আমাদের মতো সাধারণ পাঠক ভীত হয়ে সে রণাঙ্গন পরিত্যাগ করে।
কিন্তু আমাদের দলটি নিতান্ত ছোট নয়। এমনকি, আশ্চর্যের বিষয়, খুদ খৈয়ামের দেশে ইরানেও আমাদের মতো বিস্তর নিরীহ পাঠক আছেন, যারা কোন রুবাঈটি খাঁটি আর কোনটা মেকি তাই নিয়ে কালক্ষেপ করতে চান না।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, ফিটজেরাল্ড যে কটি রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন তার কতগুলো ওমরের নয়। তৎসত্ত্বেও ইরানে তারই ওপর নির্ভর একটি খৈয়াম সংস্করণ বেরিয়েছে।
কিন্তু এই সংস্করণের আরও বৈশিষ্ট্য আছে।
এদেশে ফরাসি-জর্মন শেখার প্রতি অনেকের উৎসাহ দেখা দিয়েছে। খৈয়ামের এই ইরানি সংস্করণে আছে : ১. ফিটজেরাল্ডের ইংরেজি অনুবাদ, ২. সেই অনুবাদের যতটা কাছাকাছি পাওয়া যায় তারই ফারসি মূল (ফিটজেরাল্ড অনেক সময় ভাবানুবাদ করেছেন বলে বলা কঠিন, ঠিক কোন ফারসি রুবাঈটি অনুবাদ করেছেন, আবার এমনও দেখা যায়, একাধিক রুবাইয়াৎ থেকে তিন-চারটি ছত্র জোগাড় করে ইংরেজি একটি কোয়াট্রেন সৃষ্টি করেছেন), ৩. ফরাসি অনুবাদ– কখনও মূল ফারসির অনুবাদ অর্থাৎ ফিটজেরাল্ড যে স্বাধীনতা নিয়েছেন অনুবাদক তা নেননি, আর কখনও-বা ফিটজেরাল্ডের ইংরেজি থেকে ফরাসি অনুবাদ, ৪. জর্মন অনুবাদ– একাধিক জর্মন অনুবাদ থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে, এবং ফিটজেরান্ডের অনুকরণ এরা প্রায়ই করেননি, ৫. আরবি অনুবাদ সরাসরি ফারসি থেকে, তবে অনেক স্থলেই স্বাধীন। অনুবাদ করেছেন এক আরব কবি যদিও তিনি জাতে ইরানি।
এছাড়া সংকলনে কয়েকটি মূল্যবান অবতরণিকাও একাধিক ভাষায় সংযোজিত হয়েছে। বিখ্যাত জর্মন ফারসিবিদ রোজেন, ফিটজেরাল্ড, আরব পণ্ডিত আদিব অলতুগা, ইরানি পণ্ডিত হিদায়ৎ ও সঈদ নফিসি (ইনি কয়েক বছর ভারতে বাস করে গেছেন) এঁদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পড়ে খৈয়ামপ্রেমী পাঠক মাত্রই মুগ্ধ হবেন। অবশ্য ফিটজেরান্ডের অবতরণিকা পড়া হয় পুরাতত্ত্ব হিসেবে।
আমরা যখন ফরাসি বা জর্মন কোনও নতুন ভাষা শিখতে যাই তখন আমাদের হাতে দেওয়া হয় যে পাঠ্যপুস্তক তাতে থাকে ঘরের আসবাবপত্রের নাম, পিতা-মাতা-ভ্রাতার প্রতিশব্দ, স্টেশন, টিকিট, প্ল্যাটফর্ম, খাদ্যাদি, বাগানের সাজসরঞ্জামের যাবতীয় জিনিসপত্র এদের নাম, লিঙ্গ ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে বয়স্ক পড়ুয়ারা এবং আমরা সচরাচর একটু বয়েস হওয়ার পরেই এসব ভাষা আরম্ভ করি– পায় অল্পই মনের খোরাক। লাগে একঘেয়ে– শিখে যাই গতানুগতিকভাবে। আমি জানি একেবারে গোড়ার থেকে মন এবং হৃদয়েরই খাদ্য দেওয়া যায় না কিন্তু কিছুটা শেখার পরেই তো মৃন্ময় বিষয়বস্তু থেকে চিন্ময়ে চলে যাওয়া অসম্ভব নয়। বয়স্কদের জন্য এরকম পাঠ্যপুস্তক বিদেশে আমি দু-একখানা দেখেছি। এস্থলে আমার মূল বক্তব্য এই, আট বছরের বাঙালি ছেলে ফরাসি শিখতে চাইলে তার পাঠ্যপুস্তক হবে একরকম, আঠারো বছরের কিশোর শিখতে চাইলে হবে অন্যরকম।
