কিন্তু কোথায় সেই আরব সংহতি?
প্রাচীন দিনের কাহিনীতে ফিরে যাব না। এই আপনার-আমার চোখের সামনেই দেখতে পেলুম, ইরাক সে সংহতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল, কুয়েইত জাতভাই কাসেমের হাত থেকে বাঁচবার জন্য বিধর্মী (কারও কারও মতে কাফের) ইংরেজকে দাওয়াত করে খানা খাওয়াল, এবং পরশু না তরশু দিন সিরিয়াও নাসেরের মিশরিদের গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। এমনকি সিরিয়ার মসজিদে মসজিদে নাকি মোল্লারা নাসেরকে অভিসম্পাত দিচ্ছেন, নাসের নাস্তিক, টিটোর সঙ্গে কোলাকুলি করে, তারই আশকারায় মিশরের টেলিভিশন অশ্লীল ছবি, অর্ধনগ্না রমণী দেখায়।
এক ধর্ম, এক রক্ত, এক ভাষা। এক ভাষা, বিশেষ করে বললুম, কারণ সিরিয়া, ইরাক, মিশরের কথ্য ভাষাতে প্রচুর পার্থক্য থাকলেও ওসব জায়গায় কোনও উপভাষা সৃষ্টি হয়নি– সেই এক হাজার বছরের পুরনো ক্লাসিকাল আরবিই সর্বত্র চলে। তবু আর মিলন হয়ে উঠছে না।
***
কাজেই সংহতির সন্ধানে অন্যত্র যেতে হবে। গুজরাতি, বাঙালি, হিন্দু, মুসলমান, সবাই মিলে হিন্দি কপচালেই যে রাতারাতি আমাদের জাতীয় সংহতি গড়ে উঠবে, এ দুরাশা যেন না করি।
রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী বলেই বলছি তা নয়, আমার মনে হয়, তিনিই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি পরিষ্কার চিন্তা করেছেন।
টুনি মেম
বেশি দিনের কথা নয়, হালের। পড়িমড়ি হয়ে শেয়ালদায় আসাম লিঙ্কে উঠেছি। বোলপুরে নাবব। কামরা ফাঁকা। এককোণে গলকম্বল মানমুনিয়া দাড়িওয়ালা একটি সুদর্শন ভদ্রলোক মাত্র। তিনি আমার দিকে আড়নয়নে তাকান, আম্মো।
একসঙ্গেই একে অন্যকে চিনতে পারলুম।
আমি বললুম, খান না রে?
সে হাকল, মিতু না রে?
যুগপৎ উল্লম্ফন, ঘন ঘন আলিঙ্গন। পাঠশালে পাশাপাশি বসতুম। তার পর এই তিরিশটি বছর পরে দেখা। প্রথম উচ্ছ্বাস সমাপ্ত হলে জিগ্যেস করলুম, তুই এ রকম বদখদ দড়ি-দাঁড়া রেখেছিস কেন?
খানটা ওই পাঠশালার যুগেও ছিল হাড়ে টক শয়তান। প্রশ্ন শুধালে ইহুদিদের মতো পাল্টা প্রশ্ন জিগ্যেস করে, উত্তরটা এড়িয়ে যায়। শুধাল, দাঁড়া কারে কয়?
হাঁড়ি বড় সাইজের হলে হাঁড়া হয়, গাড়ি গাড়া। দাড়ি হিন্দি-উর্দুতে স্ত্রীলিঙ্গ!–কিন্তু দাঁড়া পুংলিঙ্গ। তোরটা দাড়ি নয়, দাঁড়া।
অবশ্য অস্বীকার করিনে, তাকে দেখাচ্ছিল গত শতাব্দীর ফরাসি খানদানিদের মতো। খানের রঙ প্যাটপেটে ফর্সা। গায়ে প্রচুর পাঁঠার রক্ত। শুধালুম, তা তোর পাকিস্তান ছেড়ে এই না-পাক দেশে এসেছিস কী করতে?
আজমিরের খাজা মুঈন-উদ-দীন চিশতির কাছে মানত করেছিলুম, বাবার আশীর্বাদে আল্লা যদি আমাকে এসৃপি-তে প্রোমোশন করেন তবে বাবার দরগা দর্শনে যাব, ভালো-মন্দ যা আছে তাই দিয়ে শিরনি চড়াব। সেই সেরে ফিরছি। এই নে প্রসাদি-গোলাপের পাপড়ি।
আমি মাথায় ছুঁয়ে বললুম, ও! তুই বুঝি পুলিশে ঢুকেছিলি?
