চেখফের জীবন সংক্ষিপ্ত ও আদৌ ঘটনাবহুল নহে। যে কটি ছবি আমাদের চোখের সামনে আসে সেগুলোই মধুর। শুধু শেষের চিত্রটি বড় করুণ। রঙ্গমঞ্চ থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে আজীবন বিলাসে লালিতা এই যে অসাধারণ গুণবতী রমণী তাঁর স্বামীর প্রাণরক্ষার জন্য কন্টিনেন্টের খ্যাতনামা স্বাস্থ্যনিবাস থেকে স্বাস্থ্যনিবাস, এক ধন্বন্তরী থেকে অন্য ধন্বন্তরীর পদপ্রান্তে পাগলিনীর মতো ছুটোছুটি করলেন, আপন হৃদয়াবেগ শান্ত মুখের আড়ালে লুকিয়ে রেখে, কত না বিন্দ্ৰি যামিনী স্বামীর শয্যাপাশে কাটালেন, অসীম ধৈর্যে মিশ্রিত অক্ষয় সেবায় ক্ষয়রোগীর প্রতিটি পীড়িত মুহূর্তের যন্ত্রণাভার লাঘব করলেন– এ ছবিটি একাধিক রুশ লেখক এঁকেছেন।
টলস্টয়ের বৃদ্ধ বয়সে চেখফের তিরোধান তার বুকে বড় বেজেছিল– চেখফকে তিনি কতখানি স্নেহ করতেন সে-কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। গোর্কি তখন লেখেন চেখফ সম্বন্ধে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। ইয়াসানা পলিয়ানাতে এই ত্রিমূর্তির আলাপ-আলোচনা, হৃদ্যতার আদান-প্রদান সম্বন্ধে অত্যন্ত মনোরম একাধিক প্রবন্ধ রুশ ভাষায় বেরিয়েছে। চেখ স্বয়ং তার নোটবুকে কিছু কিছু লিখে গিয়েছেন। টলস্টয়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অকৃত্রিম। অবশ্য সে শ্রদ্ধা তাকে মোহাচ্ছন্ন করতে পারেনি। মাত্র অল্প কিছুদিনের জন্য তিনি টলস্টয়ের নীতিমূলক (স্টোরি উইথ এ মরাল) গল্পের অনুকরণ করেছিলেন। কিন্তু রিয়েল আর্টিস্ট (টলস্টয়ের ভাষায়) তো বেশিদিন অন্যের পথে চলতে পারে না- তা সে-পথ যতই শান-বাঁধানো প্রশস্ত হোক না কেন।
গোর্কি তাঁর নাট্যরচনায় চেখফের অনুকরণ করেছেন। এস্থলে পাঠক-পাঠিকার স্মরণার্থে উল্লেখ করি–
টলস্টয় : জন্ম ১৮২৮ মৃত্যু ১৯১০
চেখফ : ১৮৬০ ১৯০৪
গোর্কি : ১৮৬৮ ১৯৩৬
চেখফ আমাকে এমনই মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছেন যে, তাঁর সম্বন্ধে আমি এক যুগ ধরে লিখে যেতে পারি। তাঁর প্রতিটি গল্পের টীকা লিখতে লিখতেই আমার বাকি জীবন কেটে যাবে। অথচ এই প্রবন্ধ শেষ করতে হবে, এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে এটি লিখছি সেটি ভুললেও চলবে না।
পূর্বেই বলেছি, বঙ্গসাহিত্যে আমি যশস্বী লেখক নই, কিন্তু পপুলার বটি। সেই কারণেই বোধহয়, আমি কিছু অনুরোধ পেয়েছি, পত্র-লেখকদের জানাতে, কোন কোন্ লেখক পড়লে তারা লাভবান হবেন। বিদায় নেবার প্রাক্কালে নিবেদন, ছোটগল্প দিয়েই সাহিত্যিক জীবন আরম্ভ করা প্রশস্ত এবং সম্মুখে চেখফের ফটোগ্রাফ টাঙিয়ে নিয়ে। এমনকি যারা পরবর্তীকালে উপন্যাস লিখবেন তারাও চেখফ চেখে, শুঁকে, সর্বাঙ্গে মেখে উপকৃত হবেন। এ প্রবন্ধটি তাদেরই উদ্দেশে লেখা।
কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি, রুশ সাহিত্যে চেখফের অনুকরণ করেছেন অনেকেই, কিন্তু টলস্টয়-ঘরানা, ডস্টয়েফস্কি-ঘরানার মতো চেখফ-ঘরানা কখনও নির্মিত হয়নি। তার কারণ চেখফকে অনুকরণ করা অসম্ভব।
তবে সে উপদেশ দিচ্ছি কেন?
