গুল বাহাদুরের দুঃখ আরও বেড়ে গেল। এরকম একটা গুণরাজ খান চলে গেল। আর কেউ যেতে পারল না?
মোতী আরও গলা নামিয়ে বলল, কিন্তু জানো ঠাকুর, আমার সোয়ামী চলে যাওয়ার পর একদিনও এ বাড়িতে আসেনি। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত। একদিন বাঁধের কাছে ধরা পড়ে গেল। তখন আমায় মনের কথা বলল। ওরা দু-জনে নাকি কোম্পানির সঙ্গে লড়তে যাবার মতলব করেছিল। তার পর শিবু কোথায় উধাও হয়ে গেল। ফিরে এসে বেশিদিন বাঁচল না। কিন্তু ওসব কথা আর কেউ জানে না।
বাইরে আসমান-ফাটা বরষাত নেমেছে, হাওয়ার মাতামাতি বন্ধ হয়ে গিয়ে চাল দিয়ে জলের ধারা ঝালরের মতো ঝুলে পড়ছে। গণি মিয়া দাওয়ায় বসে আছে গালে হাত দিয়ে। বাইরে জলের ধারার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মিঠার মা তার বড় বড় ডাগর চোখে শুকনো চোখে।
হঠাৎ হেসে উঠে বলল, লোকে যে আমায় পাগলী বলে, ভুল বলে না। তুমি পায়ের ধুলো দিয়েছ এ বাড়িতে, আর আমি একবার জিগ্যাসাবাদও করছিনে, তোমার সেবার কী হবে?
গুল বাহাদুর তাড়াতাড়ি বললেন, তার জন্যে তুমি চিন্তে কর না, মিঠের মা। গাড়িতে চিড়ে-মুড়ি আছে। না হয় তুমিও কিছু দেবে।
অবাক হয়ে মোতী শুধাল, তুমি জাত মানো না? একটুখানি ভেবে নিয়ে গুল বাহাদুর বললেন, আমার ধর্মে জাত মানামানি বারণ।
মোতী প্রথম একটু অবাক হয়ে তাকাল। তার পর বলল, বুঝেছি। খুব যারা উঁচুতে উঠে যায়, তারা বোধকরি ওসব আর মানে না। আমার বাপের বাড়ির পাশের গায়ে বামুনরা থাকত। ভয়ঙ্কর জাত-বামুন। আমার বাবা বলত, তাদের কেউ কেউ নাকি জাত মানত না। বাবার হাতে তামাক খেত।
গুল বাহাদুরের জানবার ইচ্ছে হল, এই ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটা মোতী কোন চোখে দেখে। শুধালেন, এ জিনিসটে কি ভালো?
মোতী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, কী জানি ভালো, না মন্দ। যার যেমন খুশি। আমাদের পীর সাহেবও তাঁর বিবির হাতে ছাড়া খান না। ভালোই করেন নিশ্চয়। তিনি যা জায়গা-বেজায়গায় নিত্যি নিত্যি আড়াই কুড়ি দাওয়াত পান, ওসবের সিকিটাক খেলেও দেখতে হত না। ওই হোথায় বাসা বাঁধতে হত। সেখানে আবার বাবুর্চিখানা নেই। বলে মিটমিটিয়ে হাসতে লাগল।
গুল বাহাদুর বুঝতে না পেরে বললেন, কোথায়?
ডান হাতে আঁচল দিয়ে মুখ চেপে বাঁ হাতে খোলা দরজা দিয়ে কোথায় যেন দেখিয়ে দিল। গুল বাহাদুর তবু বুঝলেন না।
গোরস্তান গো, গোরস্তান। ওই যেখানে মিছার বাপও ঘুমুচ্ছে।
গুল বাহাদুর মরমী, দরদী লোক নন অন্তত এই তাঁর বিশ্বাস। তবু শুকনো মুখে বললেন, কেন তুমি এ দুঃখের কথা বার বার তুলছ মিঠার মা?
