প্রথম তরুণ বয়সে গুল বাহাদুর যখন সবে বুঝতে আরম্ভ করেছেন যুবতীর দেহে কী রহস্য লুক্কায়িত রয়েছে, তখন তাঁর এক ইয়ার তাঁকে একখানা চিত্রিত ইউসুফ-জোলেখার বই দিয়েছিল। পাতার পর পাতা উল্টে সে বইয়ে তিনি দেখেছিলেন শিল্পী কীভাবে প্রতি পাতায় জোলেখার সৌন্দর্য ধীরে ধীরে উদঘাটন করেছেন। প্রতি ছত্র, প্রতি রঙ তাঁর অঙ্গে অঙ্গে তখন কী অপূর্ব শিহরণ এনে দিয়েছিল। রোমাঞ্চ কলেবরে কাটিয়েছিলেন অর্ধেক যামিনী।
আজ ঠিক সেইরকম বিদ্যুতের প্রতি ঝলক যেন মেয়েটির সৌন্দর্য পাতার পর পাতা খুলে তাঁর মুগ্ধ আঁখির সামনে তুলে ধরছিল। আর চতুর্দিকে তখন ঝঞ্ঝাবাত্যার প্রলয়নৰ্তন। তারই মাঝখানে এই কমলিনীর ক্ষণে ক্ষণে আত্মবিকাশের মন্দমধুর প্রস্ফুরণ।
কিন্তু আজ আর প্রথমতারুণ্যের সেই রোমাঞ্চ শিহরণ গুল বাহাদুরের দেহে-মনে হিল্লোলিত হল না। আজ এই সৌন্দর্যের পটপরিবর্তন তিনি গভীর তৃপ্তির সঙ্গে গ্রহণ করলেন–শান্ত মনে সমাহিত চিত্তে।
বিদ্যুতালোকে গুল বাহাদুরের চোখে চোখ পড়তে রমণী শুধাল, কী দেখছ, গোসই?
অতিশয় অনাবশ্যক প্রশ্ন। কণ্ঠে লজ্জা দেবার কিংবা পাওয়ারও কোনও রেশ নেই। এমন সময় আকাশ থেকে কক্কড় করে নামল শুকনো দেশের ভরাট অকাল বৃষ্টি। গুল বাহাদুরকে কোনও উত্তর দিতে হল না।
মেয়েটি মাটিতে বসে দু হাতে হাঁটু জড়িয়ে গুল বাহাদুরের মুখের দিকে আবার তাকাল। চিবুক যে জোড় হাঁটুর উপর রাখবে তার যেন উপায় নেই। মাঝখানে সুবিপুল মৃন্ময় মর্ম-বিগ্রহ যুগল।
হঠাৎ রমণী দু বাহু তুলে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে গুল বাহাদুরকে শুধাল, গোসাই, তোমার বয়স কত?
যেন প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলেন। কিন্তু উত্তর না দিয়ে পাল্টে শুধালেন, কোন বয়স?
রমণী হেসে উঠল। বলল, সে আবার কী? বয়স আবার কত রকমের হয়?
গুল বাহাদুর বললেন, অনেক রকমের হয়। আমার বয়স তেইশ। গদরের নৈরাশ্য এই নাতিদীর্ঘ তেইশকে যেন কত দীর্ঘ তেইশে সম্প্রসারিত করে দিয়েছে।
এবারে রমণী খল খল করে হেসে উঠল। ইয়া আল্লা, ইয়া রসুল, তোমার বয়স তেইশ! আমার-ই তো এক কুড়ি হয়!
গুল বাহাদুর চমকে উঠলেন। এ মেয়ে কি মুসলমান? শুধালেন, তোমার নাম কী?
হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, তোমার যেমন অনেক রকমের বয়স, আমার তেমনি অনেক নাম। লোকে বলে মিছার মা।
সে আবার কী?
বুঝলে না? আমি সাচ্চা মা নই, তাই আমি মিছার মা।
বৃষ্টি নেমেছে দেখে গণি মিয়া গাড়ি-গরুর খবর নিতে বাইরে যাচ্ছিল। এতক্ষণ সে কোনওকিছুতে কান দেয়নি। এবারে একটুখানি দাঁড়িয়ে গুল বাহাদুরের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে যা-তা বলছে, বাবাজি। ওর নাম আসলে মিঠার মা।
মিঠার মা গণির দিকে তাকিয়ে রাগত কণ্ঠে বলল, হ্যাঁরে গণ্যা, আমি যা-তা বলি? আমি মিছার মা না তো কী? আল্লার কিরে কেটে ক তো?
