এর পরও যে খুদাতালায় বিশ্বাস করে না তাকে চড় মারতে ইচ্ছে করে।
মুন্নিকে বললুম, এই নাও আট আনা। তাড়াতাড়ি গিয়ে মুড়ি-মুড়কি যা পাও নিয়ে এসো।
চায়ের কথা বললুম না। ওই একটিমাত্র জিনিস চা-বাগানে ফ্রি। বিস্তর কুলি বিন দুধ-চিনি সুদ্ধমাত্র চায়ের লিকার খেয়ে খিদে মারে।
পাঁচজন সাধারণ মানুষের স্বভাব, কেউ বিপদে পড়লে এগিয়ে এসে সাহায্য না করার, কিন্তু তখন যদি এরই একজন বুকে হিম্মত বেঁধে সাহায্য করতে আরম্ভ করে তখন অনেকেই তার পিছনে এসে দাঁড়ায়।
একজন ইতিমধ্যে বসবার জন্য আমাকে একটা মোড়া এনে দিয়েছে। আমি বললুম, আমি একটা চারপাই কিনতে চাই। বেচবে?
চারপাই বলতে-না-বলতে এসে গেল। ভিজে ভিত থেকে উদ্ধার পেয়েও কিন্তু টনি মেমের মুখের ভাব বদলাল না।
তোকে বলেছি– হার্ড-বয়েল্ড পুলিশম্যান আমি তখনও হইনি, এমনকি অতিশয় সফ্ট-বয়েল্ডও না, তাই এই পুলিশের ভণ্ডামি করতে আমার বাধো বাধো।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, এইবারে তুই আরম্ভ করলি সত্যি সত্যি মিথ্যে ভণ্ডামি। ভুলে গেছিস নাকি, স্কুলে আসবার সময় কাঁধে করে মা-হারা একটা কাঠবেড়ালিকে সঙ্গে নিয়ে আসতিস? মাস্টারমশাই সেটার জন্য চোটপাট করাতে গ স্কুল ছেড়ে নবাবি তালবের উপরে রাজার স্কুলে ট্রেনসফার নিলি?
খান যেন আদৌ শুনতে পায়নি। বলল, আসন্নপ্রসবা রমণী পুরুষের চিত্তহারিণী হয় না। কিন্তু তোকে কী বলব, মিতু, ওরকম সুন্দরী মেয়ে আমি জীবনে কখনও দেখিনি।
অনাদর, অবহেলা এবং সর্বোপরি অনাহার তাকে ম্লান করে দিয়েছে সত্য কিন্তু খাঁটি সোনার উপরকার ময়লা কতক্ষণ থাকবে! একে দু-দিন খেতে দিলে, দুটি মিষ্টি কথা বললে এ তো চোখের সামনে কদমগাছের মতো বেড়ে উঠবে, সর্বাঙ্গে সৌন্দর্যের ফুল ফোঁটাবে। এই তো এখুনি যখন মুড়ি এল আর ছেলেটি এই প্রথমবার প্রসন্ন নয়নে তার দিকে তাকাল, তখন তার মায়ের সৌন্দর্য যেন সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠল।
গয়ার কালো পাথরে কোঁদা মূর্তিটি যেন টুনি মেম। হিন্দুদের যে সুন্দর সুন্দর কালো পাথরের মূর্তি আছে সেগুলো সুন্দর আমি জানি, কিন্তু কালো বলে আমার মন কখনও সাড়া দেয়নি। টুনি মেমকে দেখে বুঝলুম, মরা কালো পাথর জ্যান্ত টুনির রঙের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে কী মারই না খেয়েছে!
