জর্মনে মদ (Wein), রুটি (Brot) আর কবিতার বই (Buch)। দুম্বা বাদ পড়েছে, তবে বাও নেই– আছে ফারসির সরল অনুবাদ ভগ্নাবশেষ মধ্যে (Truemmerm)।
ইরানি চিত্রকর চতুষ্পদীটি বর্ণে অলংকৃত (ইলট্রেট) করার সময় যুবক-যুবতীকে বসিয়েছেন ভাঙাচোরার মাঝখানে বিধ্বস্ত প্রাসাদের অবশিষ্ট একটি দেউড়ির কাছে। দূরের পটভূমিতে আবৃছা-আবৃছা দেখা যাচ্ছে, সপারিষদ সুলতান বসেছেন সিংহাসনে, সম্মুখে গায়িকা– কিন্তু সমস্তটাই যেন কোনও প্রেতলোকের আবহাওয়াতে ভাসছে।
চিত্রকর ফিটসজেরাল্ডের প্রভাবে পড়েছেন– কিঞ্চিৎ। যুবক-যুবতীর সম্মুখে দুম্বার ঠ্যাঙ আছে, মদের পাত্রও আছে, তবে সেটা বিরাট নয়, দু মনী তো নয়ই এবং সেটি ইটালিয়ান পদ্ধতিতে খড় দিয়ে প্যাচানো–ইরানে সে রেওয়াজ আছে বলে জানতুম না–কিন্তু যুবকের হাতে দিয়েছেন একখানি পুস্তিকা– ফিটজেরান্ডের ফিরিস্তিমাফিক–তবে তরুণী সে মাফিক গান গাইছেন না। পায়ের কাছে আমাদের খোয়াই-ডাঙার বুনো ফুল। তেরঙা ছবি, রেজিস্ট্রেশন খারাপ।
আমাদের কৈশোর-যৌবনে বহু তরুণ-তরুণী ফিটজেরাল্ডের ওমর প্রায় কণ্ঠস্থ করে রাখতেন। সে রেওয়াজ এ যুগেও হয়তো সম্পূর্ণ লোপ পায়নি। যেটুকু স্মরণে রয়েছে তারই ওপর নির্ভর করে ফরাসি-জর্মন অনুবাদ পড়লে ভাষাশিক্ষা দ্রুততর হবে, পাঠক আনন্দও পাবেন। হয়তো-বা তারই ফলে আমরা আরেকখানা খৈয়ামের বাঙলা অনুবাদ পাব।
পুস্তকে পঁচাত্তরটি চতুষ্পদীর জন্য পঁচাত্তরখানা তিনরঙা ছবি তো আছেই, তার ওপর এদিক-ওদিক সর্বত্র ছড়িয়ে আছে কারুকার্য, আবছা তুলিতে আঁকা নানা প্রকারের অর্ধসুপ্ত চৈতন্যের স্বল্প প্রকাশ– কাব্য পড়ে চিত্রকরের প্রতিক্রিয়ার রূপ। ছবিগুলো রবি বর্মা স্টাইলে আঁকা– তবে তার চেয়ে ঢের কাঁচা। একটি ব্যাপারে কিন্তু সর্বচিন্তাশীল দর্শকই সন্তুষ্ট হবেন– জামাকাপড়, বাড়িঘর, গাছপালা, আসবাবপত্র প্রায় সবই খাঁটি ইরানি। অবশ্য বিদেশি প্রভাব কিছুটা যে পড়েনি তা নয়, তবে সে সামান্য। বিদেশি বিশেষ করে ইয়োরোপীয় চিত্রকর– যেরকম নিছক কল্পনার ওপর নির্ভর করে কিম্ভূত বদখৎ হাঁসজারু তৈরি করেন, তিনি তার থেকে স্বভাবতই মুক্ত। এবং তাঁর ছবিতে যে এক নতুন পরীক্ষার প্রচেষ্টা রয়েছে সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন হয়েই চিত্রকর ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে উপক্রমণিকায় লিখেছেন :
At the end, I hope the Patrons of art find this gift amusing and this could be an Ideal Ideas (sic) for the young artists, and the old and experience (sic) artists could forgive some of the scenes which lacking the Proper Techniques (sic). I wish they call them to my attention, Ill be most greatful (sic) …Akbar Tajvidi.
