আমাদের প্রণয় হয়েছিল। আমি স্বীকার করছি, স্বামী বর্তমান থাকতে পরপুরুষের দিকে তাকানোই পাপ, প্রণয় সে তো মহাপাপ। তার জন্য যে সাজা পরমাত্মা আমায় দেবেন তার জন্য আমি তৈরি।
কিন্তু ভাবো দিকিনি ভাই সায়েব, আমি কুলি-কামিন। আমি কালো, কিন্তু প্রতিবেশিনীরা বলত, আমার সর্বাঙ্গ নাকি চুম্বক, পুরুষকে টানে। টানত নিশ্চয়ই বিশেষ করে ছোঁড়ারা যখন হ্যাংলার মতো আমার দিকে তাকাত তখনই সেটা বুঝতে পারতুম। কিন্তু ওরা কী চায়, সেটা আমি আরও ভালো করেই বুঝতে পারতুম। আমাকে রক্ষিতা করে রাখবার সাহসও এদের ছিল না। যাক, এসব কথা আর খুলে বলার প্রয়োজন নেই।
তখন যদি কেউ আমাকে রানির সম্মান দেয় তখন সে প্রলোভন জয় করা কি সহজ পরীক্ষা? সায়েব আমাকে প্রথম দিন থেকেই ইংরেজি পড়াতে শুরু করল, বলল, তোমাকে আমি আমার মনের মতো করে গড়ে তুলব। ভালোবাসলে মানুষ কী না করতে পারে। কিংবা হয়তো পূর্বজন্মে আমি কোনও পাঠশালা-মক্তবের আঙ্গিনা ঝাঁট দিয়ে সেবা করেছিলাম বলে এ জন্মে তারই পুণ্যের ফলে আমার লেখা-পড়া যে গতিতে এগিয়ে চলল সেটা দেখে স্বয়ং সায়েবই অবাক।
এতক্ষণ পরে টুনি মেম আমার চোখের দিকে তাকাল। বোধহয় দেখে নিল এসব সূক্ষ্ম জিনিস বোঝবার স্পর্শকাতরতা আমার কতখানি আছে। আফটার অল, সে তো আমাকে জানে খানসামার ভাই খানসামা হিসেবে!
আমার চোখে কী দেখল কে জানে। আজও আমার কাছে রহস্য। কিন্তু বলে যেতে লাগল ঠিক সেইভাবেই।
বলল, বিদ্যাবুদ্ধি কতখানি হয়েছিল বলতে পারিনে, কিন্তু একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমরা কুলি-মজুররা যে ভালোবাসি, একে অন্যের প্রতি আমাদের যে টান হয়, সেটাকে আমি নিন্দা করছিনে, কিন্তু সায়েবের পাশে বসে প্রেমের ভালো ভালো গান আর কবিতা পড়ে পড়ে আমি এক নতুনভাবে তাকে ভালোবাসতে লাগলুম, আর সে যে আমাকে কত দিক দিয়ে কতখানি ভালোবাসে সেটাও দিনের পর দিন আমার কাছে পরিষ্কার হতে লাগল।
টুনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে থামাই। কিন্তু সে তখন আপন মনে যেন কথা বলছে। আবার কখনও-বা সংবিতে ফিরে চোখ-দুটি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে আপন কথা বলে যায়।
সায়েবের মতো এ রকম মানুষ আমি আর দেখিনি। সামান্য কয়েক ঘণ্টা দিনে কাজ করত চা-গাছের সার নিয়ে, আর তার জন্য পেত কাড়ি কাড়ি টাকা। আর খরচ করত বেহুশের মতো। আমি কিছু বললে হেসে উত্তর দিত, যত খুশি যে যখন কামাতে পারে তখন যত খুশি খরচ করবে না কেন?
