খান দম নিয়ে বলল, দেখ মিতু, এর পর বহুকাল চা অঞ্চলে কাজ করার ফলে বিস্তর সায়েবকে প্রচুর কালো মেয়ে নিতে দেখেছি এবং ছেড়ে যেতেও দেখেছি, কাচ্চা-বাচ্চা থাকলে তাদের মিশনারির কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা আমাকেও মাঝে মাঝে করতে হয়েছে এসব ওদের ডালভাত। কিন্তু টুনি মেম স্বতন্ত্র।
আমি বললুম, সে আর তোকে বলতে হবে না। তার পর কী হল, তাই বল। বোলপুর আর বেশি দূর নয়।
খান বলল, টুনির কাহিনীও শেষ হতে চলল। শোন্। টুনি বলল, আমার দ্বিতীয় দুঃখ ছিল, সায়েবের অসম্ভব রাগ। ওই মদেরই মতো। বেশ দিন কাটছে, হাসিখুশির মানুষ সায়েব। হঠাৎ কোনও আরদালি বা বেয়ারা একটা কিছু বলল, আর সায়েব রেগে পাগলের মতো তাকে বন্দুক হাতে নিয়ে করল তাড়া। আমি কতবার যে ছুটে গিয়ে তার পায়ে জড়িয়ে ধরে তাকে ঠেকিয়েছি তার হিসাব নেই। তবু বুঝতুম, যদি মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় এ-রকম ধারা করত। তা নয়। সম্পূর্ণ সুস্থাবস্থায়। আমার নিজের কোনও ভয় ছিল না, কারণ আমার ওপর সে একবার মাত্র রেগে গিয়ে পরে এমনই লজ্জা পেয়েছিল যে, আমার মনে আর কোনও সন্দেহ ছিল না যে সে আর আমার ওপর রাগবে না। কিন্তু চাকরবাকরকে নিয়ে হত মুশকিল। আমার স্বামীকে
খান থামল। আমি তেড়ে বললুম, ওই রাগের মাথায় খুন করেছিল না কি?
খান বলল, ভাই এবারেও আমাকে প্রলোভন সংবরণ করতে হল। ঠিক যখন আমার মনে হল, এবারে টুনি আসল কথায় আসবে ঠিক তখন সে আবার তার কথার মোড় ঘোরালো। আমি নাচার। আবার মনকে সান্ত্বনা দিলুম, এই নিয়ে দু-বার হল; তিনবারের বার নিশ্চয়ই বলবে। কিন্তু টুনি পাড়ল অন্য কথা। বলল, ওই রাগই আমার সর্বনাশ করল। তার পর আমাকে শুধাল আমি এদেশে অনেক দিন ধরে আছি কি না? আমি বললুম, না, ভাইয়ের সন্ধানে হালে এসেছি। তখন টুনি বলল, তা হলে জানতে, যা সবাই জানে। ওই নিয়ে মোকদ্দমা হয়েছিল।
সায়েব ক্লাবে বড় একটা যেত না। একদিন ফিরে এল চিৎকার করতে করতে বদ্ধ মাতালের মতো, অথচ মদ খায়নি। পাগলের মতো শুধু চেঁচাচ্ছে, আমাকে অপমান, এত বড় সাহস! আমাকে অপমান, এত বড় সাহস। আমি দেখাচ্ছি, আমি কী করতে পারি? আমি কাউকে ছাড়ব না। আমি দেখাচ্ছি, আমি কী করতে পারি। আমি চেষ্টা করেছিলুম সায়েবকে ঠাণ্ডা করতে কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারলুম না। টাকা নিয়ে মোটরে করে ফের বেরিয়ে গেল।
ত্রিসংসারে আমার কেউ নেই। তাই নিয়ে আমি কখনও দুঃখ করিনি। আমার সায়েবকে পেয়েই আমি খুশি ছিলুম, আমি সুখী ছিলুম, কিন্তু রাত যখন ঘনিয়ে এল আর সায়েব ফিরল না তখন যে আমি কী করি, কার কাছে গিয়ে সাহায্য চাই, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলুম না। এর পূর্বে সায়েব আমাকে কখনও একা ফেলে যায়নি। একা থাকতে আমার ভয় করে না। কিন্তু সে রাত্রে কেমন যেন এক অজানা ভয় এসে আমাকে অসাড় করে দিল। সে রাত্রিটা আমার কী করে কেটেছিল আজ আর বলতে পারব না।
পর দিন সায়েব সন্ধের দিকে ফিরে এল। আমি তাকে হাতে ধরে নিয়ে যেতে চাইলুম বাথরুমের দিকে। সে কিন্তু আমাকে দু হাতে শূন্যে তুলে নিয়ে বসাল উঁচু একটা চেয়ারের উপর। নিচে আমার পায়ের কাছে ছোট্ট একটি মোড়ার উপর বসে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে আমার দিকে। সায়েব এভাবে প্রায়ই আমাকে বসাত, আর একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আমার বড় লজ্জা করত। আমি কে, আমি কী?
