তবু বললেন, বুঝিয়ে বল।
এতে আবার বোঝাবার কী আছে। গুরুকে খবর পাঠাচ্ছি, মহব্বত দরদের তেল শলতে নেই ভিতরে, তবু দেহের বাতি জ্বলছে। তা আবার খামোখা দিনের বেলাও জ্বলে। তাই তো তোমাকে বলছিলুম, গতরটার পানে চেয়ে দেখ।
গুল বাহাদুর মনে মনে বললেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা, অত্মোৎসর্গ করার তেল শলতে তৈরি করেই আমরা জ্বালিয়েছিলুম গদরের প্রদীপ। সে মিথ্যা মায়া, ফানি।
কিন্তু মোতীর এই সুন্দর দেহ। এর ভিতরে সুন্দর হিয়ার প্রদীপ নেই- অসম্ভব, সম্পূর্ণ অসম্ভব।
বললেন, মোতী, সবই ভগবানের দান। তাচ্ছিল্য করতে নেই। রোজা ভালো জিনিস, কিন্তু তারও বাড়াবাড়ি করতে নেই। মীরাবাঈয়ের ভজন তুমি শুনেছ,
নিত্য নাহিলে হরি যদি মিলে
জল-জন্তু আছে ঢের
কামিনী ত্যাজিলে হরি যদি মিলে
তবে হরি খোঁজাদের।
মোতী গদগদ কণ্ঠে বলল, এ তো ভারি মধুর, গোসই। আমি কখনও শুনিনি।
যমুনার পারে রাজপুতানার এক বৈরাগী মীরার ভজন গাইত। গুল বাহাদুর আনমনে তার গান শুনেছেন, মাঝে-মধ্যে, কিন্তু সে গান যে তার মনের মধ্যে বাসা বেঁধে আছে, তা তিনি নিজেই জানতেন না। ভক্তিরস, ভাবালুতা গুল বাহাদুর কখনও খুব নেকনজরে দেখেননি। বাড়াবাড়ির ভয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আজ তবে চলি, মিঠার মা। খোয়াইয়ের জলটা আমার দেখবার ইচ্ছে আছে। গণি আর আনন্দী রইল। কাল সকালে গাড়িতে করে পাঠিয়ে দিয়ো।
মোতী বাধা দিল না। গোঁয়ারদের নিয়ে তার জীবনের কেটেছে অনেকখানি তার বাপ-ভাইরা ছিল এক একটি পুঁদে গোঁয়ার।
শিমুলতলায় এসে শুধু গম্ভীর কণ্ঠে বলল, আচ্ছা গোসই, একটা কথার উত্তর দেবে? এই গণির স্বভাব-চরিত্র কী তা তুমি জানো না। সে আমার বাড়িতে থাকলে তোমার কোনও আপত্তি নেই। সে আমাকে নিয়ে যা খুশি করুক। কিন্তু তুমি থাকলেই আসমান মাথার উপর ভেঙে পড়ে। কেন বল তো? ছোটজাতে ছোটজাতে যা খুশি করুক– নয় কি?