এই তো আমার স্বামীকে দশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল
খান বলল, আমি তখন উত্তেজনার চরমে। এইবারে জানতে পারব, সেই টাকা নিয়ে টুনি মেমের স্বামী দেশে ফিরে গিয়ে খেতখামারের প্ল্যান করছিল কি না? সে টাকা পেয়েছিল কি? না ও’হারা ডবল ক্রসিং করেছিল! রামভজন গুলি খেল কী করে, কেন, কার হাতে? কিন্তু হঠাৎ কেন জানি নে, টুনি মেম কথার মোড় ফিরিয়ে নিল। আমি শুধু লক্ষ করলুম, টুনির মুখ কেমন যেন ঈষৎ বিকৃত হয়ে গেল। পাছে সে সন্দেহ করে বসে, আমি কী মতলব নিয়ে এসেছি, তাই আমিও এই ব্যাপারটার ওপর চাপ দিলুম না। মনকে সান্তনা দিলুম, এতখানি যখন বলেছে, পরে মোকা পেলে বাকিটুকু পাম্প করে নেব।
কারণ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি, টুনি মেম তো সাধারণ কুলি-কামিন নয়ই, সে অসাধারণ বুদ্ধিমতী মেয়ে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সে ভীষণ শক্ত মেয়ে। খুদাদা (বিধিদত্ত) চরিত্রবল তার নিশ্চয়ই ছিল, তার ওপর এত বেশি তুফান-ঝড়, এত বেশি বিচিত্র ভাগ্যবিপর্যয়ের ভিতর দিয়ে মার খেয়ে খেয়ে আজ এই স্যাঁতসেঁতে কুঁড়েঘরে এসে পৌঁছেছে যে, এখন সে নির্ভয়– তার আর যাবে কী, তার আর হারাবার মতো কী আছে যে সে তারই ভয়ে আপন গোপন কথা ফাঁস করবে? সে যদি নিজের থেকে কিছু না বলে তবে আমার চতুর্দশ পুরুষের সাধ্য নেই যে, আঁকশি দিয়ে তার পেটের কথা বার করি। এই একফোঁটা দুবলাপাতলা মেয়ে, পুলিশের এক ফুয়ে সে কঁহা কঁহা মুলুকে উড়ে যাবে, কিন্তু আমি এ তত্ত্বটাও জানি যে সে ভাঙবে না, তার দার্চ অবিশ্বাস্য।
টুনি মেম বলল, কিন্তু সায়েব ছিল পাগল। আমি ভেবে-চিন্তেই বলছি, সায়েব ছিল পাগল। দুটো জিনিসে যে তার পাগলামি কত বিকট রূপ ধারণ করতে পারত সে যারা দেখেছে তারাই বলতে পারবে।
তারই স্মরণে টুনি মেম যেন আঁতকে উঠল। বলল, বেশ ভালোমানুষের মতো দিব্যি দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে, আমাকে আদর-সোহাগ করার অন্ত নেই, সারা সকালটা হয়তো কাটাল ক্যাটালগ দেখে দেখে বিলেত থেকে আমার জন্য কী সব আনাবে বলে, তার পর হঠাৎ আরম্ভ হয়ে গেল একটানা মদ খাওয়া। চলল দিনের পর দিন। কাজকর্ম তো বন্ধ বটেই, নাওয়া-খাওয়ারও খোঁজ নেই। একটুখানি সুস্থাবস্থায় পেয়ে যদি বললুম, দুটি মুখে দাও, তবে সে কাতর স্বরে হয় বলত, নেশা কেটে যাবে, নয় বলত, মুখ দিয়ে কিছুই নামবে না! ঘুম আর মদ, মদ আর ঘুম। আমার জাতভাইরা এদেশে এসে মদ খেতে শেখে। তাদের কেউ কেউ খায়ও প্রচুর। ও জিনিস আমার সম্পূর্ণ অজানা নয়, কিন্তু ওরকম বেহদ মদ কাউকে আমি খেতে দেখিনি, শুনিনি। সে তখন মানুষ নয়, পশুও নয়, যেন কিছুই নয়।
আমি তার পা জড়িয়ে ধরে বলেছি কতবার তুমি যদি ওই মদটা না খেতে তবে আমি নির্ভয়ে বলতে পারতুম, আমার মতো সুখী পৃথিবীতে কেউ নেই। সুস্থ অবস্থায় থাকলে সে-ও আমার পা জড়িয়ে ধরে প্রতিজ্ঞা করত, আর কখনও খাবে না। কী লজ্জা! যাকে আমি মাথার মণি করে রেখেছি সে দেবে হাত আমার পায়ে! অবশ্য এ কথাও ঠিক, আস্তে আস্তে তার এই মদের বান কমতির দিকে চলল। আমার আনন্দের সীমা নেই। কিন্তু আমার কপালে এত সুখ সইবে কেন?
