কিন্তু
কেশের আড়ালে জৈছে
পর্বত লুকাইয়া রৈছে।
ঠিক তেমনি তার দিন-আনি-দিন-খাই-এর আড়ালে আশা-নিরাশা সবকিছুই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল বলে সেটা দিব্যি যেন ক্লোরফর্ম কিংবা আফিঙের কাজ করে যাচ্ছিল। পরম ধার্মিকজনও যখন দিনযামিনী এটা-সেটার চিন্তায় মশগুল থেকে শেষের দিনের কথা সম্বন্ধে অচেতন হয়ে যেতে পারে, তখন সামান্য প্রাণী গুল বাহাদুর যে পলাশতলায় খাঁটিয়ার উপর শুয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেবেন তার আর বিচিত্র কী?
কালটাও ছিল ধীরমন্থর। কারও সঙ্গে দেখা করতে হলে তোড়জোড় করতেই লেগে যেত তিন মাস। বিয়ের আলাপ পাকাপাকি করতে নিদেন তিন বছর। এমনকি মরার সময় গঙ্গাযাত্রায় বেরিয়ে সেখানে দিনসাতেক না কাটালে মুরুব্বিরা রীতিমতো বেজার হতেন। অত তাড়া কিসের রে বাপু? দু-পাঁচ দিন হরিনাম শুনবি, চন্দন বেটে ধীরেসুস্থে সর্বাঙ্গে হরিনাম ছাপা হবে, ইষ্টিকুটুম খবর পেয়ে ঘরসংসার গুছিয়ে-গাছিয়ে দেখা করতে আসবে, শুনতে পাবি কবে যাবি, ক দিন আর আছিস তাই নিয়ে চাপা গলায় আলোচনা হচ্ছে, বাজি ধরা হচ্ছে; তা না, চললি হুট করে যেন ডাক পড়ার পূর্বেই হাড়-হাবাতে আপন হাতে আসন পেতে বসে গেল যজ্ঞির দাওয়াতে। কিংবা যেন বাসরঘরে পাঁচজনের সামনে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে ফেললি কনে-বউয়ের ঘোমটাখানি। কিংবা তারও বেশি।
হিসাব কর দিকিনি গুল বাহাদুর, শান্ত মনে– শুদ্ধ-বুদ্ধ চিত্তে। ক বছর হল? দশ, বিশ, ত্রিশ? পিছনের দিকে না সামনের দিকে? তুমি বসে, আর তারা সামনে দিয়ে চলে গেল, না তুমি তাদের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলেছ, না তাদের পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছ? না তুমি কাজের মাঝখানে এমনি যোগসাধনায় তুরীয় ভাব অবলম্বন করেছিলে যে কাল, না কাল কেন, হেন স্বয়ং মহাকালই ধূর্জটির জটার ভিতর প্রথম উর্বশীর মতো বেশ খানিকটা নেচে কুঁদে, তার পর গঙ্গার মতন এদিক-ওদিক পথ না পেয়ে বিষ্ণুর মতন উত্তম ডানলোপিলোর বিছানাতে অনন্ত শয়নে নেতিয়ে পড়েছেন?