যাদের কিছুটা ফরাসি বা জর্মন, অথবা উভয়েরই কিছুটা শেখা হয়ে গিয়েছে আর খৈয়ামে আসক্তি থাকলে তো কথাই নেই তারা এই সংকলনটি পড়ে আনন্দ তো পাবেনই, ভাষা-শিক্ষার কাজও অনেকখানি দ্রুত এগিয়ে যাবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা ওমরের সবচেয়ে পরিচিত চতুষ্পদীটি নিচ্ছি …
ফারসিতে আছে–
গর দস্ত দহদ জ মগজে গন্দুমে নানি
ওজু মৈ দোমনি জ গুসফন্দি রানি
ও আনগে মন ও তো নিশসস্তে দর ওয়রানি
এয়েশি বুদ ওয়া আন নৃহদ-হর সুলতানি
Here with a Loaf of Bread beneath the Bough
A Flask of wine, a Book of Verse and Thou
Beside me singing in the Wilderness
And Wilderness is Paradise enow.
Pour celui qui possede un morceau de bon pain
Un gigot de mouton. un grand flacon de vin.
Vivre avec une belle au milieu des ruines,
Vaut mieux qu dun Empire etre le souverain
Wein, Brot, ein gutes Buch der Lieder :
Liess ich damit selbst unter Truemmern mich nieder,
Den Menschen fern, bei Dir allein,
Wuerdich gluecklicher als ein koenig sein. (৩)
মূল ফারসিতে আছে :
হাতে (দস্ত) যদি থাকে
গমের মগজের (মগ) রুটি (নান)
দুই মনী (দো মনী) মদ ও
ভেড়ার একখানা ঠ্যাঙ (রান),
তোমাতে আমাতে যেখানে বসেছি
সেটি যদি ধ্বংসাবশেষে পরিপূর্ণও হয়
(তবুও) আনন্দ (আয়েস) যা হবে
সে সুলতানের রাজত্বের (হদ) চেয়েও বেশি।
ইংরেজিতে দেখা যাচ্ছে, ভেড়ার ঠ্যাঙ বাদ পড়েছে (বোধহয় অনুবাদক এটাকে বড় গদ্যময় মনে করেছেন), কবিতার বই যোগ করা হয়েছে, প্রিয়ার সঙ্গীতও বাড়ানো হয়েছে; সুলতানের রাজত্বের বদলে স্বর্গপুরী। কিন্তু একটা জিনিস আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। প্রথম ছত্রে আছে, বিনিৎ দ্য বাও– পরে আবার সেটাই উইলডারনিস হয় কী করে? সত্যেন দত্ত বুদ্ধিমানের মতো বিজন ব্যবহার করেছেন, উইলডারনিস ও বনচ্ছায়া দুই-ই বিজন। কান্তি ঘোষ উইলডারনিস বর্জন করে দ্বন্দ্বমুক্ত হয়েছেন।)।
ফরাসিতে আছে ভালো রুটি, ভেড়ার ঠ্যাঙ ও তবে মদের পাত্রকে গ্র (grand ফরাসিতে বিরাট অর্থে) বলা হয়েছে, দু মনী বাদ পড়েছে এবং ফারসিতে যেখানে সুদ্ধ তুমি আছে, সেটা ফরাসিতে সুন্দরী তরুণী (belle) হয়ে গিয়েছে। অনুবাদ মোটামুটি আক্ষরিক।
