বললম, সাঁওতাল। হ্যাঁ, আমাদের দেশে অতদুর ওরা পৌঁছয়নি। কিংবা হয়তো ছিল এককালে। কাল যে-রকম হিন্দু পুব বাঙলা ছেড়ে চলে এল, এরা হয়তো পরশু।
খান দেখি, আমার কথায় বিশেষ কান দিচ্ছে না। আপন মনে কী যেন ভাবছে। ওস্তাদ গাওয়াইয়া যে-রকম গান শুরু করার পূর্বে হঠাৎ কেমন যেন আনমনা হয়ে যান। তখন বিরক্ত করতে নেই।
গাড়ি ছাড়ল। একটু কাছে এসে বলল, ওই কালো মেয়ে আরেকটি মেয়ের কথা আমার স্মরণে এনে দিল। তার রঙ ছিল এর চেয়েও কালো। কিন্তু সে কী কালো! সব রঙের অভাবে নাকি কালো হয়! হ্যাঁ তাই; কোনও রঙই সাহস করে তার শরীর চড়াও করতে পারেনি। আমি তাকে দেখেছিলুম তার শারীরিক মানসিক চরম দুরবস্থায়। তবু চোখ ফেরাতে পারিনি। হিন্দুরা কেন যে কালী কালী করে তখন বুঝতে পেরেছিলুম।
গাড়ি বর্ধমানে এসে থামল। বর্ধমানে আমি গত সাত বছর ধরে অর্ডার দিয়ে কখনও কেলনারের কাছ থেকে চা-আণ্ডা পাইনি। কাজেই ফর সেফটিস সেক প্রথমেই ভাঁড়ের চা কিনে রাখলুম। বিস্তর ছুটোছুটি করে কিছু-কিঞ্চিতের জোগাড় হল। স্থির করলুম, বোলপুরে খানকে একটা পুরা পাক্কা খানা তুলে দেব। সেখানকার গোসাই আমাকে নেকনজরে দেখে।
গাড়ি ছাড়তে খান বলল, আমি তখন আব্রুগড়ে। এসৃআই– আমরা বাঙলায় লিখি এছাই। রোজ থানায় বসে ভাবি, ইয়া আল্লা, চাকরির এ দুস্তর দরিয়া পেরিয়ে কবে গিয়ে এমন মোকামে পৌঁছব যেখানে হরহামেশা পয়সাটা-আধলাটার হিসাব না করতে হয়। ঘুষ খেতে তখনও শিখিনি–
আমি শুধালুম, এখন শিখেছিস? তা—
বললে, হ্যাঁ, তবে সে অন্য ধরনের। পরে তোকে বুঝিয়ে বলব।
আব্রুগড় বড় মনোরম জায়গা। অনেকটা শিলঙের মতো উঁচু-নিচুতে ভর্তি, টিলাটালার টক্কর। কোন্ এক সায়েব নাকি মালয় না, কোথা থেকে কৃষ্ণচূড়া এনে এখানে পুঁতে দেয়। এখন শহরটা আগাপাশতলা তাই দিয়ে ভর্তি। শহরটা এমনিতেই সবুজ, তার ওপর এল গোলমোরের কালো সবুজ আর তার মাঝখানে ফুটে ওঠে বাড়িগুলোর পোড়া লালের টাইলের ছাদ।
চতুর্দিকে অজস্র চা-বাগান আর তেলের খনি। সায়েব-সুবো, বেহারি-মারওয়াড়িতে শহরটা গিসগিস করছে। আর খাস আসামিদের তো কথাই নেই তারা বড়, বড় সরল। আব্রুগড়ের বটতলাতে চার আনা দিয়ে মিথ্যে সাক্ষী পাওয়া যেত না। আমাদের দেশে আকছারই যা যায়। এখন কী অবস্থা তা অবশ্য জানিনে।
বড়কর্তা বলেছিলেন, কিছু একটা জবরদস্ত নতুন না করতে পারলে কুইক প্রোমোশন হয় না। জবরদস্ত নতুন করবটাই-বা কী? এখানে খুন-খারাবি হয় অত্যল্প। উঠোনই নেই তো আমি নাচি কী করে!
