টলস্টয় বলেন, যে বই সর্বযুগে সর্ববয়সের লোক পড়ে আনন্দ পায় সেই বই-ই উত্তম বই। সেরকম বই ইহসংসারে অতিশয় বিরল। টলস্টয় মহাভারতের নাম করেছেন। আমরা সম্পূর্ণ একমত। (তিনি তাঁর নিজের বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস যুদ্ধ ও শান্তির নিন্দা করেছেন। আমরা একমত নই)।
অতি অল্প লেখককেই টলস্টয় আর্টিস্ট বা সৃষ্টিকর্তারূপে স্বীকার করেছেন। চেখফ তাদেরই একজন* [*টলস্টয় চেখকে এত গভীরভাবে ভালোবাসতেন যে, একদিন টলস্টয়ের বাড়ি ইয়াসানা পলিয়ানাতে যখন তিনি আর গোর্কি বসে গল্প করছেন তখন চেখ বাগানের অন্য প্রান্ত দিয়ে চলে যাচ্ছেন দেখে টলস্টয় গোর্কিকে বলেন, জানো গোর্কি, চেখফ যদি মেয়েছেলে হত তবে আমি ওকে বিয়ে না করে থাকতে পারতুম না। যারা বর্তমান লেখকের অত্যধিক বাগাড়ম্বর অপছন্দ করেন, তারা বাকি প্রবন্ধ না পড়ে সোজা চেখফের দুলালী গল্পের অনুবাদে চলে যাবেন।] তাকে তিনি বলেছেন, রিয়েল আর্টিস্ট;- পাঠক সেটি পরে সবিস্তর শুনতে পাবেন।
চেখফের দিকে তাকিয়ে আমার বিস্ময়ের অন্ত নেই।
প্রথম ছবি দেখি, রুশের এক গগ্রামে ঘরের ছেলে চেখফ গাঁয়ের পাঁচজন মাতব্বরের চালচলন কথাবার্তার ভঙ্গির অনুকরণ করে বাড়ির পাঁচজনকে হাসাচ্ছে। আবার সঙ্গে সঙ্গে সে ক্লাসের সর্দার পড়ুয়াও বটে।
তার পরের ছবি দেখি মস্কোতে। গরিব পরিবারে। একটা ছোট্ট ঘরে মা কচুঘেঁচু রাধছেন, বাবা অর্থাভাবের কথা চিন্তা করে আপন মনে গজগজ করছেন, ভাইবোনেরা কিচিরমিচির করছে, আর মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র চেখ– বয়স উনিশ– তারই এককোণে, হট্টগোল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, খস্ খস্ করে পাতার পর পাতা ফার্স লিখে যাচ্ছেন। তিনি জানেন, খুব ভালো করেই জানেন, রসিকতাগুলো কাঁচা, কিন্তু তার চেয়েও ভালো করেই জানেন, খবরের কাগজের গ্রাহক রামাশামা এ ধরনের রসিকতাই পছন্দ করে, সম্পাদকমশাইও সেই মালই চান। লেখা শেষ হল। রান্না তখনও শেষ হয়নি। চেখক ছোট ভাইকে বললেন, লেখাটা নিয়ে যা তো অমুক পত্রিকার আপিসে। দু-পাঁচ টাকা যদি দেয় তবে কিন্তু কাবাব-টাবাব কিনে আনিস। কচুঘেঁচু গেলার সুবিধে হবে।
এর পাঁচ বছর পর চেখফ মেডিকেল কলেজ পাস করলেন।
কিন্তু ভালো করে প্র্যাকটিস করা চেখফের আর হয়ে উঠল না। ইতিমধ্যে রুশদেশ জেনে গিয়েছে, চেখফের সার্জিকাল ছুরির চেয়ে তার কলমের ধার বেশি। তবু সরকার তাঁকে পাঠালেন সাখেলিন দ্বীপের কয়েদিদের সম্বন্ধে মেডিকেল তদন্ত করতে। সে রিপোর্ট তিনি এমনই বুক-ফাটানো জোরালো ভাষায় লিখেছিলেন যে, তারই ফলে সরকার কয়েদিদের জন্য বহু সুব্যবস্থা অবলম্বন করলেন। এ রিপোর্টখানা আমি কিছুতেই সংগ্রহ করে উঠতে পারিনি। আমার বড় বাসনা ছিল দেখবার, সাহিত্যিক যখন মেডিকেল রিপোর্ট লেখে তখন তার কলমফ কীভাবে চালায়? সংযত করে? যাতে করে লোকে না ভাবে সাহিত্যিক তার হৃদয়-উচ্ছ্বাস দিয়ে তথ্যের দীনতা ঢাকতে চেয়েছে– কেসে পয়েন্ট না থাকলে উকিল যে-রকম গরম লেকচার ঝাড়ে আর টেবিল থাবড়ায়। কিংবা তার জোরদার কলমফ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে? কিংবা উভয়ের অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে? রবীন্দ্রনাথ যখন সভ্যতার সংকট লিখেছিলেন তখন তার লেখনে কতখানি রাষ্ট্রদর্শন আর কতখানি কবির তীব্র হৃদয়-বেদনার পরিপূর্ণ প্রকাশ!