কে জানে কী হয়? যেখানে বছরে একদিনও স্মরণ করতে হয় না আজ কোন তারিখ, সেখানে একটা বছরই এক দিন। আর যেখানে দিনে বত্রিশবার স্মরণ করতে হয় আজ অমুক তারিখ, সেখানে একটা দিনই এক বছর। কে জানে সময় কোন্ দিক দিয়ে যায়? দশ, বিশ, ত্রিশ বছর।
এই মোতীর সঙ্গেই আবার দেখা হতে লেগে গেল দেড় মাস।
সকাল থেকেই পুবের আকাশে মেঘ জমে উঠেছে সাঁওতাল দেশের সাঁওতালি মেয়ের গায়ের রঙ মেখে। মেঘের পর মেঘ জমেই উঠছে। যেন আকাশের ভরা গেলাসে পর্জন্য এক-এক ফোঁটা করে জল ঢালছেন আর দেখছেন, এইবারে উছলে পড়ল কি না। ক্ষণে ক্ষণে কালো মেঘের উপর দিয়ে খেলে যাচ্ছে বিদ্যুতের ঝলমলানি। যেন ওই সাঁওতালনীরই শ্যামবদনে টগরফুলের সফেদ হাসি। কিংবা যদি ইন্দ্রপুরীতেই ফিরে যাই তবে মনে হবে, মেঘের কালো টানার উপর উর্বশী বিদ্যুতের রুপোর পোড়েন টানছেন, বাসররাতের কাঁচুলির কিংখাপ বুনতে। নাহ্! এসব তুলনাই অতি কাঁচা। মোক্ষম তুলনাটির চড় বিশ্বসাহিত্যের গালের উপর মেরে দিয়ে গিয়েছেন রাজা শূদ্রক। বিদ্যুৎ যেন শ্যামাস্তু নীলকণ্ঠের গলা জড়িয়ে গৌরীর শুভ্রধবল বাহুলতা।
গৌরী ভুজলতা যত্র বিদ্যুল্লেখেব রাজতে হায় রে শূদ্রক! একটু টেনে-সামলে উপমাগুলো ছাড়লে কেন হে পৃথ্বীরাজ, কাব্যম্রাট? এ যুগের মধ্যমজনকেও যে একদিন রসসৃষ্টি করে নিষ্ক সঞ্চয় করতে হবে সেটা কি তিনি খেয়ালই করলেন না? রাজা হলেই কি এরকম দান করতে হয়? তাই দেশের রাজা হাতিম তাই অন্ন-দান করে হয়েছিলেন অন্নরাজ, কিন্তু তিনিও তো বীচির ধান খাইয়ে ভবিষ্যত্বংশীয়দের নিরন্ন করে যাননি। উপমার বেলা শূদ্রক শেষে নবান্নের বীচিও যে খতম করে গেলেন।
তা যাক। কিন্তু দয়াদাক্ষিণ্য, স্নেহ-প্রেম, বিশেষ করে আসঙ্গলি– এ জগৎ থেকে এখনও লোপ পায়নি।
গুল বাহাদুর দেখলেন, তেপান্তরি মাঠ যেখানে ফালি হয়ে বাঁ দিকে ঢুকেছে, তারই অপর প্রান্তে, মেঘের আড়াল থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে একটা উঁচু ঢিবির উপর ক্ষণিকের তরে দাঁড়াল। মাঠ-ঘাট জনহীন। বৃষ্টি নামি-নামছি, নামি-নামছি করছে। এ অবেলায় লোকটার আহামুখি দেখে গুল বাহাদুর ভুরু কোঁচকালেন।
আধ আলো-অন্ধকারে বেলা কতখানি গড়িয়েছে ঠাহর হচ্ছে না। ঘরে ঢুকে গুল বাহাদুর আনন্দীকে শুধালেন, কী খাবে আনন্দী? দিল্লিতে তুই তু শব্দটা প্রায় উঠে গিয়েছে।
আনন্দীর আটপৌরে পোশকি একই মেনু। বলল, খিচুড়ি আর আলুর দম। ওই একটিমাত্র রান্না যার সঙ্গে দিল্লির রান্নার কিঞ্চিৎ ঐক্যসখ্য আছে– গরমমশলার কৃপাতে– অবশ্য আনন্দীর অজান্তে। গুল বাহাদুর সাজসরঞ্জামের চতুরঙ্গ বাহিনী তোড়জোড় করে জোগাড় করতে লাগলেন। আনন্দী কখনও মায়ের আদর পায়নি। পাওয়ার মধ্যে পেয়েছে বাপের ধাতানি। সে-ও এটা-সেটা যোগান দিতে লাগল।
বৃষ্টি নামবার আগে আরও কিছুটা জল এনে রাখলে ভালো হয় ভেবে গুল বাহাদুর ঘর থেকে বেরিয়েই থমকে দাঁড়ালেন। দাওয়ার এক প্রান্তে খুঁটিতে হেলান দিয়ে মোতী বসে।
তুমি!
নিরুত্তর।
কখন এসেছ? ডাকলে না কেন?
দেয়ালের থেকে চোখ না ফিরিয়েই বললে, তুমি আমাকে ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিতরে চলে গেলে কেন?
গুল বাহাদুর হেসে বললেন, তাজ্জব কি বাৎ! অতদূর থেকে আমি তোমাকে চিনব কী করে? আমি ভাবলুম,–
