এই অভিজ্ঞতা-সঞ্চয়ের ব্যাপারে আরেকটা জিনিস মনে পড়ল– সে বড় মজার। ইয়োরোপে যে কোনও চিত্রকরের বাড়িতে নিত্যনতুন রমণী মডেল হয়ে আসছে। তারা বিবসনা হয়ে পোজ দেয়। কেউ কিছু বলে না। ওটা নাকি ওদের দরকার। চিত্রকরদের সবাই যে ভীষ্মদেব, শুকদেব ঠাকুর নন সে কথাও সবাই জানে। বস্তুত কোনও চিত্রকর যদি একটুখানি শুকদেবীয় হন তবে তার তাবৎ জীবনীকার সেটা চিৎকার করে বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়ে দিয়ে আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দেন। বাদবাকিদের কেউ গালমন্দ করে না। ওই যে বললুম, ওটা নাকি ওদের দরকার।
এদেশে গুরুমহারাজদের এ অধিকার আছে। ভৈরবী, নর্মসখীরূপে এঁরা গুরুমহারাজদের সাধন-সঙ্গিনী হন। এ প্রথা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত।
কিন্তু যদি ইয়োরোপের পাদ্রিসাহেব ভৈরবী ধরেন তবে তাকে তিন দিনও সমাজে টিকতে হবে না। এদেশের গেরস্তপাড়ায় কোনও আর্টিস্টকে মডেলসহ বাস করতে দেবে না।
আমি কোনও ব্যবস্থার নিন্দা বা প্রশংসা করছিনে। সাহিত্যিক হিসেবে সে অধিকার আমার নেই। এর বিচার করবে সমাজ। সমাজ গুরু চায়, চিত্রকর চায়, সাহিত্যিক চায়। সমাজই স্থির করবে, কার কোটাতে অধিকার। সমাজ ভুলও করে। সোক্রোতেসকে বিষ, খ্রিস্টকে ক্রুশ দেয়।
এটা কিছু নতুন কথা নয়। সামান্য একটি আলাদা উদাহরণ দিই। বৈজ্ঞানিকদের সাধ্যি নেই জাহাজ জাহাজ টাকা জোগাড় করে এটম বম বানাবার। মার্কিন সমাজের সর্বপ্রধান মুখপাত্র রোজোভেল্ট দেশের টাকা বৈজ্ঞানিকদের পায়ে ঢেলে দিয়ে বললেন, ওটা আমার চাই। বৈজ্ঞানিকরা তৈরি করে দিলেন। ওটা জাপানে ফেলা হবে কি না, সেটা স্থির করলেন ট্রমান বৈজ্ঞানিকদের হাতে সে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত করার ভার দেওয়া হয়নি। তাদের মতামত চাওয়া হয়েছিল মাত্র। এবং শুনলে আশ্চর্য হবেন, বৈজ্ঞানিকদের অধিকাংশই বিপক্ষে মত দিয়েছিলেন।
দার্শনিকদের বেলাও তাই। কেউ হয়তো প্রামাণিক বই লিখে প্রমাণ করলেন, ঈশ্বর নেই। কিন্তু তার সাধ্য কী সে বই স্কুলে স্কুলে কলেজে কলেজে পড়ান! সেটা স্থির করবে সমাজ। কিংবা মনে করুন, বুদ্ধদেব বলেছেন ঈশ্বর নেই। সেটা সিংহল, বর্মার স্কুলে পড়ানো হয়। এদেশে পড়াতে গেলে সমাজ আপত্তি করবে।
কিংবা এই ফিল্মের কথাই নিন। প্রডুসার ডিরেক্টর দর্শক তো স্থির করেন না, কোন্ ফিল্ম দেখানো চলবে আর কোনটা চলবে না। স্থির করে সমাজ সেন্সর বোর্ডের মারফতে। কিন্তু সে আলোচনা উপস্থিত মুলতবি থাক। আপনি কেন সাহিত্যিক হতে চান, সেই কথায় ফিরে যাই।
তা হলে কি আপনি সাহিত্য সৃষ্টি করে খ্যাতি-প্রতিপত্তি সঞ্চয় করতে চান?
