক একাডেমিক প্রশ্ন। আজও বুঝতে পারিনি টুনি মেম আমাকে সন্দেহ করেছিল কি না। টুনি শুধু বলল, সায়েব নাকি তাকে বলেছিল, সে কলকাতার উকিলদের কাছ থেকে তাদের সম্মতি আনিয়েছে, তবে সেটা নাকি খুব পরিষ্কার নয়। চুলোয় যাক গে সে-সব কথা, আমার ইচ্ছে শুধু জানবার তার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া সম্বন্ধে সে কী জানে কিন্তু সেই যে ও’হারার বদমেজাজির কথা বলার সময় সে তার স্বামীর কথার আভাস দিয়েছিল, এবারে সেটুকুও না।
আমি বললুম, ওই কথাটুকু আমিও তো জানতে চাই।
খান বলল, টুনি জল খেয়ে নিয়ে খেই তুলে বলল, সায়েবকে ক্লাববাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। সেদিন বাড়ি ফিরে সায়েব আমাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখেছিল– সে তো বলেছি তার পর মোকদ্দমায় বেরুল সায়েব পঞ্চাশ-ষাট মাইল দূরের একটা ছোট্ট পোস্টআপিসে গিয়ে যে ছ জন সায়েব তার গায়ে হাত তুলেছিল তাদের নামে ছ প্যাকেট বিষ-মাখানো চকলেট বিজ্ঞাপন হিসেবে পাঠায়। আচ্ছা, বল তো ভাইয়া, আমি যে বলেছিলুম সায়েবের মাথায় ছিট ছিল সেটা কি ভুল বলেছি? এটা কি ধরা পড়ত না? পাঁচটি পরিবারের লোক যদি একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ে আর সায়েবলোগের ব্যাপার সঙ্গে সঙ্গে সিভিল সার্জনকে ডাকা হয় তবে কি তার মূল ধরা পড়বে না? পার্সেলের উপর যে পোস্টআপিস থেকে সেগুলো এসেছিল তার খেই ধরে পুলিশ দু দিনের ভিতর ধরে ফেলল যে সে-ই পার্সেলগুলো পাঠিয়েছিল। পোস্টমাস্টার আদালতে তাকে শনাক্ত করল।
খান মন্তব্য করে বলল, টুনি মেমের নরম আর শক্ত দুটো দিকই দেখতে পেলুম তার পরের কথাতে। বলল, মানুষ মারা পাপ, আর ভাবো দিকিনি ওইসব পরিবারের ছোট্ট ছোট্ট কাচ্চাবাচ্চাগুলো। আবার পাঠিয়েছিল একটি ছোট ডাকঘর থেকে। ধরা পড়তে কতক্ষণ। কিন্তু একথাও তোমাকে বলছি, ভাইয়া, আমি ঘুণাক্ষরেও সায়েবের এই দুর্বুদ্ধির কথা অনুমান করতে পারলে তার সামনে গলায় দড়ি দিতুম।
আদালতে সায়েব একটি কথাও বলেনি।
শুধু শহরময় ছড়িয়ে পড়ল, সায়েব নাকি হাজতে যাবার সময় তার উকিলকে বলেছিল, সে তার স্ত্রীর ন্যায্য সম্মান রাখবার চেষ্টা করেছে মাত্র। একথা শুনে শহরের লোক কী বলেছিল জানিনে, কিন্তু ওই আমি আমার শেষ সম্মান পেলুম।
সেই সম্মানের উঁচু আসন থেকে আরম্ভ হল আমার পতন।
আমি তখন যাই কোথায়? দেশের-দশের চোখে আমি সায়েবের রক্ষিতা। রক্ষিতাকে রক্ষা করনেওলা যখন আর কেউ নেই তখন সে যাবে কোথায়? যাবার জায়গা নয়, মরার জায়গা একটা আছে। বেশ্যাপাড়া। কিংবা মরতে পারি ফাঁস দিয়ে। কিন্তু
টুনি মেম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কিন্তু তখন সায়েবের বাচ্চা আমার পেটে। তার প্রাণ নিই কী করে?
খান বলল, এর পর টুনি মেম কী করে ধাপের পর ধাপ নামতে নামতে সেই জাহান্নামের রদ্দি কুঁড়েঘরে এসে পৌঁছল তার বর্ণনা দেয়নি। তুই সেটা যে রকম খুশি কল্পনা করে নিতে পারিস।
আমি বললুম, আমি স্যাডিস্ট নই। আমি বীভৎস রসে আনন্দ পাইনে। তার পর কী হল তুই বলে যা।
খান বলল, টুনি সে রাত্রে আর কিছু বলেনি। তার ক্লান্তি দেখে আমিও আর খোঁচাখুঁচি করিনি।
ওদিকে আমার বসের সঙ্গে কথা ছিল, টুনিকে আবিষ্কার করতে পারলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেলিগ্রাম করে জানাই। অতি অনিচ্ছায় পরের দিন তাঁকে কোড টেলিগ্রাম করে জানালুম। গেলুম স্টেশনে তাকে রিসিভ করতে।
সন্ধ্যাবেলা তিনি নামলেন পুলিশের ইউনিফর্ম পরে। আমি অবাক হয়ে বললুম, স্যার, করেছেন কী? টুনি বড় শক্ত মেয়ে। পুলিশকে সে একটি কথাও বলবে না। এমনকি আপনি চাকর-নফরের বেশ পরলেও ধরে ফেলতে পারে।
খেলুম উৎকট ধমক। বললেন, রেখে দাও ওসব জ্যাঠামো। এই ঘোষাল-বান্দা ঘড়েল ঘড়েল খুনিদের পেটের নাড়ির কিমি বের করেছে একশো সাতান্ন বার, আর আজ তুমি এলে শোনাতে, কী করে একফোঁটা ঘুড়ির ঠোঁটের কথা বের করতে হয়। চল, তোমাকে হাতেকলমে দেখিয়ে দিচ্ছি। আমি তাকে বহুৎ বোঝাবার চেষ্টা করলুম। খেলুম গণ্ডা তিনেক ধাতানি। কীই-বা করি আমি? তিনি উঁদে অফিসার। পাঠান আসামিকে তিনি খুন কবুল করাতে পেরেছেন বলে তার খুশ-নাম ছিল– পাঠানকে বেঈমান বলে অপমান করলে রেগেমেগে সব-কিছু ফাঁস করে দেয়, এই অজানিত প্যাঁচটি জানতেন বলে। আমি চুপ করে গেলুম।
গট গট করে মিলিটারি বুটে পাড়া সচকিত করে তিনি ঢুকলেন টুনি মেমের কুঁড়েঘরে। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তার পর, মশাই, আরম্ভ হল পুঁদে পুলিশের যত রকম কায়দা-কেতা ফন্দি-ফিকির সন্ধি-সুড়ুক তার নির্মম প্রয়োগ। দুনিয়ার ভয়-প্রলোভন, মৃদু ইঙ্গিত, কটু সম্ভাষণ সব-কুচ চালালেন ঘড়েল পুলিশ-কর্তা।
কিন্তু সেই যে পুলিশ দেখে টুনি মেম মুখ বন্ধ করেছিল, সে মুখ আর সে খুলল না। ঝাড়া ছ-টি ঘণ্টা পুলিশ সাহেব তার শেষ চেষ্টা দিয়ে ঘেমে নেয়ে বেরুলেন সেই কুঁড়েঘর থেকে ভোরের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে। টুনি মেম একটা হা-না পর্যন্ত বলেনি।
