চীন আমাদের সমূলে ধ্বংস করে এ দেশে চীনা চাষাভূষোর বসত করতে চায়নি কিন্তু চীনের অন্যতম ওয়ার এ ছিল এদেশে কম্যুনিস্ট রাজ বসানো। চীন আশা করেছিল সে ভারতে হামলা দেওয়া মাত্রই এদেশের কম্যুনিস্টরা দেশের জনসাধারণকে তাতিয়ে কমুনিস্ট রাষ্ট্র বসাতে পারবে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, সেটা হল না। এমনকি অনেক খাঁটি কম্যুনিস্ট, চীনের এ আচরণে অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছেন এবং অনেকেই পণ্ডিতজির ঝাণ্ডার নিচে এসে দাঁড়িয়েছেন আর খ্রশ্চভপন্থীরা তো রীতিমতো উন্মা প্রকাশ করেছেন।
স্মরণ রাখা উচিত, চীনাদের এ ওয়ার এম উপস্থিত মুলতবি থাকলেও সেটাকে সে কখনও বর্জন করবে না। আমাদের তার জন্য হুশিয়ার হয়ে থাকতে হবে–হয়তো-বা বহু বছর ধরে।
আমাদের মনে হয় চীন চায় আমাদের পঙ্গু করে রাখতে। প্রাচ্য দেশের দুই বিরাট ভূখণ্ড চীন এবং ভারত। ভারত কম্যুনিস্ট না হলেও দেশের ধনদৌলত বাড়াতে চেয়েছে, আর চীন কম্যুনিজমের মাধ্যমে। এবং চীন যে বিশেষ সফল হয়নি এ কথা বিশ্বসুদ্ধ সবাই জেনে গিয়েছে। পক্ষান্তরে আমরা যে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছি সে-ও জানা কথা। আখেরে তা হলে আমরাই প্রাচ্য দেশগুলোর নেতৃস্থানীয় হব। চীনের কর্তারা এটা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছেন না।
তাই তাঁদের মতলব আমরা যেন আমাদের ধনদৌলত বাড়ানো বন্ধ করে বন্দুক-কামানের দিকে মন দিই। তাই নিয়ে চীনের কোনও আশঙ্কা নেই, কারণ চীন বিলক্ষণ জানে, আমাদের বন্দুক-কামান যতই বাড়ুক না কেন, আমরা কখনও চীন আক্রমণ করব না। মাঝের থেকে বন্ধ্যা বন্দুক-কামানের সেবা করে আমাদের ধনদৌলত বৃদ্ধি ক্ষান্ত হবে।
দুঃখের বিষয়, আমাদের বন্দুক-কামান বাড়াতে হবে।
কিন্তু আমাদের ওয়ার এ চীনার বিনাশ-সাধন নয়। আমাদের ওয়ার এম্ অত্যন্ত লিমিটেড সঙ্কটকালে আক্রমণকারীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা। এবং ভবিষ্যতে যেন সে দম্ভভরে পুনরায় আক্রমণ করার সাহস না পায়, তার জন্যে বেশ কয়েক বছর ধরে বন্দুক-কামান বানাতে হবে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে গরিব-দুঃখীর মুখে অন্ন তুলে দেবার জন্য আমাদের ধনদৌলতও বাড়াতে হবে।
তাই বলছিলুম, রাধব এবং চুলও বাঁধব।
———-
১. ২. ফলবান্ বংশের–বাঁশের ফল হইলে বাঁশ মরিয়া যায়। অনুবাদকের টীকা। কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ। বসুমতী।
৩. আজকের দিনের উয়োর-বনড, ডিফেন্স সার্টিফিকেট।
