গুল বাহাদুর ভাবলেন, মেয়েটা বদ্ধ পাগল। তার পর ভাবলেন, কিন্তু এরকম সাদা যার দিল তার আর ভাবনা কী? এর ভিতর-বাহির দুই-ই সাফ। বললেন, এসব খেয়ালি পোলাও খেয়ে তুমি খুব সুখ পাও, না? কিন্তু যত্রতত্র বলে বেড়িয়ো না।
মোতী সেদিকে খেয়াল না দিয়ে শুধাল, তোমার সম্বন্ধে বেবাক বাৎ আমার শুনতে ইচ্ছে করে, কিন্তু বাবাজিদের তো ঘর-গেরস্তির কথা শুধানো বারণ। তবে যদি অভয় দাও তবে একটি কথা শুধাই।
গুল বাহাদুর হেসে বললেন, নির্ভয়ে জিগ্যেস কর। আমার কিচ্ছুটি লুকোবার নেই। তাঁর ইচ্ছে হচ্ছিল গোঁফে চাড়া দেবার। কিন্তু গোঁফ তো আর নেই।
তোমার বিয়ে-শাদি হয়নি?
না।
কারোতে মজোনি?
না। তবে লক্ষ্ণৌ থেকে একবার একটি বাঈজি এসেছিল। যেমন নাচতে পারত, তেমনি গান জানত, তেমনি ছিল চেহারাটি। তাকে বড় ভালো লেগেছিল।
তার পর কী হল?
কিছুই হল না। আমি অন্য কাজে জড়িয়ে পড়লুম। তার পর এখানে চলে এলুম।
ও। কোনও কেলেঙ্কারি করে ভেক নাওনি?
বোষ্টমদের প্রতি গুল বাহাদুরের কোনও অহেতুক প্রেম ছিল না, কিন্তু তারা কেলেঙ্কারি করলেই শুধু ভেক নেয়, এ ইঙ্গিতটা তার ভালো লাগল না।
বললেন, কুল্লে বোষ্টমরা পাষণ্ড?
অত রাগো কেন? আমাদের মুসলমান পীরসায়েবদের দেখনি? তারা যে তাদের চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে রাখেন?
সে আবার কী?
ওই, আমার মতো গোটা দশেক খাপসুরৎ ডবকী হুঁড়ির মধ্যিখানে বসে ভাবখানা করেন, হেরো, হেরো, আগুন আমারে ছোঁয় না।
তার পর?
তার পর আবার কী, তার পর বিস্তর ঘি গলে যায়।
গুল বাহাদুর খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেন, আচ্ছা, তুমি অতশত বলছ-কইছ, শুনছ শোনাচ্ছ কেন বল তো? আসলে তোমার মতলবটা কী খুলে বল তো?
মোতী গালে হাত দিয়ে বসে বসে ভাবছিল। বলল, মতলব কিছুই নয় গোঁসাই। আমি ভেবেছিলুম, তুমি নষ্টামি করে বেরিয়ে এসেছ। তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। তোমার সঙ্গে নষ্টামি করে আমি নষ্ট হব। এই আমার শরীর, এই আমার দিল। ওগুলো যখন কোনও কাজেই লাগল না, তখন না হয় ভেঙেই দেখি, কী হয়। তা আর হল না। তুমি বড় সরল, বড় সাদা। তোমার সঙ্গে বনলো না।
গুল বাহাদুর আপত্তি জানিয়ে বললেন, এটা মিথ্যে কথা। তোমার সবই ভালো। আমি অনেক দেখেছি, আমি ঠিক ঠিক বলতে পারি। অবশ্য আমার সঙ্গে বনলো কি না সে অন্য কথা।
মোতী আপত্তি জানিয়ে বলল, আমার যদি সবই ভালো তবে তাই হোক ঠাকুর। এবাবে তোমাকে শেষ প্রশ্ন শুধাই। তোমার সংসারে মন বসল না কেন, সেইটে আমায় বল।
গুল বাহাদুর বললেন, সংসারে আমার রত্তিভর অরুচি হয়নি, মোতী। আসলে আমি শিবুর মতো গদরের সেপাই। তোমার স্বামীর যা হওয়ার কথা ছিল। লড়াইয়ে হেরে গা-ঢাকা দিয়েছি। ভেক নিয়েছি যাতে করে দুশমন চিনতে না পারে– আমি মুসলমান।