মোতী যেন আশ্চর্য হয়ে গেল। দু হাত জুড়ে বললে, মাফ কর গোসাই, কিন্তু দুঃখের কথা বলল কে? ও তো ওখানে বেশ আরামে ঘুমুচ্ছে। আর যাবার সময় ও তো ভারি হাসিমুখে গিয়েছে। চোখ বুজল, কিন্তু মুখের হাসিটুকু মিলাল না। জিগ্যেস কর না, এই গাঁয়ের পাঁচজনকে, যারা তাকে গোসল করাল, কাফন পরাল।
থাক।
হ্যাঁ, থাক্। দাঁড়াও, আনন্দীর গায়ে একটা কাঁথাচাপা দিয়ে আসি।
তার পর দুজনেই অনেকক্ষণ চুপচাপ।
গুল বাহাদুর মাঝে মাঝে খোলা দরজা দিয়ে দেখছিলেন, জল ধরার কোনও চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে কি না। মোতী লক্ষ করে বলল, সে আশা ছেড়ে দাও আজ। জল ধরলেও বেরুতে পারবে না। এ গাঁ ও গা-র মাঝখানে যে খোয়াই তার ভিতর বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও জল যা তোড়ে বয় তাতে হাতি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আর কত শো দ। একবার একটাতে মজে গেলে বিনা মেহন্নতে বেরিয়ে যাবে এক ঝটকায় ওই দূরের অজয়ে, তবে জানটা আর সঙ্গে যাবে না। না, থাক। ওসব কথা তুমি ভালোবাস না। আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়। সামলে-সুমলে কথা বলতে হয়।
গুল বাহাদুর বললেন, তুমি তো কিছু খেলে না।
আমি তো দিনের বেলা খাইনে।
সে কী? তামাম বছর রোজা রাখ নাকি?
ওই দুই ঈদের ছটা দিন বাদ দিয়ে। তবু দেখ তো গতরখানা।
ছাড়পত্র পাওয়ার পূর্বেও গুল বাহাদুর অনেকবার সীমা লঙ্ন করেছেন, তবু নতুন করে গতরখানা দেখে খুশিই হলেন। কোনও প্রকারের সহানুভূতি জানাবার প্রয়োজন বোধ করলেন না। বললেন, কার ওজন কতখানি তাই মাপবার জন্য ভগবান দাঁড়িপাল্লা নিয়ে স্বর্গে বসে থাকেন না।
মোতী বলল, হক কথা। কিন্তু আমাদের একটা মুর্শিদীয়া গীত আছে ওই নিয়ে। শুনবে? বলেই গুন গুন করে ধরল– মিষ্টি গলায় কিন্তু কেমন যেন কান্না ভর-র সুরে
দীপ নাই শলিতা নাই,
জ্বলে শখের বাতি
কইয়ো গিয়া মুরশীদের ঠাই।
জ্বলে দিবা জ্বলে রাতি
কইয়ো গিয়া ও ভাই—
ঘুরে ফিরে, এখানে ধরে, ওখানে ছেড়ে, আবার নতুন করে ধরে মোত অনেকক্ষণ ধরে গানটি গাইল। সমস্ত প্রাণ দিয়ে। ঝরঝর বারিধারা যে রকম সহজ পথে আকাশ থেকে নেমে আসে, এর গানও হৃদয়ের উৎস থেকে নেমে এসে ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। রসকষহীন গণি মিয়া পর্যন্ত সরে এসে চৌকাঠের কাছে বসেছে।
গুল বাহাদুর গানের পুরো অর্থ বুঝতে পারলেন না, কিন্তু রস পেতে খুব যে অসুবিধে হল তা নয়। বাচ্চারা যেরকম গল্প শোনার সময় ভাষার দৈন্য কল্পনা দিয়ে পুষিয়ে নিয়ে পুরো রসই পায়, নতুন ভাষা শেখার সময় বয়স্ক লোকও তাই করতে পারে, যদি সে ইতিমধ্যে কল্পনাশক্তি হারিয়ে না ফেলে থাকে। জ্বলে শখের বাতি বলার সময় মোতীর দেহ যেন আরও সুন্দর হয়ে দেখা দিচ্ছিল, আর দীপ নাই শলিতা নাই গাইবার সময় মোতীর চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, গুল বাহাদুরও সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন।