বলল, হ্যাঁ, সাব-ইন্সপেকটর হয়ে।
আশ্চর্য হয়ে শুধালুম, বলিস কী রে? আর এরই মধ্যে এসপি।
প্রসাদির পাপড়ি মাথায় ঠেকিয়ে বলল, খাজা মুঈন-উদ-দীন চিশতির দোওয়া আর হিন্দুদের কৃপায়!
হিন্দুদের কৃপায়!
হ্যাঁ ভাই, তেনাদেরই কেরপায়। তেনারা যদি পূর্ব বাঙলার পুলিশের ডাঙর ডাঙর নোকরি ছেড়ে ঝেঁটিয়ে পশ্চিম বাঙলা আর আসামে না চলে যেতেন তা হলে আমি গণ্ডায় গণ্ডায় প্রমোশন পেতুম কী করে? তারা থাকলে হয়তো অবিচার করে আমাকে দু একটা না-হক প্রোমোশন দিত, কিন্তু একদম দিনকে রাত, রাতকে দিন তো করা যায় না। আর তুই তো বিশ্বাস করবিনে– তুই চিরকালই সন্দেহপিচাশ, যে কটি হিন্দু রয়ে গেল তারা গণ্ডায় গণ্ডায় না হোক জোড়ায় জোড়ায় প্রোমোশন পেয়েছে। জানিস, মণ্ডল সিভিল সার্জন হয়েছে?
আমি ভিরমি যাই আর কি। গাড়ল ফোঁড়াটি পর্যন্ত কাটতে জানত না।
খান বলল, সব তো শুনলি। তোর বইও আমি দু চারখানা পড়েছি। আচ্ছা বল তো, এসব বানিয়ে বানিয়ে লিখিস, না কিছু কিছু দেখা-শোনার জিনিস, অভিজ্ঞতার বস্তু?
কিছুটা বানিয়ে, কিছুটা অভিজ্ঞতা থেকে।
তাজ্জব! অমি তো ভাই বিস্তর খুন-খারাবি দেখলুম। এক-একটা এমন যে, আস্ত একখানা উপন্যাস হয়। কিন্তু তারই রিপোর্ট লিখতে গেলে আমার তালুর জল আর নিবের কালি শুকিয়ে যায়। কী করে যে তুই লিখিস।
আমি বললুম, আমাকেও যদি সুদ্ধমাত্র ফ্যাক্টের ভিতর নিজেকে সীমাবদ্ধ করে লিখতে হত তা হলে আমার রিপোর্টটা হত তোর চেয়েও ওঁচা। কল্পনা এসে উৎপাত করত। তা সেকথা যা গো আমার দিনকাল বড্ডই খারাপ যাচ্ছে প্লটের অপর্যাপ্ত অনটন। সম্পাদক মিঞা আবার গল্পই চান, ইলসট্রেট করবেন। বল না একটা।
দাড়ির ভিতর দিয়ে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, কোনটা বলি, কেসগুলো তো মাথার ভিতর আবজাব করছে। আচ্ছা দাঁড়া, ভেবে নিই।
এমন সময় সিগনেল অভাবে ট্রেন খামোকা মাঝপথে দাঁড়াল। খান বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, এরা কী জাত রে?
তাকিয়ে দেখি, মিশকালো সাঁওতাল মেয়ে তার ওপর মেখেছে প্রচুর তেল। শাড়ির উপর বেঁধেছে গামছা, উত্তমাঙ্গে চোলিফোলি কিছু নেই, নিটোল দেহ, সুডোল ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষেরটা বোঝা গেল পরিষ্কার, কারণ, হাতদুটি যতদূর সম্ভব উঁচু করে পলাশ ফুল পাড়বার চেষ্টা করছিল খোঁপায় গুজবে বলে। হলদে পলাশ। এ অঞ্চলে লালের তুলনায় ঢের কম। কী জানি, মেয়েটা হয়তো ভেবেছে, লাল-কালোর চাইতে হলদে-কালোর কন্ট্রাস্টে খোলতাই বেশি।