৪. ধন উৎপাদনের একমাত্র পন্থা, প্রোডাকশন্ বাড়ানো। অর্থাৎ ইন্ডাসট্রিয়াল ও এগ্রিকালচরল তৈজসপত্র বাড়ানো। না হলে শুধুমাত্র ধনে সর্ব সমস্যার সমাধান হয় না। কথিত আছে, বর্বর মঙ্গলরা যখন প্রবল প্রতাপশালী আব্বাসী খলিফার রাজধানী বাগদাদ দখল করে খলিফাঁকেও বন্দি করতে সক্ষম হল, তখন মঙ্গল সেনাধ্যক্ষ খলিফাঁকে নিমন্ত্রণ করলেন। ভোজনের জন্য খলিফার সামনে রাখলেন থালা থালা সোনা-জহরত। নিজের সামনে রাখলেন উত্তম উত্তম আহারাদি। খেতে খেতে খলিফাঁকে শুধালেন, হুজুর, খাচ্ছেন না কেন? হুজুর চুপ করে রইলেন। পুনরায় সেই প্রশ্ন। পুনরায় নো রিপ্লাই। তৃতীয় বারে নিরুপায় হয়ে খলিফা বললেন, এগুলো তো খাবার জিনিস নয়। মঙ্গল বললেন, সে কী হুজুর, আপনার রাজত্ব জয় করবার পর আপনার ধনাগার বোঝাই পেলুম এইসব সোনা-জহর। ভাবলুম এগুলো বুঝি আপনি খান। অন্য কোনও কাজে লাগাননি তাই।
অর্থাৎ, শুধু ধন দিয়ে সবকিছু হয় না।
তা হলে ধনী লোকের বাড়িতে ডাকাতি হত না।
হিটলার কী আদর্শ নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন সেটা জানবার আমাদের প্রয়োজন নেই, কিন্তু সম্পূর্ণ দেউলে রাষ্ট্রকে তিনি কী করে জোরদার করলেন সেটা জানা উচিত। তিনিও বলেছিলেন, আমার ব্যাংকে সোনা-জহর নেই। বয়ে গেল। আমি চাই জোয়ান মেয়েম। যারা উৎপাদন করতে পারে। আপন বাহুবলে। আমি রাজা, তখন সেগুলো কিনব। তাই ভীষ্মদেব ধন উৎপাদনের আদেশ দিয়েছিলেন।
কবিরাজ চেখফ
উত্তম গুরুর সদুপদেশ পেলেই যদি সার্থক লেখক সৃষ্টি হতেন তবে ইহ-সংসারে আমাদের আর কোনও দুর্ভাবনা থাকত না। কারণ আমার বিশ্বাস, এতাবৎ বহুতর গুরু অপ্রচুর পুস্তকে নানাবিধ সদুপদেশ দিয়ে গিয়েছেন, এবং সদুপদেশ-তিয়াষী তরুণ সাহিত্যযশাভিলাষীরও অনটন এই বঙ্গদেশে নেই।
আমি সার্থক সাহিত্যিক নই, তবে কিছুটা লোকায়ত (জনপ্রিয় বললে বড় বেশি দম্ভভাষণ হয়ে যায়) বটি। ট্রেনে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর তিনি সোল্লাসে বলেছিলেন, আপনার লেখা পড়লেই পাঁচকড়ি দের কথা আমার মনে আসে।
আমি সাতিশয় শ্লাঘা অনুভব করেছিলুম। আমি জানি আপনারা পাঁচজন পাঁচকড়িকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন না। যদিও শুধোই, বুকে হাত দিয়ে উত্তর দিন তো, পনেরো বছর বয়সে পাঁচকড়ি পড়ে আপনার পঞ্চেন্দ্রিয়াস্তম্ভন হয়নি? আপনার চৈতন্যকে এরকম সূক্ষ্ম, তীক্ষ্ণ একাগ্ৰমনা করতে পেরেছেন ক-জন লেখক এবং স্বয়ং গীতা বলেন, চৈতন্যকে সর্বপ্রথম নিষ্কম্প প্রদীপশিখার ন্যায় একাগ্র করে তবে ধ্যানলোকে প্রবেশ করবে। স্বয়ং পতঞ্জলিও বলেন, ধ্যানের বিষয়বস্তু অবান্তর। তা সে যাক্। আসল কথা সে বয়সে পাঁচকড়ি আপনাকে এমনি একাগ্ৰমনা করে দিয়েছিলেন যে, আপনি তখন দেশকালপাত্র ভুলে গিয়েছিলেন। এবং এটা যে আর্টের অন্যতম লক্ষণ সেটি সর্বজনবিদিত। তা হলে আজ আপনি পাঁচকড়ির নামে নাক সেঁটকান কেন? পাঁচকড়ি পড়ার পূর্বে সাত বছর বয়েসে আপনি রূপকথা পড়েছিলেন, আজ পড়েন না, কিন্তু তাই বলে তো আপনি ওর পানে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হাসেন না, কেন?