আমি তো তেমন ফর্সা নই, আমিই মজেছিলুম টুনির রঙ দেখে। আর ও’হারা তো আইরিশম্যান। সে যে পাগল হবে তাতে আর আশ্চর্য কী! গৌরী শ্রীরাধা কেন কৃষ্ণে লীন হয়েছিলেন, টুনি মেমকে দেখে বুঝতে পারলুম। তা সে যাক গে, তোকে আর কী বোঝাব? দেখাবার হলে দেখাতাম। ওই একটি মেয়ে এ-রঙ নিয়ে জন্মেছিল। তার আগেও না, পরেও না।
ইতিমধ্যে মুন্নি খিচুড়ি চড়িয়েছে। ঘরটা পরিষ্কার করা হয়েছে। একটা টেমি টিম টিম করে জ্বলছে। আমি কিছুক্ষণের জন্য বিদায় নিলুম।
বাগানের ছোটবাবু মুসলমান। তাঁকে সার্টিফিকেট দেখাবার ছল করে আমার পুলিশের পরিচয় দিলুম। খাওয়া-দাওয়া করলুম কিন্তু তাঁর বাবুর্চির সঙ্গে, পাছে কোনও সন্দেহের উদ্রেক হয়।
রাত নটার সময় টুনি মেমের ঘরে ফিরে দেখি মুন্নি তাকে আরও চারটি খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। আমাকে বলল, কদিন ধরে কিছুই জোটেনি, সাহেব; আজ হঠাৎ খাবেই-বা কী করে! তবু বলছি, পেটের বাচ্চার জন্য দুটি খেতে।
টুনির পরনে শাড়ি। সেদিকে তাকাতে মুন্নি বলল, আট আনা পয়সা দিয়ে মুদির দোকান থেকে ছাড়িয়ে এনেছি।
আমি বললুম, খুব ভালো করেছ।
মুন্নি আপন কথাখানা নিয়ে এসেছে। সেটা চেটাইয়ের উপর পেতে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে শুয়ে পড়ল।
আমি মোড়াটা চারপাইয়ের পাশে এনে বসলুম। টুনি সেই আগের মতো শুয়ে আছে। হাত দু-খানা বুকের উপর।
আমি উঠি উঠি করছি, এমন সময় টুনি চোখ বন্ধ রেখেই কোনওপ্রকারের ভূমিকা না নিয়ে বলল, আপনি সবকিছু জানতে চান না?
আমি হকচকিয়ে উঠলাম। কিন্তু তার পরের কথাতেই আশ্বস্ত হলুম। বলল, কী করে এ অবস্থায় পৌঁছলুম!
খান বলল, উত্তেজনা-ঔৎসুক্যে আমি তখন অর্ধমৃত। না, না, না, তোমার এখন শরীর দুর্বল, তুমি ওই ধরনের কিছু একটা বলা-না-বলার মতো কী যেন একটা অর্ধপ্রকাশ করেছিলুম।
টুনি বলল, আমি আপনাদের ভাষায় কুলি। আপনারা আমাদের মানুষ বলেই গণ্য করেন না, অথচ জানেন, আমি একদিন রাজরানির সম্মান পেয়েছিলুম।
খান বলল, বিশ্বাস করবি নে মিতু, ঠিক এইরকম ধরনের মার্জিত ভাষায় কথা বলেছিল। আমি তো অবাক।
আমি বললুম, আম্মো।
খান বলল, সেটা পরে পরিষ্কার হল। তোকে সব বলছি, টুনি মেম যা বলেছিল।
বলল, অনেক অপমান নির্যাতন সয়েছি। হেন অপমান নেই যা আমায় সইতে হয়নি মুখ বুজে। নতুন অপমান আর কী হতে পারে? তাই মনে হচ্ছে আমার যাবার সময় বুঝি ঘনিয়ে এল।।
অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। বাচ্চাদুটো ঘুমিয়ে পড়েছে। মুন্নির নাক অল্প অল্প ডাকছে। টিমেটা বাতাসে এদিক-ওদিক নাচছে।
টুনি বলল, ও’হারা সায়েবের বোন এসেছিল বিলেত থেকে এ দেশের হাতি-গণ্ডার দেখবে বলে। তারই আয়া হয়ে আমি ও-বাড়িতে ঢুকি। মেম চলে যাওয়ার পরও তিনি আমায় ছাড়লেন না।
আপনি মুরুব্বি, আপনাকে সব কথা বলতে আমার বাধছে। তবু যে বলছি, তার কারণ আপনি এসেছেন আমার ত্রাণকর্তা, আমার বন্ধুরূপে। আপনাকে না বলব তো বলব কাকে? আর এ যেন আমার বুকের উপর বোঝা হয়ে চেপে বসে আছে। এ-বোঝা না নামিয়ে তো আমার নিষ্কৃতি নেই। আপনি শুনুন।।
