ইতিমধ্যে বীরভূমের খোয়াইডাঙা আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। খান বলল, এদের সঙ্গে আমাদের সবুজ সিলেটের কোনও মিল নেই বটে কিন্তু তবু এর রুক্ষ শুষ্ক একটা কঠোর সৌন্দর্য আছে। তার পর মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলুম। মনে পড়েছে। হঠাৎ আমার মাথায় এক নতুন বুদ্ধির উদয় হল। ও’হারা যখন আইরিশম্যান তখন তার বন্দুক থাকাটা অসম্ভব নয়। খবর নিয়ে জানতে পারলুম, ছিল। আমি জানতুম কারও দীর্ঘমেয়াদের জেল হলে তার বন্দুক সরকারি তোষাখানায় জমা দেওয়া হয়। সেটা সেখানে পাওয়া গেল। বিশেষজ্ঞেরা বললেন, খুলির মাথায় যে বুলেট পাওয়া গেছে, সেটা নিঃসন্দেহে ওই বন্দুক থেকেই ছোঁড়া হয়েছে।
যাক। এতক্ষণে এক কদম এগোলুম কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে লোকটা খুন হয়েছে সে কে?
কলকাতায় যখন কলেজে পড়তুম তখন আমাদের হোস্টেলে রামানন্দ চাটুয্যে একবার জর্নালিজম সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে আসেন। মেলা কথা কওয়ার পর তিনি শেষ করেন এই বলে যে, যে কোনও জ্ঞান, যে কোনও খবর, তার মূল্য যত সামান্যই হোক না কেন, কোনও না কোনও দিন জর্নালিজমের কাজে সেটা লেগে যেতে পারে।
পুলিশের কাজেও দেখলুম তাই। সেই যে আমি অবসর সময়ে থানায় বসে পুরনো ফাইলের কাসুন্দি ঘাটতুম তাই লেগে গেল কাজে।
থানায় থানায় একখানা খাতাতে লেখা থাকে কে কবে নিরুদ্দেশ হল– অবশ্য যদি আত্মীয়স্বজন খবর দেয়। বিরাট দেশ ভারতবর্ষ– কত লোক কত রকমে কঞ্জুর হয়ে যায়, কে-বা রাখে তার খবর। তবু মনে পড়ল তিন বছর আগে এক বিহারি মজুর নিখোঁজ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, কঙ্কালটা জড়ানো ছিল একটা চেক্ কম্বলে, এ ডিজাইনটা বিহারিদের ভিতর খুবই পপুলার।
যে পাড়াতে সে থাকত সেখানে জোর অনুসন্ধান চালালুম। অবশ্য ছদ্মবেশে। চায়ের দোকানে আশ-কথা পাশ-কথা কওয়ার পর একে একে তাকে শুধাই, সেই বিহারি রামভজনের কী হল?
যা খবর পাওয়া গেল সেটা আমাকে আরও কয়েক কদম এগিয়ে দিল। তার নির্যাস–
রামভজনের বউ টুনি মেম—
আমি আশ্চর্য হয়ে বাধা দিয়ে বললুম, বিহারি মজুরের বউ মেম হয় কী করে?
