খান বলল, থাক্ থাক্, আর বিদ্যে ফলাতে হবে না। অকুস্থলের হালটা ভালো করে শোন।
তিন বছর ধরে বাঙলোটায় বসতি ছিল না বলে বাবুর্চিখানার দোর-জানালা চুরি গিয়েছে, ঘরটা পড়ো-পড়ো। কে এক নতুন সাহেব আসবে বলে ওটার ভিত মেরামত করতে গিয়ে বেরিয়েছে একটা কঙ্কাল, পচা কম্বলে জড়ানো। মাথার চুল ছাড়া আর সব পচে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। আমি নয়া শিকারির মতো সন্তর্পণে এগোলুম বলে খুলির ভিতর মাটির মধ্যে পেয়ে গেলুম একটা বুলেট– তখন ভালো করে তাকিয়ে দেখি, খুলির পিছনের দিকে একটা ওই সাইজের গর্ত।
আব্রুগড়ে গণ্ডায় গণ্ডায় স্পেশ্যালিস্ট নেই যে, আমায় তদ্দণ্ডেই বাৎলে দেবে, ব্যাপারটা কী, অন্তত এই যে কঙ্কাল, এর লাশটা কবে মাটিতে পোঁতা হয়েছিল। শহরের অ্যাসিস্টেন্ট সার্জন আমাদেরই জেলার ধীরেন সেন! তাঁকে ধরে এনে শুধালুম। বললেন, অন্তত তিন বছর। বিচক্ষণ লোক। রায়টা দিলেন কঙ্কাল উপেক্ষা করে, কম্বলটা উত্তমরূপে পরখ করে।
তা হলে প্রশ্ন, তিন বছর পূর্বে ওই বাঙলোয় থাকত কে– যার সময় ঘটনাটা ঘটেছিল?
খবর পাওয়া গেল, আইরিশম্যান পেট্রিক ও’হারা সাহেব। সে এখন কোথায়? জেলে। কেন? সে-কথা জেনে কি পুলি-পিঠের নেজ গজাবে?
আমার মন ক্ষণে এদিকে ধায়, ক্ষণে ওদিকে ধায়। বন্ধ ঘরে আগুন লাগলে মানুষ যেমন মতিচ্ছন্ন হয়ে ক্ষণে এ-দরজায়, ক্ষণে ও-জানালায় ধাক্কা দেয়– কোনও একটাও ভালো করে একাগ্রমনে খোলবার চেষ্টা করে না– আমার হল তাই। কোনও একটা ক্লু পাঁচ মিনিটের তরেও ঠিকমতো ফলোআপ করতে পারিনে।
এখন জ্ঞানগম্যি হয়েছে ঢের। এখন বুদ্ধি হয়েছে বলে বুঝেছি যে, এসব রহস্য সমাধান বুদ্ধির কর্ম নয়। রুটিনের ঘানিতে সবকিছু ফেলে দিতে হয়। তেল বেরিয়ে আসবেই আসবে, সমস্যা সমাধান হবেই হবে।
যে-কাজ আজ পাঁচ মিনিটে করতে পারি, তখন লেগেছিল এক হপ্তা। ততদিনে প্রশ্নগুলো মোটামুটি সামনে খাড়া করে নিয়েছি :
(১) লোকটা কে?
(২) এটা খুন তো?
(৩) কে খুন করল?
(৪) কার বন্দুকের গুলি?
কঙ্কাল থেকে মানুষ শনাক্ত অসম্ভব না হলেও বড়ই কঠিন। তন্ন তন্ন করেও আঙটি-টাঙটি, বাঁধানো দাঁত, ডেন্টিস্টের কোনও প্রকারের কেরানি কিছুই পাওয়া গেল না। ব্লাঙ্কো!
আমি তো এ শহরে এসেছি মাত্র কয়েক মাস হল, কিন্তু পুরনো বাসিন্দাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই কিছু না কিছু জানে, কিন্তু অহমিয়ারা সরল হলেও এ-তত্ত্বটি বিলক্ষণ জানে যে, পুলিশের ঝামেলাতে খোদার খামোখা জড়িয়ে পড়তে নেই। ব্লাঙ্কো!
