অনুকরণ করুন এই গল্পটির। কিংবা আরম্ভ করুন অন্যভাবে।
যেমন মনে করুন আপনার প্রিয়া সর্বাংশে আপনার চেয়ে গুণবান একটি লিভার পেয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে গেলেন তার সঙ্গে। আপনি ঘন ঘন উদ্ভ্রান্ত প্রেমে পড়ে হৃদয়বেদনায় মালিশ করছেন, কিন্তু কোনও ফায়দা ওত্রাচ্ছে না। হঠাৎ মনে পড়ল আপনার এক্স-বান্ধবীর এক বান্ধবী আছেন এবং তার সঙ্গে পরিচিত আরেক ভদ্রলোকও আপনার বন্ধু। আপনি ভাবলেন, তাঁদের কাছে গিয়ে আমার দুঃখের কাহিনী কই। দুজনেই বড় দরদী। দুজনাই আপনার আপসাআপসি সাতিশয় মনোযোগ সহকারে শুনলেন। কিন্তু হায়, শেষটায় দেখলেন, ওদের দুজনারই পাকা রায়, আপনাকে কলার খোসাটির মতো রাস্তায় ফেলে দিয়ে আপনার প্রিয়া অতিশয় বিচক্ষণার কর্ম করেছেন।
এটা আপনি ব্যঙ্গ করে লিখতে পারেন, হাস্যরসে ভর্তি করে লিখতে পারেন, দু-ঘটি চোখের জল ফেলে করুণ রসে ঢেলে বানিয়ে লিখতে পারেন, যৌনবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ দিয়েও লিখতে পারেন কিন্তু আপনি চেখ হবেন তখনই যখন পাঠক পড়ে মনে করবে এটি একান্ত আপনারই অভিজ্ঞতা। অথচ আপনার এই নিদারুণ অভিজ্ঞতা আদপেই হয়নি, আমার কাছে প্লটটি শুনে, এবং চেখফের কোচম্যানের গল্পটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছেন মাত্র।
এবারে টেকনিকাল দিক।
এখানে এসে সর্ব আলঙ্কারিকের ওয়াটারলু।
রস কী, এস্থলে কথাসাহিত্যে কী সে বস্তু যা আমার মনে কলারসের সঞ্চার করে– সেখানে যদি-বা কোনও গতিকে সংজ্ঞাবদ্ধ বর্ণনা করা যায়, তবু করা যায় না রস কোন উপাদানে, কোন প্রক্রিয়ায়!
কাজেই আমি সামান্য দুটি নির্দেশ দেব।
প্রথম বাকসংযম। সে বলে বিস্তর মিছা যে বলে বিস্তর–বলেছেন ভারতচন্দ্র। এ-স্থলে সে রচে নীরস রস যে বলে বিস্তর।
এখানে চীনা চিত্রকরদের কথা স্মরণে আনবেন। পাঁচটি আঁচড়ে আঁকা বাঁশের মগডালে একটি পাতা– আপনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন পাতাটি ফর ফর করছে। তিনটি আঁচড়ে আঁকা একটি উড়ন্ত হাঁস। আপনি দেখতে পেলেন যেন নীলাকাশে শরতের সাদা মেঘ ভালো করে তাকানোই যায় না, চোখ ঝলসে দেয়।
তার অর্থ উড়ন্ত হাঁস আঁকার সময় চিত্রকর সম্পূর্ণ হাঁস আঁকেন না। ঠিক কোন কোন জায়গায় বিন্দু ও বক্ররেখা (পইন্ট কার্ভ) দিলে পাঠকের মন নিজেই বাকিটা এঁকে নেবে, পাঠকের চোখ নিজেই বাকিটা দেখে নেবে ঠিক সেই সেই জায়গায় চিত্রকর তুলি ছুঁইয়েছেন।