তাই থানায় বসে বসে পুরনো দিনের খাতাপত্র দেখি, ফাইল পড়ি। সেইটেই একদিন লেগে গেল কাজে। পরে বলছি।
আমার চেনা এক রাজমিস্ত্রি আমায় রাস্তায় দাঁড় করিয়ে একদিন বলল, মোল্লাবাজারের পিছনে উঁচু টিলার উপর যে খালি বাঙলো আছে তার বাবুর্চিখানার ভিত মেরামত করতে গিয়ে সে একটা লাশ আবিষ্কার করেছে– ঠিক লাশ নয়, কঙ্কালই বলা যেতে পারে– পচা ছেঁড়া কম্বল জড়ানো।
রক্তের সন্ধান পেয়ে বললুম, তুমি ওখানে যাও। হঠাৎ যেন আবিষ্কার করেছ এই ভাব করে আমাকে খবর পাঠাও।
তা না হলে পরে প্রমাণ করতে হবে, ওটা সত্যই সেখানে ছিল, বাইরের থেকে এনে কেউ চাপায়নি।
জিনিসটা যে খারাবি, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বাবুর্চিখানার নিচে কম্বলৈ জড়ানো পোঁতা কঙ্কাল! এখানে কস্মিনকালেও কোনও গোরস্তান ছিল না–টিলার ঢালুর দিকে কতটুকু জায়গা যে, ওখানে মানুষ গোরস্তান বানাতে যাবে। তা হলে এটা নিশ্চয়ই খুনের ব্যাপার। শুধু খারাবি নয়, খুন-খারাবি।
আমি বললুম, সাক্ষাৎ শার্লক হোমস।
শুধলে, সে আবার কে?
আমি প্রথমটায় হকচকিয়ে পরে সামলে নিয়ে বললুম, তুমি এগোও; আমি আর রসভঙ্গ করব না।
বলল, প্রথম রক্তের সন্ধান পেয়ে আমি যেন হন্যে হয়ে উঠলুম। সমস্ত রাত ঘুম হল না। মাথার ভিতর ঘুরছে, কত রকম নর-হত্যার ছবি, যেন স্বয়ং পাঁচকড়ি দে সেগুলো এঁকে যাচ্ছেন, আর দীনেন্দ্রকুমার রায় আপন হাতে রঙ গুলে দিচ্ছেন। বেবাক লালে লাল।
আমি বললুম, রসভঙ্গ করতে হল। অপরাধ নিসনি। হোমস্ হল বিলিতি অরিন্দম।
খান বলল, তাই বল। কিন্তু তুই ভাবিসনে, তোকে একটা রগরগে খুনের কাহিনী শোনাতে যাচ্ছি মাত্র। এতে আছে বড় দুঃখের কথা। বড় বিষাদ বেদনা। স্বর্গ আমি দেখিনি, কিন্তু স্বর্গচ্যুত হতভাগ্য একজনকে আমি দেখেছি। সে দৃশ্য আর কারও দেখবার দরকার নেই।
কী বলছিলুম? হ্যাঁ। ভোর হতে-না-হতেই আমি থানায় এসে উপস্থিত। কিন্তু মূর্খের মতো আমি রাজমিস্ত্রিকে বলে রাখিনি, সে কখন আসবে। সে যদি এসে ফিরে যায়; কিংবা কেসটা হাতছাড়া হয়ে যায়!
আজ হাসি পায়। রাতদুপুরে এখন যদি জমাদার এসে খবর দেয়, পদ্মার চরে ডাকাতিতে পাঁচটা চরুয়া আর তিনটে ডাকাত মারা গিয়েছে, আমি তা হলে পাশবালিশ জাবড়ে ধরে বলি, যা-যা, দি করিসনি!
রাজমিস্ত্রি হেলেদুলে বেলা প্রায় বারোটায় এলেন আমাকে আষ্ট ঘণ্টা দগ্ধানোর পর।
যেন সদ্য এইমাত্র ফার্স্ট ইনফর্মেশন পেয়েছি, এরকমধারা মুখের ভাব করে দুটি কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে অকুস্থলের দিকে রওনা দিলুম। গিয়ে দেখি অত্যন্ত কুস্থান, অর্থাৎ অকুস্থানই বটে।
আমি বললুম, ওই মলো। অকুস্থান হয়েছে আরবি, ওয়াকেয়া, অর্থাৎ ঘটনা আর স্থান নিয়ে।
