এই তো গেল প্রতিপত্তির কথা। এবারে খ্যাতি। আমার খ্যাতি অত্যল্প, তাই আমার কথা তুলব না। আমার ইয়ার পাহাড়ী সান্যালের (ওহ! বলতে গর্বে বুকটা কী রকম ফুলে উঠেছে!) খ্যাতি সম্বন্ধে তো আপনাদের কোনও সন্দেহ নেই। তাকে গিয়ে শুধান, সে কী আরামে আছে। অত্যন্ত গোবেচারী লোক– অন্তত আমার যদুর জানা– দুটি পয়সা কামিয়ে, কোনও ভালো হোটেলে ইয়ার বক্সিসহ একটুখানি মুর্গি-কারি খেয়ে পান চিবোতে চিবোতে–তার পানের ঝাঁপিটি দেখেছেন তো বাড়ি যাবে। শুধান গিয়ে তাকে, হোটেলে বসামাত্রই আকছারই তার কী অবস্থা হয়।
অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ, গুষ্টির পিগ্রিাফ কী চায় না লোকে তার কাছ থেকে! গোড়ায় আমি জানতুম না। আমার এক ভাগ্নের জন্য চাইলুম অটোগ্রাফ। সে যা করুণ নয়নে তাকাল– ভাবখানা এ টু ব্রুটি!–যে আমার দয়া হল। তাড়াতাড়ি বললুম, না, না, থাক।
বেশ কিছুদিন তাকে দেখিনি। তার কারণ অবশ্য, আমার নিবাস মফস্বলে। শহরে গিয়েছি। রেস্ত কম। তাই বসেছি তন্দুরি মুর্গির হোটেলে একলা-একলা। মুর্গিটা খেয়ে প্রায় শেষ করেছি এমন সময় গলকম্বল মানমুনিয়া দাড়ি সমেত সমুখে দাঁড়ালেন এক মহারাজ। আমার মুখে বোধহয় কিঞ্চিৎ বিরক্তি ফুটে উঠেছিল। লোকটাও রস্টিক, হোটেলে এত টেবিল খালি থাকতে আমার সামনের চেয়ারখানায় ধপ করে বসে পড়বেন কেন?
শুধাল, কেমন আছ ভাই?
আরে! এ যে পাহাড়ী। দাড়ি-ফাড়ি নিয়ে এদ্দিন বাদে খাঁটি পাহাড়ী বনল। বললুম, খুলে কও।
কাতর কণ্ঠে বললে, আর কী উপায়, বল!
আমি দরদী গলায় বললুম, বড় পাওনাদার লেগেছে বুঝি?
পাহাড়ী খাসা উর্দু বলে। সে-ও বলে বেড়ায়, আমি ভালো উর্দু বলতে পারি। এই করে আমার নিজের জন্য বেশ একটা সুনাম কিনে ফেলেছি।
পাহাড়ী বললে, তওবা, তওবা। ওয়াস্তা ফিরুল্লা। পাওনাদার হলেও না হয় বুঝতুম। আর সে কি আমার নেই? এন্তের। কিন্তু তারা ভদ্রলোক। খাবার সময় উৎপাত করে না।
বুঝলুম, মামেলা ঝামেলাময়। বললুম, তা তুমি এক কাজ কর না কেন? এডমায়ারারদের কেউ ধরলে বল না কেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, মিলটা ধরেছেন ঠিকই। তবে আমি পাহাড়ী সান্যাল নই, আমি তার ছোট ভাই, আমার নাম জংলী সান্যাল। দাড়িটাই অবশ্য জংগলীর ইন্সপিরিন জুটিয়েছিল।
ঠাণ্ডি সাঁস লেকর অর্থাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে– পাহাড়ী ফরাসিতে বলল, সা না ভা পা, শের– না, ডিয়ার সে হয় না।
আমি বললুম, কেন? তুমি কি আডোনিসের মতো খাবসুরত?