ভাই সায়েব, তুমি কিছু মনে কর না, আমাকে সব কথা বলতে দাও।
ঠিক তার চারদিন পর পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল।
কুকুর-বেড়ালকেও মানুষ এরকম লাথি মেরে বাড়ি থেকে খেদায় না। আমি সায়েবের রক্ষিতা, আমার তো কোনও হক্ক নেই। পুলিশ বাড়ি তালাবন্ধ করে সিলমোহর মেরে চলে গেল। আমি একবস্ত্রে বাঙলোর বারান্দা থেকে বাগানের বকুলতলায় এসে বসে রইলুম। সেখানে সায়েব আমার জন্য একটা সিমেন্টের বেদি বানিয়েছিল।
যে চাকর-নফর সেদিন সকালবেলা পর্যন্ত আমার পা চেটেছে, তারাই এখন আমাকে লাথিঝাটা মারল। চাকরি গেছে যাক কিন্তু ওই কুলি মেমটাকে যতখানি পারি অত্যাচার-অপমান করে তার দাদ তুলে নিয়ে যাই।
আমি একটি কথাও বলিনি।
মোকদ্দমাতে সব কথা বেরুল। সবাই জানে। সেই যেদিন সায়েব ক্লাবে গিয়েছিল সেদিন ক্লাবের কয়েকজন মুরুব্বি তাকে নাকি আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে, অনেক চা-বাগিচার ইংরেজ ছোকরা দিশি মেয়ে রাখে কিন্তু আমার সায়েব আমাকে নিয়ে খোলাখুলি যে মাতামাতি করছে সেটা ইংরেজসমাজের পক্ষে বড়ই কেলেঙ্কারির ব্যাপার।
আমি জানতুম, আমার সায়েব এ-সব চা-বাগিচার সায়েবদের ঘেন্না করত। কতবার তাকে বলতে শুনেছি, যেসব নেটিভদের উপর সায়েবরা ডাণ্ডা মেরে বেড়ায়, তারা শিক্ষাদীক্ষার কোনও সুযোগই পায়নি, তাই তারা আজ মজুর, আর ওই সায়েবরা আপন দেশে সব সুযোগ পেয়েও নিতান্ত অপদার্থ হতভাগা বলে কিছুই করে উঠতে পারেনি। আপন দেশে মজুরের কাজ করতে হলে যেটুকু ধাতুর প্রয়োজন সেটুকুও এসব লক্ষ্মীছাড়াদের নেই বলে তারা এদেশে এসে নেটিভদের উপর দাবড়ে বেড়ায়।
তোমাকে বলেছি, ভাইয়া, আমার সায়েব অপমানিত বোধ করলে রেগে একেবারে পাগলের মতো হয়ে যেত। সে নাকি তখন যে কটা সায়েবকে হাতের কাছে পেয়েছে তাদের গালে ঠাস ঠাস করে চড় কষিয়েছে আর চিৎকার করে একই কথা বার বার বলেছে, আমি তোমাদের মতো ভণ্ড ছোটলোক নই। আমি যাকে নিয়েছি তাকে আমি আমার স্ত্রীর সম্মান দিয়েই রেখেছি। এখানে বলে রাখি, ভাই সায়েব, এরা সবাই জানত কথাটা সত্যি। আব্রুগড়ের পাদ্রি সায়েব আমাদের বিয়ের মন্ত্র পড়তে নারাজ জেনে সায়েব ঠিক করেছিল, কলকাতায় আমাদের বিয়ে হবে।
