তোকে পূর্বেই বলেছি, আব্রুগড়ের চতুর্দিকে মাইলের পর মাইলজুড়ে চা-বাগান আব-জাব করছে। আমি প্রতি উইক-এন্ডে আজ এটা কাল সেটায় তদন্ত করতে লাগলুম। পরনে খানসামা-বাবুর্চির পোশাক। সবাইকে শুধাই, বাবুর্চির চাকরি কোথাও খালি আছে কি না। আরও শুধাই, আমার এক ভাই নাম ভাঁড়িয়ে এক কুলি রমণীর সঙ্গে বসবাস করছে আসল কারণ অবশ্য আমি ও’হারার খানসামাটার নাম আবিষ্কার করতে সক্ষম হইনি– আমাদের মা তার জন্য বড় কান্নাকাটি করছে, তার খবর কেউ জানে কি না?
বাগানের পর বাগান ব্লাঙ্কো ড্র করেই যাচ্ছি আর আমার রোখও সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে।
শেষটায় আল্লার কুদরত, পয়গম্বরের মেহেরবানি, আর মুর্শিদের দোয়ার তেরস্পর্শ ঘটে গেল।
এক চা-বাগিচার কম্পাউন্ডার শুধু যে খবরটা দিল তাই নয়, বাঁকা হাসি হেসে বলল, ও! টুনি মেম। দেখে এসো গে তোমার বউদি কী সুখেই না আছেন।
আমি মেলা তর্কাতর্কি না করে ধাওয়া করলুম ম্যানেজার সায়েবের বাঙলোর দিকে। সেখানে গিয়ে শুনি, বাবুর্চি পরশু দিন থেকে উধাও, তার বউ কুলিলাইনের একটা কুঁড়েঘরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য।
পড়ি পড়ি এই পড়ি, ত্রিভঙ্গ মুরারি-গোছ অতিশয় জরাজীর্ণ একখানা ছন-বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘর। ঝপের তৈরি দরজাখানা পাশের মাটিতে পচছে।
ভিতরের দৃশ্য আরও মারাত্মক। সঁতসেঁতে নয়, রীতিমতো ভেজা মাটির ভিত। হেথায় গর্ত, হোথায় গর্ত। আল্লার মালুম গর্তে সাপ না ইঁদুর আছে। এক কোণে একটা ভাঙা উনুন। কবে যে তাতে শেষ রান্না হয়েছিল ছাই দেখে অনুমান করতে পারলুম না। তারই পাশে একটা সানকি গড়াগড়ি দিচ্ছে। দু-একটা ভাত শুকিয়ে কাঠ হয়ে তলানিতে গড়াচ্ছে। তারই পাশে মলমূত্র। নোংরা দুর্গন্ধে ঘরটা ম-ম করছে।
দেয়ালে হেলান দিয়ে একটি হাডিড়সার বছর তিনেকের ছেলে চোখ বন্ধ করে ধুকছে। ছেলেটিকে কিন্তু তবুও যে কী অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল সেটা আমার চোখ এড়ায়নি। কেউ না বললেও আমি চট করে বলে দিতে পারতুম ইটি ও’হারার সন্তান। শুনেছি স্বর্গের দেবশিশুরা অমর, কিন্তু এই মরলোকে এসে যদি তাদের কাউকে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে হত তবে বোধহয় তার চেহারা এরকমই দেখাত।
আমি যে গলাখাকরি দিয়ে ঘরে ঢুকলুম সে একবারের তরে চোখও খুলল না। সে শক্তিটুকুও তার গেছে।
অল্পক্ষণের জন্য নীরব থেকে খান বলল, বহু বছর পুলিশে কাজ করে করে আমি এখন সঙ্গ-দিল– পাষাণহৃদয়। তখন সবে পুলিশে ঢুকেছি– আমি ওদিক থেকে চোখ ফেরালুম।