তার পর একবার লেগে যায় রুশ দেশে জোর কলেরা। সেই এক বছর চেখফ ডাক্তারি করেন প্রাণপণ। ব্যস।
খাস পশ্চিমের লোক বয়েস হওয়ার পর বিয়ে-শাদি করে কস্মিনকালেও বাপ-মায়ের সঙ্গে বসবাস করে না। ভিন্ন সংসার পাতে। রুশদেশ বোধহয় কিছুটা প্রাচ্যের আমেজ ধরে।
কিছুটা প্রতিষ্ঠা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই চেখফ গ্রামাঞ্চলে কিঞ্চিৎ জমিজমা ও ছোট্ট একটি বসতবাড়ি কিনলেন। বাপ-মায়ের সঙ্গে সেখানে ছ-টি বছর চেখফ বড় আনন্দে কাটালেন। চেখফের সমগোত্রীয় আরেকজন অতিশয় দরদী লেখক, আলফঁস দোদেও ঠিক ওইরকমই মোটামুটি ওই সময়েই অসুরের মতো খেটে পয়সা রোজগার করে গরিব বাপ-মাকে গ্রাম থেকে এনে প্যারিসে আরামে রেখেছিলেন। জীবনের এই ছ-টি বছর চেখফের বড় শান্তি আর আনন্দের মধ্যে কাটে। এর পরই দেখা দিল তার শরীরে ক্ষয়রোগের চিহ্ন এবং বাকি জীবনের অধিকাংশ তাঁকে কাটাতে হয় ক্রিমিয়ার স্বাস্থ্যনিবাসে, সমুদ্রপারে। চেখফের বয়স তখন একচল্লিশ। তার ক্ষয়রোগের কথা জেনেশুনেও তারই নাট্যের অসাধারণ সুন্দরী এক অভিনেত্রী তাকে বিয়ে করেন। তিন বছর পর খ্যাতির মধ্যগগনে চেখ-ভাস্কর অস্ত গেল। দাম্পত্য জীবনে সুখ বলতে তার স্ত্রী পেয়েছিলেন স্বামীকে সেবা করার আনন্দ। অভিনেত্রীদের চরিত্র সম্বন্ধে নানা লোকে নানা কথা কয়। তাই বলে নেওয়া ভালো, চেখফের স্ত্রী বিধবা হওয়ার পর বাকি জীবন নির্জনে অতিবাহিত করেন। মডার্ন গল্প-উপন্যাসের পাঠক-পাঠিকারা বোধহয় তাজ্জব মানবেন। চেখফের বিধবা তখন যুবতী। রুশে বিধবাবিবাহ নিন্দনীয় তো নয়ই, যুবতী বিধবা পুনরায় বিয়ে না করলে তাকে আহাম্মুখ আখ্যা দেওয়া হয়। মা হওয়ার গৌরব থেকে তিনি নিজেকে বঞ্চিত করলেন। তিনি ত্যাগ ও প্রেমের নিষ্ঠায় বিশ্বাস করতেন। এ কথাটা বলতে হল চেখফ-চরিত্র বোঝাবার জন্য। তিনি নিশ্চয়ই এমনই গভীর প্রেম দিয়ে তার স্ত্রীর জীবন উদ্দীপ্ত করে দিয়েছিলেন যে, সেই দীপ্ত দীক্ষায় প্রজ্বলিত তাঁর প্রেম-প্রদীপ চেখফের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাপিত হল না। তারই অনির্বাণ বহ্নিতে তার ভবিষ্যতের পথ আলোকিত হয়ে রইল।