এ পুস্তক সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু মনোরম আলোচনা করা যেত, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল, এটির সঙ্গে শুধু আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।(৪)
The quatrains of Abolfath Ghiat-e-Din Ebrahim KHAYYAM of Nishabur, Published by Tahir Iran Co, Kashani Bros Teheran, Lalezar Istanbul Sq.
———–
১. তাপসী রাবেয়া নাম এদেশে অজানা নয়। তার অর্থ চতুর্থ কন্যা। রুবাইয়াৎ, রাবেয়া ইত্যাদি শব্দ আরবি, আরবাৎ অর্থাৎ চার থেকে এসেছে।
২. ইরানে ১৪০১ পর্যন্ত পাওয়া যায়। ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ খৈয়ামের মৃত্যুর প্রায় ৮৮ বছর পরে লিখিত এক পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যায় ২৫১টি– এটি এখন অক্সফোর্ডে।
৩. বাঙলায় :
বনচ্ছায়ায় কবিতার পুঁথি পাই যদি একখানি,
পাই যদি এক পাত্র মদিরা আর যদি তুমি রানি,
সে বিজনে মোর পার্শ্বে বসিয়া গাহো গো মধুর গান
বিজন হইবে স্বর্গ আমার তৃপ্তি লভিবে প্রাণ ॥
—সত্যেন দত্ত
সে নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়া
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়।
মৌন ভাঙি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর
সেই তো সখী স্বর্গ আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর।
—কান্তি ঘোষ
৪. খৈয়াম ও নজরুল ইসলাম কৃত তার অনুবাদ নিয়ে আমরা অন্যত্র আলোচনা করেছি।
জাতীয় সংহতি
মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়।
এই যে ফারসি নামক ভাষা এটি সাতশো বছর ধরে ভারতের রাষ্ট্রভাষা ছিল। যদিও পাঠান ও মোগল কারওরই মাতৃভাষা ফারসি ছিল না। শেষ বাদশা বাহাদুর শা বাদশার অন্তঃপুরেও তুর্কি বলা হত। যদিও রাজদরবারে ফারসি চলত, কিন্তু কবিসম্মেলনে প্রধানত উর্দু।
ইংরেজও প্রথম একশো বছর এ দেশে ফারসি দিয়েই কাজ চালায়। ১৮৪০-এর কাছাকাছি একদিন তারা ফারসি নাকচ করে দিয়ে ইংরেজি চালাল। যে হিন্দু কায়স্থরা একদা অত্যুত্তম ফারসি শিখে পদস্থ রাজকর্মচারী হতেন, তারা ৫০/৬০ বছরের ভিতর ফারসি বেবাক ভুলে গিয়ে ইংরেজির মাধ্যমে রাজকর্ম চালিয়ে যেতে লাগলেন। অনেকের মুখে শুনি, কলকাতা হাইকোর্টে নাকি এখনও তাদের প্রাধান্য অতুলনীয়। বাদবাকি ভারতবর্ষে এখন ক-জন লোক ফারসি জানেন সেটা বের করতে হলে দিনের বেলাও লণ্ঠন নিয়ে বেরুতে হয়। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই কথা হচ্ছে। অবশ্য এই দুই সম্প্রদায়েরই যারা উর্দুর শক্ত গোড়াপত্তন করতে চান তারা ফারসি শেখেন– বাঙালি যেমন আপন বাঙলাকে জোরদার করতে হলে সংস্কৃত শেখে।