সে আরও নিদারুণ দৃশ্য। একটা বছর দেড়েকের বাচ্চা তার মায়ের সায়া ধরে টানাটানি করছে। তারও সর্বাঙ্গে অনাহারের কঠিন ছাপ। ভালো করে কাঁদতে পর্যন্ত পারছে না। আর সে কী বীভৎস গোঙরানো থেকে থেকে হঠাৎ অনাহারের দুর্বলতা যেন তার গলা চেপে ধরে আর কক্ করে গোঙরানো বন্ধ হয়ে যায়। তখনকার নীরবতা আরও বীভৎস।
চ্যাটাইয়ের উপরে শুয়ে টুনি মেম। পরনে মাত্র একটি সায়া– শত-ছিন্ন, বুক ঢেকে একখানা গামছা জরাজীর্ণ। হাত দু-খানা বুকের উপর রেখে চোখ বন্ধ করে–কী জানি জীবন-মরণ-অনশন কিসের চিন্তা করছে।
স্পষ্ট দেখতে পেলুম, আসন্নপ্রসবা।
ক্ষণতরে পুলিশের কর্তব্য ভুলে গিয়ে আমার ভিতরকার মানুষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চেয়েছিল। আমি সবলে তার কণ্ঠরোধ করে পুলিশের কর্তব্যে মন দিলুম। অর্থাৎ এ-রমণী যেন টের না পায় আমি পুলিশ। ও’হারার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে এসেছি।
তাই খানসামার ভাইয়ের পার্ট প্লে করে চিৎকার-চেঁচামেচি আরম্ভ করলুম, কোথায় গেল লক্ষ্মীছাড়াটা আপন বউকে ফেলে?
খান আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, জানিস মিতু, এত দুঃখের ভিতরেও মেয়েটি আমার দিকে একবার তাকিয়ে ছিল। কারণটা বুঝতে পেরেছিস? জানিস তো, আমরা সিলেটিরা যদি কুলি-রমণী গ্রহণ করি তবে সে হয় রক্ষিতা, কিংবা লোকে বলে খানকি-নটীর বেলেল্লাপনা, কুলি-রমণীকে স্ত্রীর সম্মান সে-ও দেয় না, আর পাঁচজনের তো কথাই নেই। তাই এত দুঃখের ভিতরও বিবাহিত স্ত্রীর সম্মান পেয়ে তার চোখেমুখে তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠেছিল।
আমি ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছি, কোথায় গেলেন আমার পরানের ভাই? আচ্ছা আমার খবর নিসনে, নিসনি, কিন্তু হতভাগার মা যে কেঁদে কেঁদে দেশটা ভাসিয়ে দিল তার পর্যন্ত তোয়াক্কা করল না! এদিকে আবার বউ-বাচ্চা পোষবার ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে।
আমার চেঁচামেচি শুনে কুঁড়েঘরের সামনে একপাল কুলি মেয়েম জমায়েত হয়ে গিয়েছে। আমি দোরে দাঁড়িয়ে বললুম, তোমাদের মধ্যে কেউ রাজি আছ, এদের জন্যে রান্নাবান্না করে দিতে, ঘর সাফসুতরো করতে, আর বেচারি বউটার সেবা-টেবা করতে? এখুনি তাকে পাঁচ টাকা দিচ্ছি। মাসের শেষে ফের পুরো মাইনে পাবে। আর এই আরও দু টাকা হাঁড়িকুড়ি চাল-ডালের জন্য।
সবাই চেঁচিয়ে বলল, মুন্নি, মুন্নি!
মুন্নি এগিয়ে এল। পুরনো ময়লা ছেঁড়া শাড়ি পরা। পরে জানতে পারলুম, এই গরিব বিধবা একমাত্র মুন্নিই যতখানি পারে টুনি মেমদের দেখভাল করেছে। সে-ও নিঃসম্বল, কীই-বা করতে পেরেছে! কিন্তু জানিস মিতু, দুর্দিনে দুটি দরদের কথাই বলে ক-টা লোক!
আর জানি, সেই মুনি আমাকে মৃদুকণ্ঠে কী বলল? বলল, আমাকে মাইনে দিতে হবে না সাহেব। ওদের জন্যে যা রান্না করব তার থেকে দু মুঠো আমাকে খেতে দিলেই হবে।