কারণ অসম্ভবের চেষ্টা করলেই সম্ভবটা হাতে আসে, সম্ভব হয়।
***
চেখফের আছে কী?
অদ্ভুত সহানুভূতি। সমবেদনা। সহানুভূতি সমবেদনা বললে কমই বলা হয়। মপাসাঁর বুল দ্য সুইফ (চর্বির গোলা, এ বল অব্ ফ্যাট) যখন ঘোড়াগাড়িতে ফিরে অঝোরে কাঁদছে তখন মপাসাঁও সঙ্গে সঙ্গে কাঁদছেন কিন্তু চেখক যখন তাঁর কোচম্যানের দুঃখের কাহিনী বলেন তখন মনে হয় তিনি স্বয়ংই যেন সেই কোচম্যান।
গল্পটির প্লট এতই সরল যে কয়েক ছত্রে বলা যায়। এক ছ্যাকড়াগাড়ির কোচম্যান শহরে গাড়ি খাটায়, একমাত্র ছেলে থাকে গ্রামে। হঠাৎ খবর পেল তার সে জোয়ান ছেলে মারা গিয়েছে। বুড়োর তিন কুলে কেউ নেই যাকে সে তার দুঃখের কাহিনী বলে। পেটের ধান্দায় বেরোতে হয়েছে গাড়ি নিয়ে। উঠেছে এক সোয়ারি। বুড়ো কোচম্যান আস্তে আস্তে আলাপচারী জমিয়ে যখন তার পুত্রশোকের কাহিনী বলতে যাবে, তখন ঘাড় ফিরিয়ে দেখে সোয়ারি ঘুমিয়ে পড়েছে। থামতে হল। তার পর উঠলেন এক জেনারেল। জলদি চল, জলদি চল আর ধমকের চোটে সে তার কাহিনী আরম্ভ করেও শেষ করতে পারল না। তার পর উঠল জনাতিনেক ছাত্র। তাদের হৈ-হল্লার মাঝখানে বুড়ো কোনও পাত্তাই পেল না। তার পর উঠলেন আর এক ভদ্রলোক ভারি দরদী। তাকে যখন দুঃখের কাহিনী বলতে বলতে পুত্রের মৃত্যুসংবাদটা দেবে ঠিক তখনই তিনি বলে উঠলেন, থ্যাঙ্ক গড়। ওই আমার বাড়ি পৌঁছে গিয়েছি। বলা হল না। রাত তখন ঘনিয়ে এসেছে। বুড়ো বাড়ি ফিরল। ঘোড়াটাকে দানা দিয়ে ডলাই-মলাই করতে করতে আপন মনে বিড়বিড় করতে লাগল, তোকে কি আর আমি ভালো করে ডলাই-মলাই করতে পারি, বাছা। বুড়ো হাড়ে আর কি আমার তাগত আছে? থাকত আমার ছেলে! তাকে তো তুই চিনিসনে। হ্যাঁ, তার ছিল গায়ে জোর। হ্যাঁ, সত্যি বলছি। সে যদি থাকত আজ, তবে বুঝিয়ে দিত ডলাই-মলাই কারে কয়। ঘোড়াটা আপন খেয়ালে গরুগরু করে নাক দিয়ে শব্দ ছাড়ল। কেমন যেন দরদভরা– অন্তত বুড়োর তাই মনে হল।
তখন– তখন বুড়ো ঘোড়াটাকে তার শোকের কাহিনী বলে দিল।৮ [*গল্পটির প্লট আমার ঠিক ঠিক মনে নেই, তবে হরেদরে এই।]
যতবার গল্পটি পড়ি চোখে জল ভরে আসে– এখন আরও বেশি, কারণ আমার বয়স ওই কোচম্যানেরই কাছাকাছি… আর মনে হয়, কে বলে চেখফ ডাক্তার ছিলেন, কে বলে তিনি রূপসী অভিনেত্রী বিয়ে করেছিলেন, কে বলে তিনি টলস্টয়ের বন্ধু? তিনি নিশ্চয় ছিলেন। ওই কোচম্যান।