গণি বাইরে যেতে যেতে বলল, তা তুই নিকে করে বাচ্চা বিয়োলেই পারিস। গুল বাহাদুরকে বলল, আসলে ওর নাম মোতী।
গুল বাহাদুর ভাবলেন, এ-নাম যে দিয়েছে সে আর যাই হোক, মিছের বাপ নয়– সত্যি নামই দিয়েছে। কিন্তু এর জাত কী তার হদিস গুল বাহাদুর তখনও পেলেন না।
কিন্তু এক মুহূর্তেই পাওয়া গেল। তা-ও অনায়াসে।
আনন্দী বলল, দাদু, জল খাব।
মোতী শুনতে পেয়েছে। ভাবখানা যেন শুনতে পায়নি।
গুল বাহাদুর বললেন, মোতী, একে একটু পানি খেতে দাও।
মোতীর মুখ শুকিয়ে গেল। একটু শুকনো হাসি হেসে বলল, আমি যে মুসলমান।
গুল বাহাদুর বললেন, তুমি পানি দাও।
মোতী চীনেমাটির বাটিতে করে আনন্দীকে জল দিল। সঙ্গে দুটি বাতাসা। গুল বাহাদুরের কাছে এসে এ তো তোমার ছেলে নয়, ঠাকুর। কার ছেলের জাত মারছ?
এই জাত মারামারিতে গুল বাহাদুর একটু বিরক্ত হয়েছিলেন। বললেন, শিবু মোড়লের ছেলে। ও জাত–
আনন্দের চোটে আনন্দীকে জড়িয়ে ধরে মোতী বলল, কোজ্জাব মা, তুই শিবুর ব্যাটা। তাই ক। কী খাবি বল।
মোতী ভারি খুশি। অচেনাজন চেনা লোককে যখন চেনে তখন আর সে অচেনা নয়। আসলে তা-ও নয়– চেনা-অচেনার পার্থক্য মোতী কখনও করেনি। মোতী খুশি হয়েছে, কথা কইবার মতো দু-জনারই একজন চেনা লোক পাওয়া গেল বলে। গুল বাহাদুরকে বলল, ওর কথা আর তুলো না, গোসাই, ওর মতো হতচ্ছাড়া হাড়হাভাতে এ মুলুকে দুটো ছিল না। ক বছরের কথা? আমার সোয়ামী রেখেছে রোজা, জষ্ঠি মাসের গরমে। ইফতারের জন্য আমি করেছি শরবত। র র, থাম্ থাম্ বলতে না বলতে শিবু মেরে দিল-বেবাক ঘটি। ওর আবার জাত। ওর জাত মারে কে?
তার পর গুল বাহাদুরের প্রায় গা ঘেঁষে বসে ফিসফিস করে বলতে আরম্ভ করল, যেন কতই না লুকানো কথা, ওর জাত ছিল সোনা বাঁধানো। একঘটি তেঁতুলের শরবত ঢাললে তার জেল্লাই বাড়ে বই কমে না। আর আসলে ছিল, আমারই মতো বদ্ধ পাগল। জানো, আমার বিয়ের দিনে একজালা তাড়ি খেয়ে এসে জুড়ে দিল কান্না। আমার বাবা নাকি তাকে বলেছিল আমার সঙ্গে তার বিয়ে দেবে। সবাই হেসে গড়াগড়ি। শেষটায় আমার মামা বলল, তা মোড়ল, বিয়ে করবে তো তোমার পাটরানিকে খবর দাও, তিনি এসে বাদীবরণ করে নিয়ে যাবেন। যেই না শোনা অমনি শিবু জল। নেশা কেটে পানি হয়ে গেল। শিবুর বউ ছিল এ তল্লাটের খাণ্ডার। মারমুখী বঁটিদা। তার পর শিবু গলায় ঢোল ঝুলিয়ে শুরু করল নাচতে। পাঁচখানা গায়ের লোককে সেদিন যা হাসিয়েছিল। বিয়ের পর আকছারই আসত আমাদের বাড়িতে। কই গো নাগর বলে আমার সোয়ামীর হাত থেকে হুঁকো কেড়ে নিয়ে একদমে দিত ছিলিম ফাটিয়ে। আসলে ও খেত বড়তামাক।