ইতিমধ্যে রিপোর্ট পৌঁছল, খুলির ভিতর যে বুলেট পাওয়া গিয়েছিল, সেই বুলেটই খুলির ফুটোটার জন্য দায়ী।
অমি বাঁকা হাসি হেসে বললুম, মারাত্মক আবিষ্কার। এ তো কানাও বলতে পারে। আর ওই দেখ, তোর কৃষ্ণসুন্দরী আর একপাল সাঁওতালি। ওদের বসতির দিকে এগোচ্ছি এখন।
গাড়ি তখন খানা জংশনে লুপ লাইনে ঢুকবে বলে ধীরে ধীরে চলছিল।
খান অনেকক্ষণ ধরে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার পর মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে বললে, নাহ্, টুনি মেমের পায়ের নখের কণাও এরা হতে পারে না।
আমার অভিমান হল। সাঁওতালি আমাদের প্রতিবেশী মেয়ে।
লক্ষ না করেই খান বলল, বুলেটে যে খুলি ফুটো করেছে, সে তো তুই বুঝিস, আমিও বুঝি, কিন্তু আদালত কি বুঝবে? তারা প্রমাণ চায়। উঁঃ, আদালত তো আদালত! অডিটের বেলা জান না কী হয়? পেনশন্ নেবার জন্য তুমি সার্টিফিকেট দাখিল করলে যে, তুমি এপ্রিল মাসে জীবিত আছ। অডিট শুধাল, কিন্তু মার্চ মাসের সার্টিফিকেট কই? আপনি যে মার্চ মাসে জীবিত ছিলেন, তার প্রমাণ কী? না হলে যে মার্চ মাসের পেনশনটা পাবেন না।
আমি বললুম, সেটা কিন্তু ঠিক। দিল্লির যাদুঘরে কেন্দ্রের এক মন্ত্রী বিদেশি ভিজিটরকে ছোট্ট একটি শিশুর খুলি দেখিয়ে বললেন, ইটি শঙ্করাচার্যের খুলি। ভিজিটর অবাক হয়ে শুধাল, তার খুলি এত ছোট ছিল? মন্ত্রী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এটা তার শিশু বয়সের খুলি। দুটো কিংবা ছটা খুলি যখন হতে পারে, তখন দু-টো কিংবা ছটা জীবন হবে না কেন? তা হলে একটা মার্চ মাসে গ্যাপ পড়াটাই-বা বিচিত্র কী?
ওসব কথা থাক; তার পর কী হল বল্।
তখন অনুসন্ধান করতে লাগলুম খুনটা হয়েছে ও’হারা সাহেব এই বাঙলোয় থাকাকালীন, না তার পরে কেউ খুন করে লোকটাকে নির্জন পোড়োবাড়িতে পুঁতে গেছে?
ও’হারা জেলে। দীর্ঘ মেয়াদে।
থানার পুরনো ফাইল কাগজপত্র ঘেঁটে যা আবিষ্কার করলুম, সে-ও বিচিত্র। সাহেব ছটা ইংরেজ পরিবারকে চকোলেটের ভিতর বিষ ঠেসে তাই খাইয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল। প্রমাণের অভাব হয়নি। আব্ৰুগড় থেকে প্রায় ষাট মাইল দূরের এক ছোট্ট ডাকঘর থেকে ও’হারা পাঠিয়েছিল ছটি রেজেস্ট্রি পার্শেল ছ জন ইংরেজের নামে পোস্টমাস্টার সেই মর্মে সাক্ষী দিয়েছিল।
এদের দুজন থাকত অব্রুগড়ে, বাকিরা কাছেপিঠের চা-বাগানে। একইসঙ্গে একই জিনিস খেয়ে সবাই মরমর হয়েছিল বলে সিভিল সার্জন বুদ্ধি করে সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে যে, চকোলেটের মধ্যে গড়বড় সড়বড় আছে। তাই তারা সে যাত্রা রক্ষা পায়। কেউ মরেনি।
কিন্তু ছ-টা কেন, একটা পরিবার একটা পরিবারই-বা কেন একজন লোককে খুন করার চেষ্টা করলেও দীর্ঘমেয়াদের জন্য শ্রীঘর। ও’হারা আলিপুরে।