খান বলল, সেই কথাই তো হচ্ছে। টুনি ও’হারা সাহেবের বাঙলোয় কাজ করত। পরে সায়েবের রক্ষিতা হয়ে যায়। তাই বিহারিরা তার নাম দেয় টুনি মেম।
রামভজন নাকি একদিন তার দেশের ভাই-বেরাদরকে বলে, সে দেশে চলে যাচ্ছে যা জমিয়েছে তাই দিয়ে খেত-খামার করবে। হয়তো তারও বাড়া আরেকটা কারণ ছিল। সামনাসামনি না হোক, আড়ালে-আবডালে অনেকেই টুনি মেমকে নিয়ে মস্করা-ফিস্কিরি করত। অতি অবশ্যই বোঝা যাচ্ছে রামভজনকে বাদ দিয়ে নয়।
এবং শেষ খবর, টুনি মেম আর তার স্বামীকে স্টেশনে নিয়ে যাবার সময় নাকি ওদের দু জনকে ও’হারার বাঙলোর গেটের সামনে দেখা যায়।
আমি শুধালুম, তার পর? কৌতূহল তখন আমার মাথায় রীতিমতো চাড়া দিয়ে উঠেছে।
আমাকে হতাশ করে খান বলল, ব্লাঙ্কো। মাস তিনেক পর যখন রামভজনের পরিচিত নতুন মজুররা আব্রুগড়ে এল–ওরা কিস্তিতে কিস্তিতে আসছে-যাচ্ছে হামেশাই- তখন তারা বলল, রামভজন আদপেই দেশে পৌঁছয়নি। আব্রুগড়ের কেউ বলল, টুনি মেমের বেহায়াপনায় তিতি-বিরক্ত হয়ে সন্ন্যাস নিয়েছে, কেউ বলল দার্জিলিং না কোথায় যেন চা-বাগানে কাজ নিয়েছে।
আর টুনি মেম?
সে তখন ও’হারার রক্ষিতা। কিন্তু রক্ষিতা বললে হয়তো ও’হারা ও টুনি মেম দুইজনারই প্রতি অবিচার করা হয়। ও’হারা টুনি মেমকে রেখেছিল রানির সম্মান দিয়ে আর টুনি মেম ও’হারাকে ভালোবেসেছিল লায়লী যে-রকম মজনূনকে ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু এ-সব আমি পরে জানতে পেরেছিলুম।
আমি তখন মনে মনে সমস্ত ব্যাপারটার একটা আবছা আবছা ছবি এঁকে ফেলেছি।
টুনি মেম স্বামীকে স্টেশনে নিয়ে যাবার পথে ও’হারার বাঙলোয় নিয়ে যায়। শীতকাল ছিল বলে রামভজন তার সেই চেক কম্বলখানা গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিল। তার পর যে কোনও কারণেই হোক ও’হারা তাকে গুলি করে মেরে বাবুর্চিখানার ভিতের নিচে পুঁতে ফেলে। যে লোক ছটা পরিবারকে খুনের চেষ্টা করতে পারে তার পক্ষে এটা ধুলো-খেলা।
চায়ের দোকানে তদন্ত শেষ হলে পর একদিন থানা থেকে সরকারিরূপে চায়ের দোকানে যে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিফহাল ছিল তাকে ডেকে পাঠালুম। সে বলল কসম খেয়ে, কোনওকিছু তার পক্ষে বলা অসম্ভব তবে রামভজনের ওইরকম একখানা চেক কম্বল ছিল।
তা হলে মোদ্দা কথা দাঁড়াল এই, ও’হারা যদি রামভজনকে খুন করে থাকে তবে তার একমাত্র সাক্ষী টুনি মেম।
টুনি মেম কোথায়?
খবর পেলুম ও’হারার জেল হওয়ার পর টুনি মেম বড় দুরবস্থায় পড়ে। শেষটায় কোনও পথ না পেয়ে ও’হারা সায়েবের বাবুর্চির সঙ্গে উধাও হয়ে যায়।
এইবার সত্যি আমার সামনে যেন পাথরের পাঁচিল খাড়া হল। বহু অনুসন্ধান করেও কিছুমাত্র হদিস পেলুম না, খানসামা আর টুনি মেম গেল কোথায়।
তখন মনে মনে চিন্তা করলুম, সাহেবদের এই যে বাবুর্চি ক্লাসের লোক, এরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের বাড়িতে চাকরি পায় না। পুডিং-পাডিং রোস্টো-মোস্টো দুনিয়ার যত সব অখাদ্য এরা রাধে, শুয়ার গোরুর ঘাট এরা যেসব বানায় সেগুলো দূর থেকে দেখেই শেষবিচারের দিন স্মরণ করিয়ে দেয়– খায় কোন বঙ্গসন্তানের সাধ্যি! অতএব এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, ও’হারার বাবুর্চি নিশ্চয়ই অন্য কোনও সায়েবের চাকরি নিয়েছে।