প্রতিপত্তি হবে না। সে-কথা গোড়া থেকেই বলে রাখি।
আমি সামান্য লেখক। দেশে-বিদেশে বইখানা প্রাইজ পেয়েছে। আমি তাই নিয়ে গর্ব করছিনে, ঈশ্বর আমার সাক্ষী। নিতান্ত এই প্রতিপত্তির কথা উঠল বলে সে কথাটা বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে। আমার বন্ধুবান্ধব এবং আপনাদের মতো সহৃদয় পাঠক কেউ কেউ বলেন, কাবুলে তো ছিলে মাত্র দু বছর। তবু বইখানা মন্দ হয়নি। জর্মনিতে তো ছিলে অনেক বেশি। সে দেশ সম্বন্ধে ওইরকম একখানা বই লেখ না কেন? আমি ভাবলুম, প্রস্তাবটা খুব মন্দ নয়। মোটামুটি একটা খসড়াও তৈরি করলুম। কিন্তু বিপদ হল হিটলারকে নিয়ে। বিপদ হল ১৯৩৯-৪৪-এর যুদ্ধ নিয়ে। আমি ১৯৩৮-এর পর সেখানে আর যাইনি। আর আজ হিটলার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাদ দিয়ে জর্মনি সম্বন্ধে লেখা, এ যেন মুরারজি দেশাইকে বাদ দিয়ে চৌদ্দ ক্যারেট গোল্ডের কথা লেখা।
তাই মনে করলুম, আরেকবার না হয় হয়েই আসি। কুড়ি বছরের বেশি হতে চলল, বিদেশ যাইনি। হার্টও ট্রাবল দিচ্ছে। জর্মন ডাক্তাররা যদি কিছু একটা ভালো ব্যবস্থা করে দেয়। পাবলিশারদের বললুম কিছু টাকা আগাম দিতে। যাদের অনুরোধ করলুম তাঁরা সোল্লাসে টাকা পাঠালেন– এঁরা সজ্জন।
এবারে ফরেন এক্সচেঞ্জ বা বিদেশি মুদ্রার পালা।
উত্তর এল, ফেলেট ননা– তিন না চার লাইনে, ঠিক মনে নেই।
কোথায় রইল প্রতিপত্তি? কোথায় রইল খ্যাতির মূল্য? আমি যেতে চাইছিলুম নিজের টাকায় সরকারের টাকায় নয়। বলুন তো, ক-জন বাঙালি লেখক নিজের টাকায় (অবশ্য সেই আগাম টাকা নেওয়ার ফলে নির্ভর করতে হবে আমার চাকরির মাইনের ওপর) বিদেশ যেতে পারে? যে পারল সে-ও সুযোগ পেল না।
পাঠক ভাববেন না, আমি কর্তৃপক্ষকে দোষ দিচ্ছি। মোটেই না। তারা তো আমার দুশমন নন। তাঁরা যা ন্যায্য মনে করেছেন তাই করেছেন।
আমি বলতে চাই, কোথায় রইল লেখকের প্রতিপত্তি! আমি চেয়েছিলুম, কুলে দু হাজার টাকার বিদেশি মুদ্রা। আমার প্রতিপত্তির মূল্য তা হলে দু হাজার টাকাও নয়। অবশ্য এতে আমার দুঃখিত হওয়া অত্যন্ত অনুচিত। স্বয়ং যিশুখ্রিস্টকে ধরিয়ে দিয়েছিল তাঁর শিষ্য জুডা ত্রিশটি মুদ্রার বিনিময়ে!
ঈষৎ অবান্তর হলেও বলি, তবু আমি গিয়েছিলুম। জানেন তো, নেড়ের গো। পকেটে ছিল পঞ্চাশ না ষাটটি জর্মন মুদ্রা। সেখানে চলল কী করে? ওহ! সেখানে আমার কিঞ্চিৎ প্রতিপত্তি আছে। তবে কি জর্মনরা খুব বাঙলা বই পড়ে? মোটেই না। তবে আমার প্রতিপত্তি অন্য বাবদে এবং সেটা এস্থলে সম্পূর্ণ অবান্তর। ধরে নিন, আমি সার্কাসের দড়ির উপর নাচতে পারিনা, সেটা বিশ্বাস হল না, আমার কোমরে বাত বলে?– তা হলে ধরুন, আমি হত্তনের পঞ্জাকে হত্তনের গোলাম বানাতে পারি।