চেখফও ঠিক তাই করতেন। কয়েকটি পইন্ট ও কার্ভ- শব্দের মারফতে– এমনই ভাবে এঁকে দিয়েছেন যে সম্পূর্ণ ছবিটি চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে। শুধু তাই নয়, এমনই সূক্ষ্ম দানালা ফিলমে তোলা ফটোগ্রাফ যে, যার যেমন কল্পনার লেন্স্ সে তেমনি বিরাট আকারে সেটিকে এনলার্জ করতে পারে। কোচম্যান চেষ্টা করেছিল তিন না চার টাইপের সোয়ারির কাছে তার হৃদয়বেদনা প্রকাশ করার; আপনি দেখতে পাবেন সে তাবৎ মস্কো শহরের লক্ষ লক্ষ নরনারীর হৃদয়দুয়ারে শির হেনে হেনে হতাশ হচ্ছে। আর সেই দরদী ঘোড়ার গার শব্দ যে শুধু শুনতে পাবেন তাই নয়, শুনতে পাবেন সে যেন বহু আবেগ থেকেই কোচম্যানকে বলছে, কেন তুমি আজেবাজে লোকের কাছে এসব দুঃখের কথা বলতে যাও? কে বুঝবে তোমার হৃদয়-বেদনা? সবাই আপন স্বার্থ নিয়ে মগ্ন। বল আমাকে। হাল্কা হবে। তার পর হয়তো আপন মনে বলছে, জানি তো সবই। কিন্তু হায় করি কী? এ যে ভগবানের মার।
গুণীরা বলেন সর্বনিম্নে জড়জগৎ, তার পর তৃণজগৎ, তার পর পশুজগৎ– সর্বোচ্চে মানুষ। চেখফের গল্পটি পড়ার পর মত পালটাতে হয়।
এস্থলেই ক্ষান্ত হোক আমার অক্ষম লেখনীর ক্ষীণ প্রচেষ্টা।
এইবার পড়ুন চেখফের একটি গল্পের বাঙলা অনুবাদ। অনুবাদটি করেছেন আমারই অনুরোধে, আমার সখা মৌলানা খাফী খান। যদৃষ্টং এবং প্রিয়াঙ্গীর লেখক।
খৈয়ামের নবীন ইরানি সংস্করণ
গিয়াস্-উদ্-দীন আবুল ফহ্ ওমর ইবন্ ইব্রাহিম অল খৈয়াম প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে সুপরিচিত। তাকে নিয়ে ইরানের ভিতরে-বাইরে সর্বত্র আজও পূর্ণোদ্যমে নানাপ্রকারে গবেষণা চলছে। এবং অত্যধিক গবেষণার মন্থনে যে বিষ ওঠে, তা-ও দেখা দিয়েছে। কোনও কোনও জর্মন গবেষক বলেন, খৈয়াম নামক জনৈক বৈজ্ঞানিক ছিলেন, কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু সে খৈয়াম কোনও কবিতা রচনা করেননি। জনৈক রুশ গবেষক বলেন, কিন্তু খৈয়ামের ঠিক পরবর্তী যুগের ইতিহাসে যে এই বাক্যটি পাচ্ছি– তিনি খুরাসানের কবিদের অন্যতম– এটার অর্থ কী? তাই বোধহয় জনৈক ভারতীয় পণ্ডিত– তাঁর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বললেও অত্যুক্তি হয় না– মাত্র নয়টি রুবাইয়াৎ(১) (চতুষ্পদী) ওমরের বলে নিঃসন্দেহে স্বীকার করেছেন। অথচ পার্টিশনের পূর্বেও কলকাতার তালতলায় যে বটতলা সংস্করণ খৈয়ামের রুবাইয়াৎ পাওয়া যেত তাতে থাকত প্রায় বারশোটি।(২) তবে অতিশয় এক-নজর ফেললেও ধরা পড়ে, এর শত শত রুবাইয়াৎ ইরানের একাধিক কবির কাব্যসঙ্কলনে বিশেষত হাফিজের ওদেরই নামে চলেছে। কোনও কোনও রুবাঈ (রুবাইয়াতের একবচন) তো পাওয়া যায় দু-তিন-চার কিংবা ততোধিক কবির কাব্যে। এক জর্মন পণ্ডিত তাই এক বিরাট নিঘন্টু (কনকরডেন্স, ক্ৰসূরেফরেন্স সম্বলিত কার্ড ইনডেক্স যা খুশি বলুন) নির্মাণ করেছেন। খৈয়ামের নামে প্রচলিত প্রত্যেকটি রুবাঈ কোন কোন কবির কাব্যে আছে তারই পরিপূর্ণ ফিরিস্তি। টাইমটেবিলের মতো কলামের পর কলাম গেঁথে গেঁথে পাতার পর পাতা।
