দত্যি, দানো, মামদো! তোমাদের কাছে সব মুসলমানই মামদো, না?
গুল বাহাদুর বিরক্ত হয়ে ভাবলেন, এ কী জ্বালা! হিন্দু নই, তবু হিন্দু অপরাধের হিস্যে আমাতেও অর্শায়?
গম্ভীর মুখে বললেন, তোমাকে আমি বলিনি, আমার ধর্মে জাত-মানামানি বারণ। চল ভিতরে, ওই দেখ বৃষ্টি আসছে।
এবারে মারাঠা সৈন্যের অতর্কিতে আক্রমণ নয়। দূরদিগন্ত থেকে হেলে-দুলে বিলম্বিত তালে এগিয়ে আসছে আকাশ-জোড়া পাতাল-ছোঁয়া শ্যামসুন্দর মেঘ-বৃষ্টি। এই রকম অগণিত করীযূথ সমাবৃত গাঙ্গেয় চমূ অগ্রসর হচ্ছে শুনেই আলেক্ষান্দর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সমীচীন গণনা করেছিলেন।
এবারে মোতী খিলখিল করে হেসে উঠল। কিছুতেই থামতে চায় না। যেন পেটের ভিতর হামানদিস্তে দিয়ে কেউ পাথর কুটছে। সঙ্গে সঙ্গে সর্বাঙ্গে দুলে দুলে ফুলে ফুলে কাঁপন। গায়ের বসন যেন সে কাঁপন সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে চায়। কার যেন বিরহ-বেদনায় কনকবলয়-ভ্রংশ, অর্থাৎ বাজুবন্দ খোল খোল যাউত হয়েছিল, আজ হাসির হররায় এ রমণীর বসনাঞ্চলপ্রান্ত বিস্রস্ত। এবং স্মরণ রাখা কর্তব্য, গ্রামাঞ্চলে অঞ্চল প্রায়শ উপকণ্ঠিত থাকে না।
চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, ঠাকুর, তুমি মস্করা-ফিস্কিরি এক্কেবারে বুঝতে পার না। ওদিকে কথা কও পাকা পাকা। তুমি একটি আস্ত মেড়া। তার পর গম্ভীর হয়ে বলল, আল্লা করুন, তুমি ওই রকম মেড়াই থাকো। আল্লার স্মরণে ডান-বাহু উঁচুতে তুলে আঁচল দিয়ে ঘোমটা টানল। আজান শুনলে বাঙালি মুসলমান মেয়ে যে-রকম করে থাকে।
ওদিকে তখন বৃষ্টির মোটা মোটা ফোঁটা গুল বাহাদুরের ধুলো-ভরা আঙ্গিনায় হরিটের বাতাসা ছড়াতে আরম্ভ করেছে।
গুল বাহাদুর নিজের অপ্রতিভ ভাব কাটাবার জন্য গলা একটু শক্ত করে বললেন, ভিতরে চলো।
মিঠার মা মিশ্রির মিঠা। শক্ত। বললে, জোর করে টেনে নিয়ে যাবে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে হাত দুখানি এগিয়ে দিয়ে বলল, নাও। এবং তারি সঙ্গে সঙ্গে উঠি-উঠি ভাব। টান দিলেই সুড়সুড় করে ভিতরে চলে যাবে।
গুল বাহাদুর দ্বিধায় পড়লেন। কী আর করেন? সুরটি যতদূর পারেন মমতাময় করে বললেন, মেহেরবানি কর। মেহেরবানি কথাটার আমেজ উর্দু এবং বাঙলাতে এক নয়। সেকথা না জেনেও আশা করলেন, মুসলমানের মেয়ে সুরটি ধরতে পারবে।
মোতী গুনগুন করে গান ধরে ভিতরে গেল। বুঝল গুল বাহাদুরের হার হয়েছে, কিন্তু এ লোকটা নিজে যখন বুঝতে পারেনি যে তার হার হয়েছে, তখন সে জেতাতে কী আনন্দ? আর হেরে যাওয়ার দুঃখের ছাপ যদি তার মুখের ওপর পড়ত তা হলেই কি মোতী আনন্দ পেত?