***
লেখকের নিবেদন :
এখানেই ‘এক পুরুষ’ শেষ।
বইখানা ‘তিন পুরুষ’-এ সমাপ্ত করার বাসনা ছিল; কিন্তু আমার গুরুই যখন ‘তিন পুরুষ’ লিখতে গিয়ে এক পুরুষে সমাপ্ত করে সেটিকে ‘যোগাযোগ’ নাম দিলেন তখন যাঁর কৃপায় ‘মূক বাচাল হয়’ তাঁরই কৃপায় এস্থলে ‘বাচাল মূক’ হল।
ঘাটে যেও না বেউলো
আমার উল্টা-রথ তৈরি হচ্ছে। নিশ্চিন্ত থাকুন। পাকা লোক লাগিয়েছি। খাস মার্কিন। ওরা গ্রেতা গার্বো থেকে আরম্ভ করে ডিউক অব উইনজার আলকাপোনি থেকে শুরু করে আর্চবিশপ অব নটিংহাম সক্কলেরই কোরা কাপড় ধুয়ে কেচে মলমল করে তুলতে জানে। ওটা বেরোলে আর কেউ জীবনস্মৃতি পড়বে না।
ইতোমধ্যে ইতোমধ্যে কেন– বহুদিন ধরেই আমি বহু লোকের কাছ থেকে বহু পাণ্ডুলিপি পেয়েছি। প্রেরকদের কেউ কেউ চান আমি যেন তাবৎ বস্তু পড়ে সেটি মেরামত করে দিই। কেউ কেউ অল্পতেই সন্তুষ্ট। বলেন, আমার মতামত জানাতে। আর কেউ-বা সরাসরি শুধান, সার্থক-সাহিত্য কী প্রকারে সৃষ্টি করতে হয়?
উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে, রিপুকম-মেরামতি করে যদি লেখক গড়া যেত তা হলে এই যে শান্তিনিকেতন, যেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রায় চল্লিশ বছর ওইসব কর্ম লেখক এবং শিক্ষক উভয়রূপেই করে গেলেন, এখান থেকে বেরিয়েছেন ক-টি সার্থক সাহিত্যিক? আমি তো একমাত্র প্রমথনাথ বিশীর নাম জানি। পক্ষান্তরে শরৎ চাটুয্যে তো কারও কাছ থেকে একরত্তি সাহায্য পাননি। তার মতো সার্থক লেখক ক-জন? উত্তরে সবাই বলবেন, উনি একসেপশন– ব্যত্যয়। আমি বলব, সার্থক সাহিত্যিক হওয়া মানেই ব্যত্যয়।
কিন্তু তৎপূর্বে প্রশ্ন, আপনি সাহিত্যিক হতে চান কেন?
টাকা রোজগার করতে হয় না, তা এদেশে হয় না।
অনুসন্ধান করে দেখুন, এই বাঙলা দেশে ক-জন লোক একমাত্র কলমের জোরে মোটামুটি সচ্ছল অবস্থায় আছেন। অধিকাংশই কোনও না-কোনও ধান্দায় নিযুক্ত থেকে মাসের শেষে পাকা মাইনে পান। লেখার আমদানি ঘুষের মতো। কখন আসে কত আসে তার ওপর কণামাত্র নির্ভর করা যায় না। ঘুষের টাকা থাকেও না।
অর্থাৎ কপালজোরে হয়তো মাসতিনেক আপনি প্রায় পাঁচশো টাকা করে মাসে কামালেন–এর বেশি এদেশে আশা করবেন না কিন্তু তার ওপর নির্ভর করা চলবে না। পাঠকের মতিগতি কোন দিন কোন দিকে মোড় নেবে তার কোনও স্থিরতা নেই। আপনাকে তবু লিখে যেতে হবে, নতুন বই তৈরি করতে হবে, ওই দিয়ে যদি ভাটার টান ঠেকাতে পারেন। ইতোমধ্যে আপনার পুঁজি ফুরিয়ে এসেছে, অর্থাৎ যে অভিজ্ঞতার মূলধন নিয়ে লেখার ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন সেটা তলানিতে এসে ঠেকেছে। নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবেন কী করে? বয়েস হয়ে গিয়েছে বন্ধ প্রেমের হাট। লোটাকম্বল নিয়ে ঘোরাঘুরিও করতে পারেন না কোমরে বাত।