সত্যি বলতে কী, গুল বাহাদুর পরিস্থিতিটা এভাবে চিন্তা করে দেখেননি। কিন্তু মোতীর কথাগুলো এমনি সোজাসুজি তার কানের ভিতর দিয়ে মগজের উপর ঠনঠন হাতুড়ি পিটিয়ে দিল যে তাঁকে চিন্তা করে কথাগুলো বুঝতে হল না। প্রথমটায় থ মেরে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার পর ধীরে ধীরে বললেন, তোমায় সত্যি বলছি, আমাকে বিশ্বাস কর, আমি অতখানি চিন্তা করে এ ব্যবস্থা করিনি। বোধহয়, এ ব্যবস্থা আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তুমি যে কারণটা দেখালে সেটাও হয়তো ঠিক, কিন্তু আমাকে যদি জিগ্যেস কর তবে বলব, আমি ভদ্রলোক-সাধারণ লোক সকলের সঙ্গেই মিশেছি এবং এ বাবদে আমি গণি মিয়াদের ঢের ঢের বেশি বিশ্বাস করি। এদের হ্যাংলামো অনেক কম। গরিবের সুন্দরী মেয়েকে মোকায় পেলে দ্রলোক-এর মাথায় বদ-খেয়াল চাপবেই। ভদ্রলোকের মেয়ে হলেও তাই তবে সেখানে একটু লাইয়ের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তাই দেখ, ভদ্রলোকের মেয়েকেও আমরা চাকর-বাকরের হেফাজতিতে রাখা পছন্দ করি। আর
থামলে কেন? বল। কঠিন গলা একটু মোলায়েম হয়েছে বলে মনে হল।
আর গণি ভালো-মন্দ কিছু একটা করতে গেলে তাকে যে রকম ঠাস করে তুমি চড় মারতে পারবে, আমাকে কি–
ধমক দিয়ে বলল, থাক থাক্। কে কাকে চড় মারত কে জানে। বিকেলবেলার বৃষ্টিশেষের কনে-দেখার আলো সবটুকু মুখে মেখে এতক্ষণ-গোপন-রাখা তার সবচেয়ে মিষ্টি গলায় বলল, তবে এসো ঠাকুর।
***
জলের তোড় গুল বাহাদুর অতি উত্তমরূপেই দেখলেন। বাদশাহ মুহম্মদ তুগলুক যে রকম দিল্লির জাহানপানা শহরে সাততলা মঞ্চের উপরে বসে তার হাজার হাজার সৈন্যস্রোত বয়ে যেতে দেখতেন অর্থাৎ একটা উঁচু ঢিবির উপর বসে জলের তোড়, স্রোতের দু উঁচু উঁচু টিবির উপর রাগী ঢেউয়ের ছোবল তাবৎ বস্তুই দেখলেন এবং তার চেয়েও উত্তমরূপে হৃদয়ঙ্গম করলেন, মোতীর– মিছার মার কথা গল্প নয়। এর যেখানে হাঁটুজল সেখানেও দাঁড়ায় কার সাধ্য?
সন্ধের সময় আবার বৃষ্টি নামল। ষোড়শীর রাত কিন্তু মেঘে মেঘে সব অন্ধকার। সমস্ত রাতটা কাটাতে হল ঢিবির উপর।
অভিসম্পাত দিতে দিতে বললেন, মহাজনগণ বলেছেন, মেয়েদের বুদ্ধিতে চলো না। হক কথা। কিন্তু না চললে কী হয় তা-ও বেশ টেরটি পেলুম। ওদের কথা শুনলে বিপদ, না শুনলে আরও বিপদ। এ জাতটাই বজ্জাৎ!
.
০৬.
কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে পান্ডোরা খুলে ফেলল কৌটাটি, আর অমনি তার থেকে পিল পিল করে বেরুতে লাগল দুঃখ, দৈন্য, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, আরও কত কী– আর তারই চোখের সামনে ছড়িয়ে পড়ল ভুবনময়। পান্ডোরা ভয়ে ভয়ে যখন ভিরমি যাব যাব করছে তখন সর্বশেষে বেরুল– আশা। তারই জোরে মানুষ সব দুঃখদৈন্য সয়। আত্মহত্যার দৃঢ় দড়িতে নিজেকে না ঝুলিয়ে দিয়ে ঝুলতে থাকে সেই আশার ক্ষীণ সুতোটিতে।
সুলেমান যখন তার স্বাধিকার-প্রমত্ত জিকে শাস্তি দিয়ে বোতলে পুরে সমুদ্রে ফেলে দেন তখন তাকে পান্ডোরার শেষ দৌলতটি নিতে বাধা দেননি। সেই তার চরম করুণা। জিনি যদি বোতলের ভিতর বন্দিদশার প্রথম প্রহরেই জানতে পেত তাকে ক-শো বছর ধরে বোতলের ভিতর প্রহর নয়– শতাব্দী গুনতে হবে, সে নিশ্চয়ই থ্রম্বসিসে মারা যেত।
গুল বাহাদুর যদি চিকনকালাতে আশ্রয় নেবার দিন জানতে পেতেন, তাঁকে ক-যুগ ওখানে কাটাতে হবে, তা হলে তিনি নামাবলীতে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়তেন। পাভোরার যে ক্ষীণ আশাটি নিয়ে তিনি নামাবলী গায়ে দিয়েছিলেন, সেটি ওরই মতো এত জরাজীর্ণ হয়ে গিয়েছে যে, ওটিকে আর পরা চলে না।