তেড়ে বলল, কামাল কিয়া, ইয়ার। নামে কী আপত্তি? তা নয়। একবার তাই করেছিলম। ফল কী হল, শোনো। এই হোটেলেই, যা, এই হোটেলেই একদিন বসে আছি, একলা। এমন সময় কে এক অচেনা লোক এসে শুধাল, আপনি কি পাহাড়ী সান্যাল? আমিও তোমারই মতো– গ্রেট মেন থিঙ্ক এলাইক– একগাল হেসে বললুম, আজ্ঞে, মিলটা ধরেছেন ঠিকই, তবে আমি পাহাড়ী সান্যাল নই, আমি তার ছোট ভাই। লোকটা খানিকক্ষণ ইতিউতি করে বলল, কী করি বলুন তো! ম্যানেজারবাবু আমাকে তার কাছে পাঠালেন তিনশো টাকা দিয়ে যেতে। তাঁকে পাই কোথায়? তার পর আমি তাকে যতই বোঝাই
আমিই পাহাড়ী সান্যাল, সে আর মানতে চায় না।
আমি ভেবে বললুম, তা তো বটেই। আমিই সে অবস্থায় মানতুম না। সোত্সাহে বলল, ইয়ে। তার পর আরও ঠাণ্ডি সঁস লেকর বলল, ভাই, সে টাকাটা আর কখনও পাইনি। ম্যানেজার লোকটা ছিল ভালো। অন্তত আমার টাকাটা শোধ করে লাটে উঠতে চেয়েছিল– আমি কি আর জানি! পরদিন সেখানে গিয়ে দেখি সব ফর্সা।
হ্যাঁ! একটা কথা বলতে ভুলে গেলুম। আমার মুর্গির বিলটা পাহাড়ীই দিয়েছিল। কিন্তু এটা বলে কি পাহাড়ীর দুশমনি করলুম না? এ যাবৎ তো লোকে শুধু অটোগ্রাফ চাইত, এখন যদি
আরেকটি কথা। আমাদের এত দোস্তি কেন? সে আমার বই পড়ে না, আমি তার অভিনয় দেখি না। একেবারে খাঁটি হল না কথাটা। আমি বড়দিদি দেখেছি– সে বোধহয় দেশে-বিদেশের পাঁচ পাতা পড়েছে।
পাঠক সর্বশেষে অবশ্য শুধাবেন, আমি এত বাখানিয়া আপনাদের সাহিত্যিক হতে বারণ করছি কেন। তার কারণ সোজা। আমার বিশ্বাস একমাত্র জিনিয়াসরাই আমার লেখা পড়ে। অর্থাৎ আপনারা। বাজারে নামলে আমার রুটি মারা যাবে বলে।
আচ্ছা, আমার কথা ছাড়ন। স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র কী বলেছেন
অস্য দন্ধোদরস্যার্থে কিং কিং ন ক্রিয়তে ময়া।
বানরীমিব বাগদেবীং নয়ামি গৃহে গৃহে ॥
ওরে পোড়া পেট, কত না কিছুই করি আমি তোর তরে।
বাদরীর মতো সরস্বতীরে নাচাচ্ছি ঘরে ঘরে —
(লেখকের অনুবাদ)
পেটের জন্যই হোক, আর খ্যাতির জন্যই হোক, সরস্বতাঁকে বানরের মতো নাচাবেন না। আপনারা বলবেন, এটা তো বড় সিরিয়াস কথা হয়ে গেল। সে-ই তো চেষ্টা করছি গত চৌদ্দ বছর ধরে। সিরিয়াস কথা হেসে হেসে বলার।
কিন্তু পারলুম কই? এখন আবার বৃদ্ধ বয়সে ধাতই-বা যায় কী করে?
উম্র সারি তো কটি ইশকে বুতা মে, মোমিন!
আখেরি ওয়ক্ত সেঁ ক্যা খাক মুসলমা হোংগে?
সমস্ত জীবন তো কাটালে মিথ্যা প্রতিমার প্রেমে,
হে মোমিন!
এই শেষ সময়ে আর কি ছাই মুসলমান হব?
বরঞ্চ লেখা বন্ধ করাই ভালো। উৎসও শুকিয়ে এসেছে।
ওয়ার এম
রাজা প্রজাগণকে কহিলেন,
দেখ, আমার রাজ্যে শত্রুভয় উপস্থিত হইয়াছে, কিন্তু ইহা ফলিত(১) বংশের(২) ন্যায় অচিরাৎ বিনষ্ট হইবে। শত্রুগণ আত্মবিনাশের নিমিত্তই আমার রাজ্যে আক্রমণ করিতে অভিলাষ করিতেছে। এক্ষণে এই ঘোরতর ভয়াবহ আপদ সমুপস্থিত হওয়াতে আমি তোমাদিগকে পরিত্রাণাৰ্থ অর্থ প্রার্থনা করিতেছি। উপস্থিত ভয় নিরাকৃত হইলে তোমাদিগকে পুনরায় প্রদান করিব।(৩) আর শত্রুগণ যদি বলপূর্বক তোমাদের ধন গ্রহণ করে, তাহা হইলে তোমরা কদাচ উহা পুনঃপ্রাপ্ত হইবে না। বিশেষত অরাতিগণ রাজ্য আক্রমণ করিলে তোমাদের পুত্রকলত্রাদিও বিনষ্ট হইবে। তাহা হইলে তোমাদের অর্থ আর কে ভোগ করিবে! তোমরা আমার পুত্রের ন্যায়, আমি তোমাদের সমৃদ্ধি দর্শনে যারপরনাই পরিতুষ্ট হইয়া এই আপকালে রাজ্যরক্ষার্থে তোমাদিগের নিকট অর্থ প্রার্থনা করিতেছি। তোমরা যথাশক্তি ধন উৎপাদনপূর্বক(৪) রাজ্যের উপদ্রব নিবারণ কর। বিপদকালে ধনকে প্রিয় বোধ করা অত্যন্ত অকর্তব্য।