এবারে গুল বাহাদুরকে শুনিয়ে একটু উঁচু গলায় গাইল–
ও মুর্শিদ তোমার লগে নাই তো অভিমান
আইলে আও, যাইলে যাও, ঠেলে মারো টান
ও মুর্শিদ নাই তো অভিমান।
বাচ্চারে যে ঠ্যালা মারলে কান্দ্যা পড়ে মায়ের কোলে
যতো মারো বাচ্যা উঠে তত পরাণখান।
ও গুরু নাই তো অভিমান।
তুলাধুনা করা, মৌলা, ফেলাও না ফের জান।
করো না খান খান।
জানুক না জাহান।
মস্তান ফকিরে কয় হেন আমার মনে লয়
শুরুর মনে হৈল ভয়, পায়ে দিল স্থান।
ও মুর্শিদ গেল অভিমান।
এবারে শুল বাহাদুরের গীতটি বুঝতে কোনও অসুবিধা হল না। কিন্তু খটকা লাগল অভিমান শব্দটি নিয়ে।
মোতী বলল, এতে আবার মুশকিল কোথায়? এই মনে কর আনন্দী যদি তোমার ওপর রাগ করে খিচুড়ি আলুর দম না খেয়ে শুতে যায় তবে সে তোমার ওপর অভিমান করল।
গুল বাহাদুর বললেন, সে তো হল রাগ।
মোতী বলল, তা নয়। যদি সে তখন তোমার ভাতে ছাই মিশিয়ে দেয় তবে হবে রাগ।
এবারে গুল বাহাদুর অনেকখানি বুঝতে পেরে বললেন, ওহ, তাই তুমি আমার ওপর অভিমান করে বাইরে বসে ছিলে?
মোতী উত্তর দিল না।
গুল বাহাদুর শুধালেন, এ গীত তুমি কাকে শোনালে?
মোতী নির্ভয়ে উত্তর দিল, তোমাকে, মুর্শিদকে, আর কাকে?
তোমার মুর্শিদ কে?
মোতী হেসে উঠল। বলল, আজ দেখি, তুমি অনেক কথাই শুধাচ্ছ। কেন, হিংসে হচ্ছে নাকি? হ্যাঁ, আছে একজন। কিন্তু সে বড় বুড়ো। সব রসকষ শুকিয়ে গিয়েছে। আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।
গুল বাহাদুর বললেন, ছিঃ, গুরুকে নিয়ে কি এ ধরনের মস্করা করতে আছে?
মোতী বলল, মস্করা কিসের? এই তো আমার সব। আমার জান ভরে দেবে মহব্বত দিয়ে সে তো সব গীতেই আছে। আর আমার শরীরটা? সে বুঝি কিছু নয়? শুরু আমার সব আশা পূর্ণ করবে না?
গুল বাহাদুর নিরাশ হয়ে বললেন, তুমি সবসময় কেমন যেন হেঁয়ালিতে কথা কও। তোমার আশা যদি পাপে ভরা হয় তবে সেটাও গুরু পূর্ণ করবেন নাকি?
মোতী চিন্তা না করেই বলল, নিজেই জানিনে কী চাই। কখনও ইচ্ছে করে মা হয়ে ছেলে কোলে নিতে, কখনও-বা স্বামী পেতে ইচ্ছে করে, আর কখনও মনে হয় দুই, এসব দিয়ে কী হবে? তার চেয়ে একটি নাগর পেলে হয়। ওই যে-রকম তোমাদের রাধা ঠাকুরাণী কেষ্ট-মুরারিকে পেয়েছিলেন। রসের সায়রে সুবো-শাম ডুবে থাকব। আমার শরীর ওর শরীরে মিশে যাবে।
গুল বাহাদুর হাসিমুখে বললেন, যাক, বাঁচালে। মনের কেষ্টকে দিলের হরি বানিয়ে পড়ে থাকো। কোনও বদনাম হবে না।
অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মোতী বলল, ছোঃ! বদনাম! ডবকী ব্লাড়ি। নিকে করিনে। একলা পড়ে আছি। আমার বদনাম তো লেগেই আছে। নাগর নিলে তার আর বাড়বে কী? মড়ার গোরের উপর এক মণও মাটি শ মণও মাটি। আমি তাকে সাজ-সকাল কোলে নিয়ে দাওয়ায় বসব– হাটে যাবার পথের পাশে।
